default-image

শিল্পী শহীদ হাসান ১৯৮৫ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। এ দেশে থাকলেও বিজয় দিবস থেকে শুরু করে স্বাধীনতার মাসে প্রচণ্ড ব্যস্ত সময় পার করছেন। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী নিয়ে বিভিন্ন অনলাইন অনুষ্ঠান করছেন। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে তাঁর মতো কণ্ঠযোদ্ধা ব্যস্ত থাকবেন সেটাই স্বাভাবিক। এই বিজয়ের মাসে তাঁর অনুভূতি ও মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মৃতির কথা বলেছেন প্রথম আলো উত্তর আমেরিকাকে।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ছিলেন শহীদ হাসান। এখন প্রবাসে থাকলেও সব সময় তাঁর হৃদয়জুড়ে ধারণ করে বাংলাদেশ। তাঁর জন্ম ১৯৪৯ সালে। গোপালগঞ্জ থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৬৮ সাল থেকে গান করেন, তবে গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়নি। শখের বশে গান গাইলেও তাঁর ধ্যানজ্ঞান ছিল গান।

শহীদ হাসানের বাবা ক্যাপ্টেন ডা. ফরিদ আহমেদ কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করেছেন। তাঁর বাবা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ হওয়ায় গোপালগঞ্জে তাদের বাড়িই ছিল বাংলাদেশের যুদ্ধ পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থল। তাই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দেশীয় দোসরদের নজর ছিল শহীদ হাসানের বাড়ি।

শহীদ হাসান বলেন, বঙ্গবন্ধু বাবাকে বড় ভাই সম্বোধন করতেন। তাই, আমরা পাকিস্তানিদের টার্গেট ছিলাম। যুদ্ধ শুরুর অল্প দিনের মধ্যেই পাকিস্তানি বাহিনী আমাদের বাড়িটি পুড়িয়ে দেয়। আমাদের মাথা গোঁজার আর ঠাঁই রইল না। একাত্তরের এপ্রিলের শেষের দিকে মুসলিম লীগের নেতা ইয়াহিয়ার খাস লোক ওয়াহিদুজ্জামান তাঁর বাবা ডা. ফরিদকে ধরিয়ে দিতে পারলে দশ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন।

তারপরই শহীদ হাসানের বাবা সন্তানদের সাবধানে থাকতে বলে ভারতের উদ্দেশ্য রওনা দেন। ভারতে ডাক্তার পীর হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধের পুরোটা সময়ে দেশের জন্য ওষুধপত্র সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করেন।

শহীদ হাসান বলেন, বাবা ভারতে যাওয়ার পর মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরই মধ্যে বাবা লোক পাঠালে আমরা চার ভাই চিড়া–গুড়–তেঁতুল নিয়ে খুলনা হয়ে একুশ মাইল পায়ে হেঁটে ভারতের উদ্দেশ্য রওনা দিলাম। সে বছর সারা দেশে প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত হয়েছিল। পথিমধ্যে পিস কমিটির চেয়ারম্যান আমাদের ডেকে পাঠালেন। আমরা ধরেই নিয়েছি, এবার আমরা মারা পড়ব। ভাইয়েরা মিলে ঠিক করেছি, বলব ছোট বেলায় বাবা মারা গেছেন। তাই বাঁচার জন্য আমরা ভারতে যাচ্ছি। সবাই একই কথা বলায় সেই যাত্রায় বেঁচে গেলাম।

