default-image

কোভিড-১৯–এর প্রকোপ শুরুর এক বছর পর আবিষ্কৃত টিকার মধ্যে এক ডোজে সম্পন্ন হওয়া জনসন অ্যান্ড জনসনেন টিকা নিলাম। আসল কথা হলো, আমি এক জনম ভিতু। টিকা না নেওয়ার মনোভাব আমার প্রথম থেকে ছিল মানে পলায়নপর মনোভাব যাকে বলে।

আমাদের ছোটবেলা ইউনিসেফের টিকার বাক্সওয়ালা স্বাস্থ্যকর্মী যেদিন স্কুলে আসত, সেদিন আমি কোনো না কোনোভাবে পালানোর চেষ্টা করতাম। জানালা দিয়ে পালাতে না পারলে প্রধান শিক্ষক (বোরখাদি) বা আরতি মাসির শরণাপন্ন হতাম। সে সময় কলেরা, যক্ষ্মা, গুটিবসন্তের টিকা দিতে স্কুলে আসতেন কর্মীরা।

আমার বাবা ডাক্তার, আমি বাসায় টিকা নেব বললে পরে ছাড়া পেতাম। তখন অন্য বন্ধুদের কান্নারত অবস্থায় দেখে আমার এত খারাপ লাগত! তবে রেহাই পেতাম না এই টিকাওয়ালাদের হাত থেকে। দুই/চার দিন পরই দেখতাম বাসায় হাজির। আম্মার বানানো চা–নাশতা খেয়ে পান খান। তাদের মুখ হাসি হাসি। আমি আব্বার কোলে বসতাম। তারপর পরই-একটা পিঁপড়ার কামড় বলেই টিকাদানের সমাপ্তি হতো। আবার কোনো কোনো পদ্ধতি ছিল গোল সুচালো রিংয়ের মতো, সেটা চামড়ার ওপর বসিয়ে একটা ঘুরান দিত। টিকা যন্ত্রটা ডাল ঘুটনির মতো, তবে আগায় সুচালো ছিল। আর এসব কারণেই টিকাদানের প্রতি আমার ভীতি ছিল কি না, কে জানে।। গত মাসে টিকা না দিয়ে দেশে গেলাম। আমার ভাই বলল, এখানে নিয়ে নে। আমরা সবাই নিয়ে নিয়েছি।

-না না, এখানে একটা নিলে পরের ডোজ এক মাস পর, ম্যাচ করতে আবার আসতে হবে। আমিতো পনেরো দিন থাকব। যাক তারপর রক্ষা।

দেশ থেকে ফিরলাম। যাওয়া–আসা সব মিলিয়ে পিসিআর টেস্ট মোট পাঁচবার করতে হলো। কাজে ফিরলাম। এর মধ্যে বড় ছেলের সহকর্মী পজিটিভ। তাই, ওদের সবার টেস্ট করতে বলল ডিপার্টমেন্ট থেকে। র‍্যাপিড টেস্ট আর পিসিআর দুটি টেস্ট করল। টেস্ট করে ফেরার এক ঘণ্টা পর কল আসল, ওর করোনা পজিটিভ। সঙ্গে সঙ্গে মাথা চক্কর দিয়ে উঠল।

বিজ্ঞাপন

আমি ইশতিয়াক রুপু ভাইকে কল দিলাম। উনি ডাক্তার ফেরদৌস খন্দকারের সঙ্গে কথা বললেন। ডাক্তার ফেরদৌস ফোনে অল্পক্ষণের মধ্যে সব করণীয় বলে দিলেন। আমি চিকিৎসকের মেয়ে বলে জন্ম থেকে সবকিছুতে হাতের কাছে পরামর্শ পেয়ে বড় হয়েছি। চরম এই দুঃসময়ে একজন অভিজ্ঞ ডাক্তার ফোনে পরামর্শ দিচ্ছেন, এটিকে আমি যারপরনাই সৌভাগ্য মনে করছি। তাও নিউইয়র্কের মতো নগরে। চব্বিশ ঘণ্টা পর পিসিআর টেস্ট রিপোর্ট আসল নেগেটিভ। মহান আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়ে তদবির করেছি। মিরাকল একমাত্র তিনিই ঘটাতে পারেন। ডা. মোহাম্মদ আলম ছোট বোন রূবিনার ক্লাস মেট। তিনিও যথেষ্ট খোঁজখবর নিয়েছেন। নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির মানুষ বিপদে কাকে পাশে পেয়েছেন, নিশ্চয়ই মনে রাখবেন। আমি অন্তত রাখব।

বাংলাদেশে খুব সিম্পল বিষয় নিয়ে ঢাকায় দুজন ডাক্তার বন্ধুকে টেক্সট করেছিলাম, একজন বেশ সময় নিয়ে উত্তর দিয়েছিলেন। আরেকজন কিছুটা বিরক্তি সহকারে জানিয়েছিলেন উত্তরটি। যাতে করে বুঝে নিতে অসুবিধা হয়নি, দেশে ওরা অনেক বেশি প্রফেশনাল। আমার উচিত হয়নি টেক্সট করে বিরক্ত করা।

