default-image

বৃহত্তর সিলেটের আনাচে কানাচে জন্মলাভ করেছেন শত শত সাধক আর পীর মাশায়েখ। জীবন নিয়ে যাদের চিন্তা ও ভাবনার চর্চা ছিল অনেক উঁচু পর্যায়ে। যাপিত জীবনে কত হাজারো জিজ্ঞাসা যে আজও অমীমাংসিত থেকে গেল, তার হিসাব কয়জনে রাখে? কেউ কেউ বলেন, জীবন তো একটাই। তাকে নিয়ে এত ভাবনার প্রয়োজন কি? যেভাবে চলছে সেভাবে জীবনকে চলতে দিন। সবুজের সমারোহ নিয়ে ছোট বড় পাহাড় ঘেরা সমৃদ্ধ এই জনপদের গ্রামগঞ্জ আর শহরে লুকিয়ে আছে সাধক আর সাধনার চমকে ওঠার অজানা কাহিনি।

সিলেটের দক্ষিণে খোয়াই নদী বিধৌত অঞ্চল হবিগঞ্জ। যে নদীর শুরু ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আর্থারমুড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চল, যা ভারতের খোয়াই জেলার আরও উত্তর–পূর্বে। আর সেই উৎস থেকে খোয়াই নদী ক্রমে পাহাড়–পর্বত আর ঘন সবুজকে আর্দ্র ভালোবাসায় সিক্ত করে করে ছোট বড় জনপদে ফসলে, ফলে আর ফুলে সমৃদ্ধ করে করে কখনো আলতো বেগে, কখনো রুদ্রমূর্তি ধারণ করে নেমে এসেছে শ্রীহট্টের দক্ষিণাঞ্চলে। সুরমা অববাহিকার শত নদীর এক নদী খোয়াইর তীরে গড়ে ওঠা হাজারো গ্রামের একটি মাঝারি বসতের গ্রাম ঘরগাঁও। সেই গ্রামের এক অবস্থাসম্পন্ন ভূস্বামী ও মাঝারি মাপের গৃহস্থ সৈয়দ শাহ ইস্রাইল। সহজ–সরল জীবনযাপন আর সৃষ্টিকর্তার ডাকে পাঁচবার তাকে স্মরণ আর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে দিন চলতো পরম প্রশান্তি নিয়ে। এলাকার নামকরা সরপঞ্চ ছিলেন। গ্রাম্যবিচারে সৈয়দ সাহেবের ছিল নামডাক। এমনকি সাত পরগনার আদালতে বিচারক হিসাবে ডাক পড়ত। আরবি ও ফারসি ভাষায় দখল ছিল বেশ মোটা দাগের।

বিজ্ঞাপন

জ্ঞানভিত্তিক আলাপে সৈয়দ শাহ ইস্রাইলের স্থান থাকত সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে। জমি–জিরাত চাষাবাদ আর ভাই ও স্বজনদের সহায়তা করতে কখনো কুণ্ঠিত হননি। বৈবাহিক জীবনের মধ্যকালের সামান্য পূর্বে এক পুত্রসন্তানের পিতা হলেন। নাম রাখা হল সৈয়দ শাহ ইলিয়াস। সন্তান স্বাভাবিক নিয়ম ও সামাজিক অনুশাসন মেনে বড় হতে লাগল। তবে কৈশোর পার হওয়ার পর চলনে–বলনে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে লাগল। মৌনতা ও ভাবনায় মগ্ন থাকায় যে আনন্দ পেতে তিনি শুরু করলেন, তা প্রথম টের পেলেন আপন মা। তরুণ শাহ ইলিয়াস ছিলেন অতীব সুদর্শন। তুলনামূলক অবস্থাপন্ন পরিবারের সন্তান হিসেবে পিতা–মাতার পাশাপাশি পরিবারের আরও বয়োজ্যেষ্ঠরাও তাঁকে ভালোবাসতেন। কেননা বয়োজ্যেষ্ঠদের কেউ কেউ সৈয়দ শাহ ইলিয়াসের মধ্যে বাল্যকাল থেকে আধ্যাত্মিক ভাবনা ও চর্চার লক্ষণ দেখতে পান। যার একটি বিশেষ গুন ছিল প্রকৃতিকে অন্তর দিয়ে ভালোবাসা ও নদীর পাড়ে বসে নদীর সঙ্গে আলাপন। নদীর তীরে তৈরি বেশ বড় আকারের গৃহস্থ বাড়ি ঘেরা ছোট বড় সবুজ বৃক্ষ পরিচর্যায় শাহ ইলিয়াসের আগ্রহ সবার চোখে পড়ত। মানবতার শিক্ষা যেন মায়ের উদরে তিনি পেয়েছিলেন।

সে সময়ে সামাজিক নিয়ম অনুযায়ী, গৃহ সেবায় যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন, তাদের সঙ্গে মানবিক আচরণের ঘাটতি ছিল প্রচুর। ছোট বেলা থেকেই সৈয়দ শাহ ইলিয়াসের তা নজর ও মননে আসে। এ নিয়ে পিতা–মাতার সঙ্গে মতবিনিময় করতেন নিয়মিত। কখনো সময় বুঝে অমানবিক কোনো বিষয় ঠেকাতে বাঁধা দিয়েছেন। তাঁর বাল্যবিধি উদাসীন ছিলেন। পরিবারবেষ্টিত থাকা অবস্থায় এক দাসীর মুখে শোনেন দুটো শব্দ ‘দিন গিয়া’ অর্থাৎ দিন যায়। সেই দুটি শব্দ ইলিয়াসের ভাব রাজ্যে প্রলয়ংকরী ঝড় তোলে। উতলা বাসনার সাগর উত্তাল তরঙ্গে বিক্ষুব্ধ রূপ নিল। ইলিয়াসের হৃদয়ে একই জিজ্ঞাসা, সত্যি তো, দিন চলে যায়। দিন তো চলা গিয়া। হায় হায় আমি কি করলাম! কার আশায় কার ভরসায় আজও আমি অপেক্ষায়। এত সুন্দর নশ্বর পৃথিবীতে এসে আমি কি করিলাম। প্রথমে মাকে জিজ্ঞেস করেন, পরে পরিবারের বাকি সদস্যদের। এক সময় পাড়া–প্রতিবেশীদের কাছে একই প্রশ্নের উত্তর জানতে চান। কি করলাম এই ভবের দুনিয়ায়! দিন তো দৌড়াচ্ছে! হায় রে হায়! দিন তো চলে যায়। সেই ভাবনা ভাবতে ভাবতে সৈয়দ শাহ ইলিয়াস উত্তর দিকে হাঁটতে শুরু করলেন, যা এসে থামল নিজ গ্রাম ঘরগাঁও থেকে পাক্কা দুই মাইল দুরে এক গভীর জঙ্গলে। প্রকৃতির কোলে চড়ে চলছে শাহ ইলিয়াসের সাধনা আর অদম্য আগ্রহে খোঁজা মাত্র দুটো শব্দের সঠিক উত্তর। ‘দিন গিয়া’ মানে ‘দিন যায়’।

আমাদের মানবজীবনে কত তাড়া আর পেরেশানি, জীবনকে নিজের মত করে ধরতে বা আগলে রাখতে। ধীরে ধীরে সৈয়দ সাহেব নিজের তৈরি অরণ্য ঢেড়ায় ঘোরতর তপস্যায় মনোনিবেশ করলেন। সময় বয়ে যায়। তপস্যা চলছে নদীর স্রোতের আদলে ও ভাষায়। কথিত আছে, ঘোর এক অমাবস্যা রজনীতে দেখা গেল আকাশ থেকে সরাসরি এক অতীব উজ্জ্বল কিরণ সরাসরি নেমে এসেছে শাহ ইলিয়াসের সাধনা শ্রমে। লোক মুখে জানা গেল, কিরণটা ছিল চাঁদের উজ্জ্বলতার সমান এবং আকার ছিলে চুড়ির ন্যায়। তখন থেকে সাধনা শ্রমের নাম হলো চন্দ্রচুড়ি। সাধনার দুটো ফল ও পুরস্কার মিলে গেল দুই রূপে—জীবনের যেতে যাওয়া সময়কে ব্যয় করলেন মানবসেবায় আর উপাধি পেলেন ‘কুতুব-উল-আউলিয়া’। পরে এই নামেই খ্যাতি লাভ করেন সৈয়দ শাহ ইলিয়াস। যার পূর্বতনে বাটিকায় আজও তিন খণ্ড পাথর আছে। যার একটিতে বসে তিনি অজু করতেন, দ্বিতীয় পাথরে বসে নামাজ আদায় করতেন, আর সর্বশেষ পাথরে বসে কখনো কখনো আহার সারতেন।

কুতুব সাহেবের যে আরবি ও ফারসি ভাষায় ভালো দখল ছিল, তা পরিবারের সদস্যদের জানা ছিল। এ ছাড়া তারই রচিত বেশ কিছু আধ্যাত্মিক সংগীত উদ্ধার হয়, যার অনেক গান রচিত হয় সংস্কৃত ও বাঙলা ভাষায়। সমৃদ্ধ সে গীতি সংগ্রহ থেকে উদাহরণস্বরূপ দু/চার লাইন বর্ণনা করলে বোঝা যাবে বাণীগুলোর গভীরতার পরিমাপ।

সুর বলা হয়েছে—রাগিণী/আহিরী।

(সেই তোর কি দোষ কেল রে জানম,

মুই কি তোর দোষ কৈল?)

আরজু ফরদম (রুহ) তু দিদম,

(তন মন পাগল ভৈলু)

এ ধরনের নিজের রচিত সংগীত সবই ছিল সমর্পণ বা সৃষ্টিকর্তাকে সন্ধান করা। যেকোনো ক্ষেত্রে তারই অনুগ্রহ লাভ। জীবনকে ভালো রূপে জানার সফলতা নিয়ে তাঁর রচিত গান পাওয়া যায় অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধির লেখা শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত (উত্তরাংশ) বইয়ে।

বিজ্ঞাপন
অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন