default-image

খোদা, তোমার লীলা বোঝার শক্তি দাও। মরণকে রোখার জন্য দুজনই প্রাণান্ত চেষ্টা করছে, একজন টিকা নিয়ে, আরেকজন না নিয়ে। টিকার তালিকায় নামটা যেন ওপরে থাকে, সে চেষ্টা একজনের, অন্যজন অজানা কুফলের কথা ভেবে এর নাম শুনতেই রাজি না। প্রভু, আমি কি করব?

বিজ্ঞানের পাশেই থাকব।

অন্তত পথ হারাব না।

আমার ফোনের ভৌতিক আচরণে হতভম্ব নিজেই।

আওয়াজ নেই, স্ক্রিনে কোনো ছবি নেই, দিন শেষে ভয়েস মেলে পাওয়া গেল হাফ ডজন ম্যাসেজ। বাবুল ভাইয়ের (স্বাধীনতার পর সত্তর দশকে দুবার সিলেট পৌরসভার নির্বাচিত চেয়ারম্যান) ম্যাসেজে বিরক্তির প্রকাশ আছে।

বাবুল ভাই ও আমি সিলেট শহরে একই মহল্লার (ধোপাদীঘির উত্তর পাড়) বাসিন্দা। কাকতালীয় হলেও নিউইয়র্কেও আমরা একই মহল্লার (জ্যাকসন হাইটস) বাসিন্দা ছিলাম। হাঁটা দূরত্বে ছিল আমাদের বাড়ি। আড্ডা হতো প্রায়ই। বেশির ভাগই শুধু স্মৃতিচারণ। আমি বাড়ি বিক্রি করে জ্যামাইকা চলে আসায় এই আড্ডা ব্যাহত হয়।

করোনার প্রথম ধাক্কা দুজনই কাটাই দেশে—ঢাকা ও সিলেটে। এখন আবার নিউইয়র্কে। তবে আড্ডা আর জমেনি।

বিজ্ঞাপন

জিজ্ঞেস করলাম, সময় কাটে কী করে।

–ইউটিউব দেখে। এত এত বিষয়, দেখে শেষ করা যায় না।

ফোনে অবশ্য এ কথা বলা হলো না, সব দেখবেন। তবে বিশ্বাস করবেন না সব।

খবর ঠিক না বেঠিক জানার সহজ উপায় হলো, নামকরা পত্রিকা বা টিভি চ্যানেলের অনলাইনে হাজির হওয়া।

বিনোদনের জন্য ইউটিউবে মাঝেমধ্যে আমিও হাজির হই।

সেদিন সালাহউদ্দিন লাভলুর ‘সোনার পাখি রুপার পাখি’ সিরিয়াল দেখা শুরু করলাম। চ্যানেল আইয়ে প্রচারিত হয়েছিল। হাসি বললেন, তিন/চার বছর আগেই দেখে ফেলেছেন। জানি, পেছনে থাকি, কিন্তু এত পেছনে!

বিনোদনের জন্য সালাউদ্দিন লাভলুর নাটক উত্তম। তথ্যে-তত্ত্বে, কান্না-বিষণ্নতায় ভারী হয় না। নাটক দেখার পর মনটা ভালো হয়ে যায়।

আরেকটা যোগসূত্র আছে। তাঁর অনুজ শিহাবউদ্দিন (কিসলু) নিউইয়র্কপ্রবাসী সাংবাদিক। ১২ বছর আগে নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেসক্লাব আমাকে সভাপতি ও শিহাবউদ্দিনকে সাধারণ সম্পাদক করে গঠিত হয়েছিল। প্রতিষ্ঠাকালে আমরা অনেক কাজ করেছি।

‘সোনার পাখি রুপার পাখি’ অন্য এক কারণে আমার মন কাড়ে। গ্রামীণ পটভূমিকার সিরিয়ালে বিজলি নামের এক কিশোরীর চরিত্রে অভিনয় করেন শাহনাজ সুমি। অনবদ্য। কাজল আকাঁ চোখের চাহনি, হালকা গড়ন, দুষ্টুমি, সাবলীল অভিনয় সিরিয়ালকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। সুমি রাতারাতি স্টার বনে যায়।

সুমিকে দেখে কলকাতার পাওলি দামের কথা মনে পড়ল। কোথায় যেন মিল। চেহারায়, অভিনয়ে, চাহনিতে নাকি দুষ্টুমিতে? কোথায় মিল? মেলাতে পারলাম না।

‘সাঁঝ বাতি’ নামে কলকাতার এক বাংলা ছবিতে পাওলি দামের অভিনয় দেখেছি। অবিকল যেন বিজলি (বা সুমি)। প্রবাসী পরিবারের বৃদ্ধ বাবা বা মায়ের নিজ বাসা-বাড়ি রক্ষার সংগ্রাম নিয়ে নির্মিত এই ছবিতে হাউসকিপারের চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেছেন পাওলি। ছবিতে আরও ছিলেন সৌমিত্র চ্যাটার্জি, দেব প্রমুখ।