বাসায় আর ঝুঁকি নিতে কেউ রাজি নয়। পরিচিত প্রায় সবাই টিকা নিয়েছে। মেয়ে আমাদের জন্য ব্রুকলিন পেনসিলভানিয়া অ্যাভিনিউয়ের এনওয়াইপিডির কমিউনিটি সেন্টারে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করল। বৃহস্পতিবার ভোর ছয়টায় আমরা পৌঁছে দেখি, কিছু মানুষ অপেক্ষমাণ। আমরা অনলাইনে সব সার্ভে, ফরম পূরণ করে এসেছি। সুতরাং চমৎকার সুন্দর পরিবেশে দূরত্ব মেনে মেনে আমাদের টিকা গ্রহণের কাজ শেষ হলো। পনেরো মিনিট পর্যবেক্ষণে রাখল। কোনোরকম অসুবিধা না দেখায় সিল–ছাপ্পর মেরে টিকার রেকর্ড কার্ড দিল। এখন পাসপোর্টের সঙ্গে এই কার্ড দেখালে ভ্রমণ সহজ হবে। পিসিআর টেস্টের জটিলতা মুক্ত। যিনি টিকা দানকারী তিনি এনওয়াইপিডির দক্ষ প্যারামেডিক। তিনি বলেছিলেন,

-রিলাক্স; ইউ ক্যান ফিল অ্যা পিঞ্চ।

কিন্তু আমি কিছু বোঝার আগেই বললেন, ‘ডান’ (কাজ শেষ)।

যারা আমার মতো ভিতু তাদের বলছি, একদম ভয়ের কিছু নেই। বিষয়টি সহজ এবং আপনাকে আত্মবিশ্বাস এনে দেবে মৃত্যুঞ্জয়ী জনসন অ্যান্ড জনসনের কোভিড-১৯ টিকা। এজন্য দুবার টিকাকেন্দ্রে যেতে হবে না। এক ডোজেই করোনাকে রুখে দেবে। তবে হ্যাঁ, টিকা নিয়ে কর্মস্থলে গিয়েছি। বাসায় ফিরে খেয়ে ঘুমিয়েছি। ঘুমের মধ্যেই কপাল পুড়ে যাওয়ার মতো তাপমাত্রা অনুভব করলাম।

হ্যাঁ, জ্বর আসল। তাপমাত্রা ১০২ এর মতো।

বহুদিন জ্বর হয়নি আমার। আব্বাকে মনে পড়ে। জ্বর হলে কত মায়া করে খাবার তুলে খাওয়াতেন। কত যত্ন করে মাথায় ঠান্ডা পানির ধারা দিয়ে ধুয়ে দিতেন। ওষুধ খাইয়ে দিতেন। আমার মেয়ে সাদা রুমাল ভিজিয়ে জলপট্টি দেয়। আমি কমফোর্টারের ভেতরে শুয়েও কাঁপতে থাকি শীতে। রাতভর জ্বরের ঘোরে কাটাই। টাইলেনল দুই ডোজ নিয়ে ঝরঝরে অনুভব করি পরদিন। স্কুল কামাই হলো একদিন। তা হোক। জীবন তো আগে।

জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকাটি অ্যাডেনোভাইরাসভিত্তিক, ভ্যাকসিনগুলো নিয়ে কয়েক দশকের গবেষণা থেকে বেরিয়ে এসেছে। জুলাইয়ে, প্রথমটি সাধারণ ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত হয়েছিল। জনসন অ্যান্ড জনসনের তৈরি ইবোলার একটি ভ্যাকসিন। সংস্থাটি জিকা ও এইচআইভিসহ অন্যান্য রোগের অ্যাডেনোভাইরাসভিত্তিক ভ্যাকসিনগুলোর জন্যও ট্রায়াল চালাচ্ছে। কিছু অন্যান্য করোনাভাইরাস ভ্যাকসিনও অ্যাডেনোভাইরাসগুলোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়। যেমন, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা একটি শিম্পাঞ্জির অ্যাডেনোভাইরাস ব্যবহার করে তৈরি করেছে।

জনসন অ্যান্ড জনসন কোভিড-১৯-এর অ্যাডেনোভাইরাসভিত্তিক টিকাগুলো ফাইজার ও মাডার্নার এমআরএনএ টিকার চেয়ে বেশি কড়া। ডিএনএ আরএনএর মতো ভঙ্গুর নয় এবং অ্যাডেনোভাইরাসগুলোর শক্ত প্রোটিন কোট ভেতরে জিনগত উপাদানগুলো সুরক্ষিত করতে সহায়তা করে। ফলস্বরূপ, জনসন অ্যান্ড জনসন টিকাটি চার ডিগ্রি ফারেনহাইটে তিন মাস পর্যন্ত ফ্রিজে রাখা যেতে পারে।

জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকা নিয়ে আমি কোভিড-১৯ জয় করার জন্য পুরোই প্রস্তুত। বাদবাকি আল্লাহর ইচ্ছা। অতিমারি করোনার ছোবলে বহু প্রিয়জন বিদায় নিয়েছেন। আমরা অন্তত করোনায় আক্রান্ত হলেও তাকে রুখে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত।

মানুষের জীবন মহামূল্যবান। একটাই জীবন। যেকোনোভাবে সবাই চায়, কোনো একটা অজুহাতে জীবন বাঁচাতে হবে। নিজের জন্য বাঁচতে হবে। সঙ্গীর জন্য বাঁচতে হবে। সন্তানের জন্য বাঁচতে হবে। সুতরাং টিকা নিন, জীবন সুরক্ষিত করুন।

বিজ্ঞাপন
অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন