default-image

অখণ্ড ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চল রাজ্য আসামের বাণিজ্যিক শহর করিমগঞ্জ। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় অনেকের আশা ছিল, করিমগঞ্জ শহর যোগ দেবে নতুন দেশ পাকিস্তানে। ওপারের হিন্দু-মুসলিম যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিল, তাঁরা থাকবেন বিশাল দেশ ভারতের সঙ্গে। কুশিয়ারা নদীর পূর্বপাড়ে ছোট্ট মফস্বল শহর করিমগঞ্জের লাগোয়া সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার অধ্যুষিত বসতি গ্রাম বটরশি। রিকশা চলার পথে গেলে বিশ মিনিটে পৌঁছা যায় আমাদের নানুর বেড়ে ওঠা সাজানো-গোছানো কাঠ আর টিনের তৈরি বাসা-বাড়ির গ্রামে।

প্রতিটি পরিবারের দায়িত্ববানরা শিক্ষিত হওয়ায় বাকি সদস্যরা লেখাপড়ায় মনোযোগী থাকতেন স্বাভাবিকভাবে। নানিরা ছিলেন এক ভাই, এক বোন। সুদর্শন ভাই তখন স্কুলের দশম শ্রেণিতে। বিকেলে স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখলেন স্থানীয় খ্রিষ্টান মিশনারির এক বয়স্ক সদস্যকে সমাহিত করার আনুষ্ঠানিকতা চলছে। সবাই চলে যাওয়ার পর নানার (নানির ভাই) মাথায় চাপল দুষ্ট বুদ্ধি। সদ্য সমাহিত করা কবরের ওপর দাঁড়িয়ে প্রশ্রাব করে দিলেন। বাসায় ফেরার পর সে রাতে বিপত্তির শুরু। মাঝ রাতে ঘুম থেকে উঠে যে পাগলামি শুরু করেছিলেন, তা বয়ে বেড়ালেন আমৃত্যু।

অনেক চিকিৎসার পর ভালো না হলে পরিবার শরণাপন্ন হলেন পীর ফকিরের। সেখানেই জানা গেল আসল ঘটনা। সুদর্শন কিশোর ‘নানা’কে এক ‘দুষ্টু পরি আছর’ করেছে। যার সমাধিতে নানা প্রশ্রাব করেছিলেন, তিনিও নাকি সুদর্শন ছিলেন। কয়েকজন পরির সঙ্গে প্রেমও ছিল। রাত গভীর হলে ভালো পরিরা সেজেগুঁজে আসত সেই খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকের কাছে। রাতভর চলতো আনন্দ আর ফুর্তি। ভোরের আলো ফোটার আগ পর্যন্ত। সেই পরির দলের একজনের কাছে নানার এই বেয়াদবি ভালো লাগেনি। তাই পরিদের মধ্যে দুষ্টু এক পরি সিদ্ধান্ত নেয়, নানার ওপর আসর করে তাঁকে সারা জীবন শাস্তি দেবে। তাই হলো। অনেক কষ্ট আর মানসিক যাতনা সহ্য করে নানির একমাত্র সুদর্শন ভাইটি অকালে চলে গেলেন পরপারে।

বিয়ের সুবাদে নানির সংসার শুরু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ থানার আমনিয়া গ্রামে। নিজ মায়ের কাছ থেকে অসমিয়া ভাষায় পাঠ্য পাঠের পাশাপাশি শিখেছিলেন গুপ্ত এল্‌মের দোয়া-দরুদ। নিজের জানা নির্দিষ্ট এল্‌ম বলে যে, কাউকে কোন কাজের শুভ বা অশুভ ফলাফলের সংবাদ কাজ শুরুর পূর্বেই বলে দিতে পারতেন। এমনি আরও বিশেষ কিছু এল্‌ম জানা ছিল নানুর।

বিজ্ঞাপন

সুনামগঞ্জ এলে বেশির ভাগ সময় নানিকে জায়নামাজে বসে হাতে লম্বা তসবি নিয়ে নামাজ-কালাম পড়া অবস্থায় দেখেছি। সারাক্ষণ দোয়া পাঠ করে অসুস্থ আম্মাসহ প্রথমে আপন ভাই-বোনদের, পরে ক্রমান্বয়ে বাকি চাচাতো, মামাতো ও খালাতো ভাই-বোনদের মাথা ও শরীরে দোয়া পড়ে ফুঁ দিতেন। সব শেষে বাসার কাজের লোকদের। আমাদের পুরোনো ইট-সুরকির বাসার বয়স অনেক ছিল। চল্লিশের দশকে কেনা শত ডেসিমেল পরিমাণ এই বাসার আগের মালিক ছিলেন সম্ভ্রান্ত হিন্দু নেতৃস্থানীয় ব্যবসায়ী পরিবার। চল্লিশের দশকে তৈরি করা বাসার টয়লেট ছিল, সে সময়ের আধুনিক কমোড বসানো ও সেফটি ট্যাংক সংযুক্ত। যখন শতকরা ৯৯ ভাগ এলাকাবাসী ব্যবহার করতেন স্থানীয় পরিচ্ছন্ন কর্মী দ্বারা প্রতিদিন মুষলধারে বদল সুবিধার টয়লেট। কেউবা উন্মুক্ত রাস্তার ঢালুতে বা ছোট ছোট আকারের বন জঙ্গলে সারতেন প্রাকৃতিক কর্ম।

বাসার মুরব্বি সূত্রে জানা যায়, অতীতের কোন এক সময় দুটো অপঘাতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে আমাদের বাসায়। ৪৫ বছর আগে সেই সময়ে ৮০ বছরের এক প্রবীণের কাছে শুনেছিলাম, একসময় শহর ছিল খুবই ছোট। বর্তমান কোর্ট মসজিদের সামনের পুকুর পর্যন্ত। এরপর শুরু হতো, কোনক্রমে দুজন হেঁটে চলার পথ যার দুপাশে ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ণ। পথের ডানে-বামে বিচ্ছিন্ন দু-একটি ঘরবাড়ি। পেছনে বিরাট আর ভয় জাগানিয়া জলাশয়। সেই ভয় জাগানিয়া চিত্র বর্তমানে প্রিয় শহর বা পুরো জেলার কোন জনপদে আছে কিনা, সন্দেহ।

ফিরে আসি নানি প্রসঙ্গ। নানুর ভাষ্যমতে, ৬ ভাই-বোনের মধ্যে পঞ্চাশের দশকের শেষে ক্রমান্বয়ে জন্ম নেওয়া বড়দের নাকি ভীষণ ক্ষতি করতে চেয়েছিল বাসায় থাকা দুজন অশরীরী আত্মা। যাদের দুজনকে নানি স্বচক্ষে দেখেছেন। একজন বাস করত বাসার সামনে বসার ঘর লাগোয়া আমড়া গাছে। অনেকবার শোনা গল্পটি আজ আবার বলছি। কোন একদিনের শেষ বিকেলে নানি টের পেলেন, অতৃপ্ত একটি অশান্ত আত্মা বাসার এক অংশে অবস্থান নিয়েছে নবজাতক শিশুর ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে। মাত্র তিন মাস বয়সী নবজাতক আমাকে শোয়ার ঘর থেকে বাইরের ঘরের দেয়াল ঘেঁষে বিছানায় শোয়ানো হলো।

মাগরিবের আজান শুনে নানি নামাজে দাঁড়াতেই অশুভ সংকেত পেয়ে গেলেন। দৌড়ে পাশের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলেন, কঙ্কাল সাদৃশ্য অস্বাভাবিক লম্বা, পুরো মাথা মুড়ানো চোখ জ্বলজ্বল করা নগ্ন শরীরের একজন আমার ওপর উপুড় হয়ে আছে। এল্‌ম জানা আমাদের নানু চট করে বুঝে ফেললেন, ওই দুষ্টু প্রেতের উদ্দেশ্য কি? নানি উচ্চস্বরে কোরআনের আয়াত পাঠ শুরু করলে বর্ণিত দুষ্টু আত্মা রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে এক জোড়া জ্বলন্ত চোখের বিষ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ঘরের দক্ষিণ পাশের জানালা দিয়ে আমড়া গাছে উঠে যায়।

নানির বর্ণনায়, সেই দুষ্টু প্রেতের কোমর পর্যন্ত ঝোলানো চিকন টিকির শুরু ছিল তেলতেলে মোড়ানো বিরাট মাথার পেছন থেকে। আর লম্বা লম্বা পায়ের লম্বা লম্বা নখের সঙ্গে চোখে পড়ার মতো ছিল দুহাঁটুর সামনের হাড় দুটি (চলতি ভাষায় বলা হয় গিলা), যা অস্বাভাবিক বড় আকারের। লিক লিকে শরীরের সেই প্রেতের উদ্দেশ্য ছিল, আমাকে উঠিয়ে নিয়ে পেছনের পুকুরে চুবিয়ে মারার। যা পরে একজন পীর সাহেব সেই প্রেতকে জিজ্ঞাসা করে জেনেছিলেন।

আরেকজন ছিলেন ফাঁস দিয়ে মৃত পরিবারের এক ভ্রাতৃবধূ। যিনি পুরো বাসা ঘুরে বেড়াতেন একান্ত মনে, কারও ক্ষতির উদ্দেশ্য নয়। নানির ভাষ্যমতে, তার আশ্রয় ছিল বাসার টয়লেট লাগোয়া বট গাছে।

শেষ কথা। বছর দশেক আগে আমাদের এক চাচা জীবননাশের মুখোমুখি হয়েছিলেন দুবার। প্রথমবার বাসার উত্তর সীমানার আমড়া গাছ কাটার পর। আরেক বার টয়লেট সংলগ্ন বট গাছ কাটার পর। দুজন প্রেতের সমান অভিযোগ, চাচা নাকি তাদের শতকালের বসতি ভেঙে দিয়েছেন। লন্ডনপ্রবাসী আমাদের একমাত্র মামা থাকতেন সুনামগঞ্জে আমাদের বাসায়। কলেজে পড়াশোনা করার সময়। নব্বইয়ের দশকে লন্ডনে একবার গল্পচ্ছলে বললেন, ছোট বেলা তুমি নাদুস-নদুস আর হাসি হাসি মুখের ছিলে বলে তোমার ওপর জিন-পরিদের নজর ছিল।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0