বিজ্ঞাপন
default-image

তারপর একুশ দিন পায়ে হেঁটে নলতা বর্ডার দিয়ে ভারতে পৌঁছালাম।

গলায় সুর। বুকে বাংলাদেশ। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র খুঁজে পেতে বেশি সময় লাগল না। শিল্পী আবদুল জব্বার সঙ্গে দেখা হলে তিনি ঠিকানা দেন ৭৮/৮ বালিগঞ্জ সার্কুলার রোড। কিন্তু পৌঁছেই গেটে সিআরপি গার্ড আটকে দেয়। সিকিউরিটি জানতে চায়, কোথায় কার কাছে যাব। জব্বার ভাই ও আশরাফুল আলমের নাম বললাম। জব্বার ভাই আমাদের ভেতরে নিয়ে যান। সেখানে তখন রিহার্সাল চলছে, ‘সোনায় মোড়ানো বাংলা মোদের শ্মশান করেছে কে। পৃথিবী তোমায় আসামির মতো জবাব দিতে হবে।’ এই গানটির রেকর্ডিংও হয়ে গেছে। এরপর বাংলাদেশ থেকে নির্দেশ আসল এই গানের কথায় একটু পরিবর্তন আনতে হবে। ‘পৃথিবী তোমায়’ বদলে ‘ইয়াহিয়া তোমায়’ বসাতে হবে।

শহীদ হাসান বলেন, ছোট একটি ঘর, অল্প জায়গায় আমাদের রেকর্ড করতে হতো। কোনো রকম মিউজিক্যাল যন্ত্রপাতি দিয়ে গাদাগাদি করে কাজ করতে হতো। তারপরও সব সম্ভব হয়েছে, কালজয়ী সব গান হয়েছে সে সময়ের মিউজিক ডিরেক্টর আর শিল্পীদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর দেশপ্রেমের ফলে। সব গানই ছিল কোরাস। গণসংগীতই মূলত গাওয়া হতো। শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন সরকার আলাউদ্দীন, আপেল মাহমুদ, মাজহারুল ইসলাম, শান্তি মুখার্জি, মনজুর আহমেদ, দিলীপ ঘোষ, কমা ভৌমিকসহ আরও অনেকে।

কণ্ঠযোদ্ধা শহীদ হাসান বলতে থাকেন, এর মধ্যে নির্দেশ আসল আমাদের ভারতের বড় বড় শহরে যেতে হবে। সেখানে গানের শো করতে হবে। গান গেয়ে দেশের জন্য ওষুধ, টাকা পয়সা ও জামাকাপড় জোগাড় করতে হবে। তাই ১৪/১৫ জন শিল্পী নিয়ে স্কোয়াড টিম সেট করা হলো। প্রথমে দায়িত্বে ছিলেন আবুল খায়ের (এমএনএ), পরে মান্নান সাহেব (এমএনএ) দায়িত্ব নেন। আপেল মাহমুদ ট্রুপ লিডার, আবদুল জব্বার ছিলেন মিউজিক লিডার। প্রথমে কানপুর যাই ট্রেনে। আইআইটিতে অনুষ্ঠান হলো। তখন মোস্তাফিজুর রহমান (সিনেমার পরিচালক) ও সুমিতা দেবী আমাদের দলে ছিলেন। আপেল মাহমুদ, স্বপ্না রায়, ফরিদপুরের একজন নারী এমপিসহ জোটবদ্ধ হলাম।

শহীদ হাসান বলেন, ট্রুপ লিডার আমাদের নিয়ে বোম্বে চলে আসলেন। আমরা পথে–হাটে–বাজারে গান গাই আর ব্যারিস্টার বাদল রশিদ টাকা তুলে বাংলাদেশ সরকারকে পাঠান। আমি আর মনজুর আহমদ প্রথম অনুষ্ঠান করি কানপুর। মাদুর বালিশ আর মশার কয়েল দেওয়া হতো। খাওয়া সকালে ভাত, রাতে ভাত। বাংলাদেশ শিল্পী সহায়ক সমিতির প্রেসিডেন্ট ছিলেন নায়িকা ওয়াহিদা রহমান। তারা আমন্ত্রণ জানালেন গানের শো করতে হবে।

‘সম্ভুকানন্দ’ হলো ১০ হাজার মানুষের ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন। সেই বিশাল হলে সলীল চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে সব ঠিক করে দেওয়া হলো। বোম্বের নামীদামি সব তারকারা অনুষ্ঠানে আসলেন। অনেক জমজমাট অনুষ্ঠান হলো। আমাদের কাজ ছিল গান গেয়ে টাকা তোলা। তখন থাকতাম শিবাজি পার্কের কাছে দাদর নামক জায়গায়।

