default-image

মেয়েদের বলছি, বুদ্ধি ও মেধার চেয়ে বড় কিছু নেই। শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। চর্চায় বুদ্ধি বিকশিত হয়। প্রকৃত শিক্ষা একজন নারীর মধ্যে আত্মসম্মানবোধ জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। সস্তা জনপ্রিয়তা নয়, সম্মানবোধ নিয়ে কাজ করা উচিত। ব্যক্তিত্ব অর্জন করতে হবে। তাই শিক্ষিত হয়ে মান মর্যাদা নিয়ে যোগ্য কাজে যোগ দিতে হবে। শিক্ষা শিক্ষা এবং শিক্ষা। সৌন্দর্য বা যৌবন চিরদিন থাকবে না। এগুলোকে পুঁজি করে বড় হওয়ার চেষ্টা না করে শিক্ষিত হয়ে মেধা ব্যবহার করে বড় হওয়ার চেষ্টা করা উচিত।

দুটি শিশু কন্যাকে নিয়ে একা এক ভারতীয় সিঙ্গেল মা, শ্যামলা গোপালন ঘরে ও বাইরের তীব্র লড়াই লড়েছিলেন বলেই আজ আমরা যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে একজন নারীকে পাচ্ছি। হোম সায়েন্স বা গার্হস্থ্য বিজ্ঞান নিয়ে স্নাতক করেছিলেন যে মেয়ে, তাঁর স্বপ্ন ছিল ভিন্ন। ছোটখাটো চেহারার এই অতি মেধাবী ছাত্রীর ইচ্ছে ছিল বায়োটেকনোলজি নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের। কিন্তু ভারতের যে কলেজে তিনি পড়তেন, সেই কলেজে তখন তেমন কিছু পড়ানোই হতো না। বাবা-ভাইয়েরা মজা করে বলতেন ‘হোম সায়েন্স’ সাবজেক্টে আসলে ঠিক কী শেখানো হয়? বাসন মাজা? রান্নাবান্না? মনে মনে দুঃখ পেলেও মেয়েটি চুপ করে শুনত।

‎এর পর একটি পত্রিকার মাধ্যমে সেই মেয়ে আবিষ্কার করেন যুক্তরাষ্ট্রে বায়োটেকনোলজি পড়ানো হয়। কাউকে কিছু না জানিয়ে তিনি মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার আবেদন করেন। কী আশ্চর্য, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে থেকে তাঁর ডাক আসে। এমন বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডাক পাঠিয়েছে শুনে অবাক হয়ে যান তাঁর বাবা ও দাদারা। তাঁদের অতি রক্ষণশীল তামিল পরিবারে কেউ কখনো ভারতের বাইরে পা রাখেনি। তাই পরিবারের পক্ষ থেকে আসে প্রবল আপত্তি। কিন্তু পরিবারের প্রবল আপত্তির মুখে বাবা তাঁর মেয়ের পক্ষ নেন এবং বলেন, তাঁর কাছে যা টাকাপয়সা আছে, তা দিয়ে খুব জোর এক বছরের পড়াশোনার খরচ চলবে। মেয়েটির উত্তর ছিল, সেটাই যথেষ্ট। বাকি পড়ার খরচ তিনি পার্ট টাইম চাকরি করে জোগাড় করবেন।

বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট তিনি। প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ, প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত ও প্রথম এশিয়ান হিসেবে তিনি এই পদে বসতে যাচ্ছেন। এই ঐতিহাসিক জয়ের পর কমলা হ্যারিস তাঁর মা সম্পর্কে কী বললেন? বললেন, মা-ই তাঁকে শিখিয়েছেন ‘বাড়িতে বসে থেকে অভিযোগের পর অভিযোগ না করে বরং মাঠে নেমে লড়াইটা করো।’

১৯৫৯ সালে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের অ্যাডমিশনের লাইনে শাড়ি, হাওয়াই চটি পরা যে মেয়েটি দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁর নাম শ্যামলা গোপালন। তাঁর একটু পেছনেই দাঁড়িয়েছিলেন আরেক বিদেশি ছাত্র। জ্যামাইকান সেই কালো ছেলেটির নাম ডোনাল্ড হ্যারিস। জ্যামাইকান সে ছাত্র স্কলারশিপ পেয়ে অর্থনীতিতে পিএইচডি করতে আসেন।