বিকেলে চায়ের টেবিলে ছেলে এ কথা–সে কথার পর বলল, টিভিতে

আর মজা পাই না! ইঙ্গিতটা বুঝতে কষ্ট হলো না।

চারটা বছর জমজমাট ছিল। আর আড়াই মাস ছিল টান টান উত্তেজনা। সঙ্গে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও। টিভির টক, কৌতুক আর লেটনাইট প্রদর্শনীগুলো ছিল বিনোদনের অন্যতম উৎস। ২০ জানুয়ারি ট্রাম্পের বিদায়ের পর সবকিছু যেন কেমন নিরুত্তাপ। ওই কথিত বিনোদন উধাও। এই ঘাটতি হয়তো সাময়িক। ফিরে আসতে পারে ভিন্ন মাত্রায়, ভিন্ন আঙ্গিকে।

ট্রাম্প বিদায় নিয়েছেন। এ সঙ্গে কি তার সব কীর্তির বিলুপ্তি হয়েছে? এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। বাইডেন ক্ষমতা গ্রহণের একদিনের মাথায় ১৫টি অধ্যাদেশ জারি করে ট্রাম্প আমলে নেওয়া অনেক বড় বড় সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেন। এ এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন।

বাইডেনের আদেশের ফলে প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ফিরে যাবে যুক্তরাষ্ট্র। এভাবে ফিরে যাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায়। ট্রাম্প কয়েকটি মুসলিম প্রধান দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন, বাইডেন তা রহিত করেন। তিনি ট্রাম্পের মেক্সিকো সীমান্তের দেয়াল নির্মাণের আদেশ বাতিল করে দেন। এখন এটি নির্মিত হবে না।

ট্রাম্পের আমলে নেওয়া আরেকটি বড় সিদ্ধান্ত ছিল ইরানের সঙ্গে করা পরমাণু চুক্তি থেকে সরে আসা। এতে ইসরায়েল ও সৌদি আরব খুশি হয়েছিল। পরমাণু চুক্তিতে ফিরে যাওয়ার কোনো ঘোষণা বাইডেনের না থাকলেও তাঁর নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, চুক্তির অন্যান্য শর্ত ইরান মেনে চললে যুক্তরাষ্ট্রও চুক্তিটি মানবে। ভালো কথা। দেখা যাক, আগামী দিনগুলোতে গিয়ে কী দাঁড়ায়।

ইতিমধ্যে সৌদি আরবকে চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার একটি প্রস্তাব ইরান প্রত্যাখ্যান করেছে। এসবের মধ্যে গত সপ্তাহে ইব্রাহিম চৌধুরী একটি প্রতিবেদন পোস্ট করেছেন, যাতে আমাকেও ট্যাগ করা হয়েছে। তৎক্ষণাৎ রিপোর্টটি পড়া হয়নি। পরে পড়লাম এবং নিজের অজান্তেই হাত দুটি ওপরে উত্তোলিত হলো। মুখ থেকে অস্ফুট দুটি শব্দ বের হলো—আমি জানতাম!

প্রতিবেদনের সারাংশ হলো, মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে বাইডেন প্রশাসনের আমলে সহসা কোনো পরিবর্তন আসছে না। জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী মেনে নিয়ে ট্রাম্প মার্কিন দূতাবাস তেলআবিব থেকে সরিয়ে জেরুজালেমে স্থাপন করেছিলেন। বাইডেন আপাতত এটিতে হাত দিচ্ছেন না অর্থাৎ ট্রাম্পের কর্মটিই বহাল রইল।

বিজ্ঞাপন

ভেবে পেলাম না, দুহাত তুলে যে বললাম—আমি জানতাম! আসলে কিছু কি জানতাম? কি জানতাম?

কিছুই না। ওটা এক সর্বজনীন ধারণা আর স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। ওই যে বলে, ইয়ার্কি! যার-তার সঙ্গে মারো, দারোগা বাবুর সঙ্গে? অসম্ভব!

আরও খোলাসা করি এই গল্পটি বলে—

গ্রামে ধানের মাঠের আইলে পথচারীরা প্রায়ই প্রাকৃতিক কর্ম সম্পন্ন করে। এ কাজটি নোংরা, অস্বাস্থ্যকর ও পরিবেশের ক্ষতি করে। এক কৃষক ঠিক করলেন, তিনি তার জমিতে এটা হতে দেবেন না। পাহারা দেবেন যতক্ষণ পারা যায়।

কৃষকটি একদিন দূর থেকে দেখেন, তার আইলে কে যেন প্রাকৃতিক কর্ম সারছে। তিনি হুংকার ছাড়লেন, ব্যাটা দাঁড়া, তোর একদিন তো মোর একদিন। বাং (ভার বহনের বাঁশের দণ্ড) উঁচিয়ে তেড়ে গেলেন। কাছাকাছি যেতেই দেখলেন, ওই লোকের মাথায় হ্যাট, গায়ে খাকি পোশাকও দেখা যাচ্ছে। আরও কাছে যেতেই দেখলেন, ইনিতো থানার দারোগা বাবু। বাং নামিয়ে হাত জোড় করে কৃষকটি বললেন, নমস্কার দারোগা বাবু, আরও বেশি করে..., আরও বেশি করে..., বলে বলে দ্রুত প্রস্থান করলেন।

দূরে অপর এক আইল ধরে আরেক কৃষক আপন মনে গান গেয়ে যাচ্ছেন—

কানাই তুমি খেইড় খেলাও কেনে...ও কানাই...।

লেখক: নিউইয়র্ক প্রবাসী সাংবাদিক।

অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন