আমার শাশুড়ি মায়ের সঙ্গে প্রথম দেখাতেই আমি তাঁর রূপে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। ধবধবে ফরসা, কাজল কালো ডাগর চোখ, পানপাতা চিবুক। আমার শাশুড়ি এত রূপবতী! ভাবতেই বুকের ভেতর কেমন সুখ সুখ বাতাস বইতে শুরু করল। আমার চোখে ছিল মুগ্ধতা, আর তাঁর মনে ছিল মমতা। ছয় ছেলের সংসারে তাঁর কোনো মেয়ে ছিল না। আমি ছিলাম তাঁর বড় ছেলের বউ। তিনি মূলত ছেলের বউ নয়, প্রকারান্তরে মেয়েকে বরণ করেছিলেন। প্রথমবার শ্বশুরবাড়ি গিয়েও আমি সালোয়ার-কামিজ পরেছিলাম তাঁর অনুরোধে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার তো মেয়ে নেই, তুমি ছাড়া আর কে আমার শখ মেটাবে!’

আমার স্বামী চা বাগানের ম্যানেজার ছিলেন। সংসার গড়তে আমাকে চা বাগানে চলে যেতে হয়। আমাকে বিদায় দিতে গিয়ে তিনি হাপুস নয়নে কাঁদতেন। আমার জন্য কত কী যে হাতে তৈরি করে পাঠাতেন। আমের আচার, আমসত্ত্ব, নাড়ু, মুড়ি, খই—কত কী। এসবের ভেতর তাঁর মমতার ছোঁয়া ছিল আমাদের কাছে আশীর্বাদস্বরূপ।

বিজ্ঞাপন

বিয়ের পর একটা চমৎকার দৃশ্য দেখতে পাই শ্বশুরবাড়িতে। আমার শাশুড়ি মা রান্না করছেন, আর তাঁর ছেলেরা মাকে ঘিরে রয়েছে। কেউ সবজি কাটছে, কেউ পেঁয়াজ কাটছে, কেউ-বা মাটির চুলায় লাকড়ি ঠেলছে। কেমন যেন একটা পিকনিক পিকনিক আমেজ। আমি সেই পিকনিক আমেজে শরিক হতে এক মুহূর্ত দেরি করতাম না। প্রসঙ্গত, আমার তিন দেবর তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল। ছুটিতে বাড়ি এলেই ওরা মাকে এভাবে সাহায্য করত।

আমার শাশুড়ি ছিলেন স্বল্পভাষী। কিন্তু আমার সঙ্গে তিনি অনেক কথা শেয়ার করতেন। আমি জানতাম শ্বশুর আব্বা তাঁকে খুবই পছন্দ করে বিয়ে করেছেন। একদিন তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘মা আপনি চোখে কাজল দিতেন আগে?’ তিনি বললেন, ‘না, দিতাম না!’ বললাম, ‘কেন মা আব্বা আপনাকে কাজল দিতে বলতেন না? আপনার এত সুন্দর চোখ!’ এ কথার আর উত্তর দেননি। বিষণ্ন দৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে থাকলেন। বুঝতে পারি রূপসী প্রেমিকা যখন সংসারে বউ হয়ে আসে, তখন ঘরের দামি আসবাবপত্রের মতো তার অবস্থানও নির্ধারিত হয়ে যায়।

ছোট বেলা থেকে আমার অভ্যাস ছিল অল্প করে বারবার খাওয়া। আমার শাশুড়ি সকৌতুকে আমার এই অভ্যাসটাকে দেখতেন। বলতেন, ‘আমার মা মুরগির বাচ্চার মতো খুঁটে খুঁটে খায়।’ তাঁকে নিয়ে আমার অনেক স্মৃতি। এত কম পরিসরে তা বাধা যাবে না। আজ তিনি আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু স্মৃতির সুরভি ছড়িয়ে আছে আজও আমাদের মনে। পরপারে ভালো থাকবেন মা!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0