মার্কিন রাজনীতিতে সে সময় ভীষণ টালমাটাল সময়। কালো মানুষদের অধিকারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে শুরু হয়ে গেছে ‘সিভিল রাইটস মুভমেন্ট’। ডোনাল্ড হ্যারিস নামের কালো ছেলেটি আন্দোলনে জড়িয়ে যান। ১৯৬০ সালে একটি স্টুডেন্ট ফোরামে কালো মানুষদের অধিকারের পক্ষে একটি অসাধারণ বক্তৃতা দেন ডোনাল্ড হ্যারিস। বক্তৃতা শুনে মুগ্ধ হন সেই শাড়ি পরা মেয়েটি। শ্যামলা গোপালন ডোনাল্ড হ্যারিসের সঙ্গে নিজেই আলাপ করেন। প্রথম আলাপেই প্রেম, আর ১৯৬৩ সালে বিয়ে। ভারতীয় মেয়েটি বিয়ের পর শ্যামলা গোপালন থেকে হয়ে যান শ্যামলা হ্যারিস।

এর পর জন্মায় তাঁদের প্রথম সন্তান; মেয়ে। মা লক্ষ্মীর নামে নাম মিলিয়ে মেয়েটির নাম রাখেন তাঁরা কমলা দেবী’। মার্কিন সিভিল রাইটস মুভমেন্টে ভীষণভাবে জড়িয়ে পড়েন শ্যামলা ও ডোনাল্ড হ্যারিস। সেই প্রতিবাদ মিছিলের ভিড়ে শিশু কন্যাটি স্ট্রলারে বসে বসে দেখেছিল বাবা-মায়ের সেই আন্দোলন। পৃথিবীর ইতিহাসে ঘটে যাওয়া সেই ঐতিহাসিক ঘটনা ড. মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের নেতৃত্বে মার্কিন কালো মানুষদের অধিকারের লড়াই অবশেষে জয় পায়।

সে লড়াই থামতে না থামতেই শুরু হয় শ্যামলা হ্যারিসের নিজের জীবনের লড়াই। ১৯৭০ সালে দুটি শিশু কন্যা নিয়ে ডিভোর্স হয়ে যায় ডোনাল্ড হ্যারিসের সঙ্গে। কমলা দেবী হ্যারিস ও মায়া হ্যারিসকে নিয়ে সিঙ্গেল মাদারের এর পরের লড়াইটা ছিল একার এবং ব্যক্তিগত। পিএইচডি শেষ করে শ্যামলা হ্যারিস শুরু করেন ব্রেস্ট ক্যানসার নিয়ে গবেষণা। গবেষক হিসেবে তাঁর সুখ্যাতি ছড়িয়ে পরে সারা পৃথিবীতে। গবেষণার কাজে প্রায় অর্ধেক পৃথিবী ঘুরে ফেলেন এই পাঁচ ফুট উচ্চতার ছোটখাটো মানুষটি।

শিশু মেয়ে দুটিকে কখনো ডে কেয়ারে রেখে, কখনো বন্ধুর বাড়িতে রেখে নিজের পড়াশোনা, গবেষণা, চাকরি চালিয়ে গেছেন শ্যামলা। একটু মানসিক শান্তির জন্য মেয়েদের নিয়ে গেছেন কখনো চার্চে, কখনো মন্দিরে। তাদের শিখিয়েছেন রান্না করতে, নিজেদের কাজ নিজে করতে। আর শিখিয়েছেন নিজের অধিকারের জন্য লড়াই করতে।

স্ট্রলারে বসে বসে যে মেয়েটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অধিকারের লড়াইটা দেখেছিল, আর দেখেছিল নিজের মায়ের ব্যক্তিগত জীবনের আপসহীন লড়াই, সেই ছোট্ট মেয়েটাই আজ নামকরা আইনজীবী ও মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা দেবী হ্যারিস!

অনেক কিছুতেই প্রথম কমলা হ্যারিস। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট তিনি। প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ, প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত ও প্রথম এশিয়ান হিসেবে তিনি এই পদে বসতে যাচ্ছেন। এই ঐতিহাসিক জয়ের পর কমলা হ্যারিস তাঁর মা সম্পর্কে কী বললেন? বললেন, মা-ই তাঁকে শিখিয়েছেন ‘বাড়িতে বসে থেকে অভিযোগের পর অভিযোগ না করে বরং মাঠে নেমে লড়াইটা করো।’

এই ইতিহাসের সঙ্গে আমরা যারা শেকড় উপড়ে এ দেশে এসেছি, যাদের শরণার্থীর মতো জীবন, অভিবাসী শব্দটি শুনতে শুনতে যাদের মন ভারী হয়, তারাও এ দেশে জন্ম নেওয়া সন্তানদের যত্ন নিতে হবে; তাদের বুকের ভেতর স্বপ্নের বীজ বুনে দিতে হবে, যাতে কমলা হ্যারিসকে দিয়ে যে শুরুটা হলো তা বহমান থাকে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0