যুক্তরাষ্ট্রে এসেই ট্যাক্স বা আয়কর নিয়ে কিছু পড়াশুনা করেছিলাম। তো ট্যাক্স নিয়ে পড়তে গিয়ে কিছু নতুন ইংরেজি শব্দ শিখেছি। যেমন—ইনজুরড স্পাউস (injured spouse), হাফ ব্রাদার (half brother), হাফ সিস্টার (half sister), ফস্টার চাইল্ড (foster child), আনআর্নড ইনকাম (unearned income), আর্নড ইনকাম (earned income) ইত্যাদি শব্দ উল্লেখযোগ্য।

আজ আমি আনআর্নড ইনকাম নিয়ে কথা বলব। যুক্তরাষ্ট্রে ট্যাক্সের ভাষায় ইনকাম দুই ধরনের। যেমন—আর্নড ইনকাম ও আনআর্নড ইনকাম, যা বাংলা করলে দাঁড়ায় উপার্জিত আয় ও অনুপার্জিত আয়।

আমেরিকায় যারা আয় করে, তাদের সবাইকেই বাধ্যতামূলক ট্যাক্স দিতে হয়। এখানে ট্যাক্সের পরিধি ব্যাপক। চায়ের দোকানে যে ছেলেটি কাজ করে, সে যদি দিন শেষে ১০০ ডলার মজুরি পায়, তবে তার মালিক ২০ ডলার ট্যাক্স কেটে তাকে ৮০ ডলার দেবে।

বিজ্ঞাপন

আর ট্যাক্সের ২০ ডলার থেকে ১০ ডলার সরকারকে জমা দেবে। সরকার আবার তিনজন! সিটি, স্টেট ও ফেডারেল। এই তিন সরকারের মধ্যে এই ১০ ডলার ভাগ হয়ে যাবে। বাকি ১০ ডলারের সঙ্গে মালিক আরও ১০ ডলার যোগ করে মোট ২০ ডলার সোশ্যাল সিকিউরিটি অফিসে তার নামে জমা দেবে। সে যখন অবসরে যাবে, তখন এই সোশ্যাল সিকিউরিটি তাকে পেনশন দেবে। এ বিষয়ে আর এগুবো না। এখন আমি আলোচনা করব আনআর্নড ইনকাম নিয়ে।

বাণিজ্যের ছাত্র হিসেবে ট্যাক্স নিয়ে আমি বাংলাদেশেও পড়েছি। কিন্তু আনআর্নড ইনকাম শব্দটি কখনো শুনিনি। বাংলাদেশে সব আয়ই আর্নড ইনকাম বা অর্জিত আয়। আনআর্নড ইনকাম বা অনুপার্জিত আয় বলে কোনো শব্দ বাংলাদেশে ট্যাক্সের বইয়ে নেই। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ের একটা বিরাট অংশই মূলত অনুপার্জিত আয়! অনুপার্জিত আয়ের কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক। এখানে আনআর্নড ইনকাম হচ্ছে, ইন্টারেস্ট (সুদ), অ্যালমনি (খোরপোশ), চাইল্ড সাপোর্ট (শিশুদের সূত্রে পাওয়া সরকারি সহায়তা), উপহার ইত্যাদি।

যুক্তরাষ্ট্রে বছর শেষে আয়কর দাখিল করার সময় সরকার অল্প আয়ের মানুষকে অনেকগুলো ক্রেডিট বা সুবিধা দিয়ে থাকে। যেমন—চাইল্ড ট্যাক্স ক্রেডিট, আমেরিকান অপরটিউন্যাটি ক্রেডিট ও আর্নড ইনকাম ক্রেডিট ইত্যাদি। আরও অনেক ক্রেডিট আছে, তবে এগুলো কমন। উপার্জিত আয়ের ওপর একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত আর্নড ইনকাম ক্রেডিট দেওয়া হয়। অনুপার্জিত আয়ের কোনো ক্রেডিট নেই। কিন্তু এই আয়ের ওপর ঠিকই ট্যাক্স দিতে হয়।

আনআর্নড ইনকাম বা অনুপার্জিত আয় হচ্ছে সে আয়, যা উপার্জন করতে আপনি কোনো কাজ করেননি। বাস্তবে কাজ না করে উপার্জন এখানে অস্বাভাবিক ব্যাপার। তবু মানুষের এ জাতীয় আয় থাকতে পারে, যার উদাহরণ ওপরে দিয়েছি। কিন্তু বাংলাদেশে কাজ না করে উপার্জন অতি স্বাভাবিক ব্যাপার এবং কোটি কোটি মানুষ কাজ না করেও অনুপার্জিত আয় করছে। তার পরিমাণও বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা!

যেমন—ঘুষ, চাঁদা, মাস্তানি, জবরদখল, কমিশন, দালালি, ভিক্ষা, মাজারের আয়, হুজুরদের হাদিয়া ইত্যাদি।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অনেকখানি এগিয়েছে। মাথাপিছু আয়, জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বেশ কিছু দেশের চেয়ে এগিয়ে। বাল্যবিবাহ, শিশুমৃত্যু, গড়আয়ু, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানার ব্যবহারসহ বেশ কিছু সামাজিক উন্নয়ন সূচকে ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। কিন্তু এই অনুপার্জিত আয়ের ক্ষেত্রগুলো যদি বাংলাদেশে সংকুচিত হতো, তবে উন্নয়নের গতি আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেত। এই অনুপার্জিত আয় আসে কোথা থেকে?

সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত আয়ের ওপর ভাগ বসায় এই অনুপার্জিত আয়কারীরা। তারা নিজেরা কাজ করে না, কিন্তু যারা কাজ করে তাদের আয়ের একটি অংশ কেড়ে নেয় তারা। এর পরিমাণ বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা। ফলে প্রকৃত আয় উপার্জনকারীরা তাদের উপার্জনের একটা অংশ ভোগ করতে বা বিনিয়োগ করতে পারছে না। পক্ষান্তরে সমাজের বিরাট একটা জনশক্তি কাজ করছে না। এতে দেশের অর্থনীতিতে দুই দিক থেকে ঋণাত্মক প্রভাব পড়ছে।

বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে যত শিগগিরই সম্ভব, এই অনুপার্জিত আয় ভোগকারীদের থামাতে হবে। তাদের অর্জিত আয় করে খেতে বাধ্য করতে হবে। এ জন্য সুশাসনের কোনো বিকল্প নেই।

মন্তব্য পড়ুন 0