উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে বিত্তহীন—সবাইকে নিয়েই সমাজকে চলতে হয়। বিত্তের মাত্রা অনুযায়ী যতই শ্রেণিকরণ থাক না কেন, সমাজ কখনো তার সদস্যদের অস্বীকার করতে পারে না। এটি যখন আরও বড় পরিসরে যায়, তখন এর দায়িত্ব বর্তায় রাষ্ট্রের ওপর। রাষ্ট্রকে তার প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব নিতে হয়। বিশেষত যারা সম্পদ ও সুযোগের বিবেচনায় নিচের কাতারে থাকে, তাদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব অনেকটাই বেশি।

আধুনিক রাষ্ট্র নিম্ন আয়ের বা আয়হীন নাগরিকদের প্রতি দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে ‘সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি’ হিসেবে নানা পদক্ষেপ নেয়। এর মধ্যে যেমন কর্মসংস্থানের বিষয় রয়েছে, তেমনি রয়েছে কাজহীন মানুষদের সহায়তার বিষয়টি। বিশেষত দুর্যোগকালে রাষ্ট্রের এই দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

চলমান করোনা মহামারি এমনই এক দুর্যোগ হাজির করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে যখন করোনার প্রকোপ ভয়াবহ পর্যায়ে ছিল, তখন দেশটির সরকার লকডাউনের মতো পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। মানুষের চলাচল সীমিত হওয়ার কারণে তখন বহু প্রতিষ্ঠান আক্ষরিক অর্থেই বন্ধ হয়ে যায়। ঘরে বসে কাজ চালিয়ে যাওয়ার মতো বাস্তবতা অনেক ব্যক্তির যেমন নেই, তেমনি অনেক প্রতিষ্ঠানেরও নেই। কাজের ধরনের কারণেই এটি সব সময় সম্ভব হয় না। এর ভয়াবহ প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতে। অনেক প্রতিষ্ঠান হয় নিজের কাজের পরিসর কমিয়েছে, নয় তো বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ হারিয়েছে।

এই কাজ হারানো মানুষের পাশে দাঁড়াতে ফেডারেল সরকারের পক্ষ থেকে বেকারভাতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। নেওয়া হয় করোনা প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগও। এই শুভ উদ্যোগে কালি লেপে দিয়েছে কিছু অসাধু মানুষ। দুঃখের বিষয় হচ্ছে এই অসাধু মানুষদের মধ্যে বাংলাদেশি মার্কিনরাও রয়েছেন। বাংলাদেশি মার্কিনদের কেউ কেউ তথ্য গোপন করে বেকারভাতার আবেদন করেছেন। তাদের অনেকে এই ভাতা পেয়েছেনও। এতে যারা সত্যিকার অর্থে সংকটে ছিলেন এবং আছেন, তাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন। এখন এই বেকারভাতা নেওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে জরিমানাসহ অর্থ ফেরত চেয়েছে নিউইয়র্কের লেবার ডিপার্টমেন্ট।

করোনাকালে সাধারণ নিম্ন আয়ের মানুষদের পাশে বহু বাংলাদেশি ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিকভাবে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছে এবং করছে। এখনো বিনা মূল্যে কোভিড-১৯ পরীক্ষার মতো বহু কর্মসূচি চালু রয়েছে। এসব কার্যক্রম নিঃসন্দেহে বাংলাদেশি কমিউনিটির সুনাম বাড়িয়েছে। এসব শুভ উদ্যোগ যখন চলছে, তখন আরেকটি অসাধু শ্রেণি প্রতারণার মাধ্যমে তথ্য গোপন করে বেকারভাতাসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতাধীন নানা সুবিধা নিয়ে বঞ্চিত করেছে সেই সব মানুষের, যারা এসব সহায়তা পাওয়ার সবচেয়ে যোগ্য। কতিপয় মানুষের অতি লোভ ও তা থেকে করা প্রতারণা সবকিছুকে ম্লান করে দিচ্ছে।

প্রবাসের সমাজে একজন ব্যক্তির আচরণের সঙ্গে তাঁর কমিউনিটিকে গুলিয়ে ফেলার কাজটি হামেশাই করা হয়। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অসততার দায় অনেক সময় কমিউনিটিকে নিতে হয় না চাইতেই। কিন্তু যদি কমিউনিটির বৃহত্তর অংশটি যদি এই লোকেদের বর্জন করে, তবে এই দায় কিছুটা হলেও এড়ানো যায়। তাই করোনার মতো দুর্যোগকালে যারা অসৎ আচরণের মাধ্যমে নিজের পকেট ভারী করার চেষ্টা করেছে, তাদের বিষয়ে কঠোর হতে হবে কমিউনিটিকে। তবে এ ক্ষেত্রে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, সত্যিকারের দুর্দশাগ্রস্ত কেউ যদি জরিমানাসহ বেকারভাতা ফেরত দেওয়ার চিঠি পেয়ে থাকে, তবে তাকে সহায়তা দিতে যেন কেউ কুণ্ঠিত না হয়। মোদ্দা কথা হলো, সততা ও সঠিক পথে থাকার বিষয়টিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে কমিউনিটিকে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0