শহীদ হাসান স্মৃতি হাতড়ে বলতে থাকেন, বোম্বেকে সেন্টার করে আমরা পুনে, কানপুর, নাগপুর পানাজিসহ নানা জায়গায় প্রচুর অনুষ্ঠান করি। পানাজির বিখ্যাত শিল্পীরা ছিল। পানাজির মানুষ হিন্দি বুঝে না। ইংরেজিতে বুঝিয়ে দিলাম, বাংলাদেশের জন্য সাহায্য চাইলাম। গান শুনে, সংগীত শুনে তারা মোহিত। পানাজিতে আমি ও মনজুর আহমেদ টানা তিন ঘণ্টার অনুষ্ঠান করলাম। শেষ মুহূর্তে নাটকীয় অবস্থা। অনুষ্ঠান শেষে (তিন ঘণ্টার) বক্তৃতা চলছে। এই সময় শুকনা মতো জিনস পরিহিত ভরাট গলার এক লোক অনুরোধ করলেন, প্লিজ ফাংশন শেষ করো না। তিনি ডোনেট করতে চান। সাধারণত টিম লিডার অনুদান সংগ্রহ করেন। কিন্তু তিনি নিজ হাতে ডোনেট করতে চান। সে সময়ে ৪ টাকা ১২ আনা তিনি আমাদের দিয়েছেন। সে সময়ের জন্য তা ছিল অনেক বেশি। বাদল রশিদ ওই ব্যক্তিকে জড়িয়ে ধরেন। সেরা সংগ্রহ হলো পানাজিতে। তারপর জাহাজে করে ফিরলাম। উদ্দেশ্য মানুষকে জানান দেওয়া। যুদ্ধের সময় পশ্চিমবঙ্গের অস্থায়ী শিবিরগুলোতে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশের হাজার হাজার মানুষের মনোবল চাঙা রাখতে শিবিরে শিবিরে গান গেয়ে বেড়াতেন বেশ কিছু শিল্পী। তিনিও ছিলেন সে দলে।

যুদ্ধের সময় জীবন বাজি রেখে সারা দেশে ঘুরে ঘুরে সংগীত পরিবেশন করে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন কণ্ঠযোদ্ধারা। দেশ স্বাধীন করে কী পেয়েছেন আর কী পাননি—তা নিয়ে কোনো দিন অনুযোগ করেননি শহীদ হাসান। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান কখনো সহ্য করতে পারেন না। প্রতিবাদ করেছেন এবং সত্য কথা বলতেও কখনো কুণ্ঠাবোধ করেন না।

যুদ্ধ চলাকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রচারিত গান মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রেরণা জুগিয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অনুপ্রেরণার অন্যতম একটা উৎস ছিল গণসংগীত। গণজাগরণের এই সংগীত রচনা ও পরিবেশনায় সে সময় অসামান্য অবদান রেখেছিলেন বাংলাদেশের বহু সংগীত রচয়িতা, সুরকার-গীতিকার ও শিল্পী। সেই সময়ের আবেগ আর উদ্দীপনার ঢেউ স্পর্শ করেছিল প্রতিবেশী পশ্চিম বাংলার মানুষকে বিশেষ করে সংগীত জগৎকে। স্বাধীনতা যুদ্ধে সেখান থেকেও রচিত হয়েছিল স্মরণীয় কিছু কালজয়ী গান।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে উদ্দীপ্ত রেখেছিল যেসব দেশাত্মবোধক গান, সেসব গানের বাণী আর সুরে যেমন ছিল সাহসের কথা, যুদ্ধ জয়ের সম্ভাবনার মন্ত্র, তেমনি ছিল দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য আকুতি। এসব গান সমানভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ রেখেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের এবং পাশাপাশি অবরুদ্ধ জনগণকে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলোতে প্রেরণার উৎস হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র।

বিজ্ঞাপন
অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন