নিউইয়র্ক ক্যাবের শহর। কর্মচঞ্চল ও জৌলুসময় এ শহরের অন্যতম অনুষঙ্গ ট্যাক্সিক্যাব। বলতে গেলে এই বহু পুরোনো ট্যাক্সিক্যাব শিল্প ও এর সঙ্গে জড়িত মানুষেরাই নানাভাবে এই নগরের অন্য খাতগুলোকে জ্বালানি দিয়ে যায়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই শিল্প এক ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ক্যাব চালকদের আর্থিক সমস্যা সময়ের সঙ্গে এতটাই বেড়েছে যে, তা মোকাবিলায় নগর কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত বেশ কয়েকজন ক্যাব চালকের আত্মহত্যা ও ক্যাবিদের আন্দোলনের মুখে সংকট নিরসনে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু সেই উদ্যোগও এখন মুখ থমকে পড়েছে করোনা মহামারির কারণে।

করোনা মহামারিতে ব্যস্ততম নগর নিউইয়র্কের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। দ্বিতীয় দফায় প্রথমবারের মতো বাজে দশা না হলেও এখনো ফিরছে না প্রাণের স্পন্দন। থেমে গেছে কোলাহল। যারা ২৪ ঘণ্টা জাগিয়ে রাখেন এই নগর, সচল রাখেন নগরের গতির চাকা, সেই ক্যাবচালকেরা আছেন বিপাকে। কোভিড-১৯-এর ভয়াল থাবা কেড়ে নিয়েছে এই পেশার অর্ধশতাধিক মানুষের প্রাণ। এ তো গেল মৃত্যুর হিসাব। এর সঙ্গে কর্মহীনতার কারণে সৃষ্ট আর্থিক সংকট ও মানবিক বিপর্যয়কে যোগ করলে যে পরিস্থিতি দাঁড়ায় তা এক কথায় বিভীষিকাময়। এই ভয়াল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় ৩০ হাজার বাংলাদেশিও। এরই মধ্যে প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি ক্যাবি বেকার হয়ে পড়েছেন।

বিজ্ঞাপন

অথচ এই করোনা মহামারির চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে নিউইয়র্ক নগরকে সচল রেখেছিলেন ক্যাবিরাই। করোনার বিস্তার ঠেকাতে নেওয়া লকডাউনের মতো পদক্ষেপে যখন গণপরিবহন বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন তাঁরাই পরিবহন করেছেন চিকিৎসক, নার্স, প্যারামেডিকসহ সম্মুখসারির সব কর্মীকে। করোনার সংকটকালে ক্যাবিরা মানুষের ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দিয়েছেন। পেয়েছেন সম্মুখসারির কর্মী হিসেবে কাজের স্বীকৃতি।

মূল সংকট হয়েছে করোনার কারণে পর্যটন খাত এক রকম স্থবির হয়ে পড়ায়। করোনায় নিউইয়র্কে ট্যাক্সির যাত্রী পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। রাস্তাঘাটে মানুষজনের চলাচল সীমিত। ব্যবসা-বাণিজ্য অচল, দোকানপাটে ঝুলছে তালা। বন্ধ রয়েছে হোটেল রেস্তোরাঁ। অতি জরুরি কাজ ছাড়া বাইরে বেরোতে চায় না কেউ। কেবল জরুরি পরিষেবা ছাড়া বাকি সব স্তব্ধ হয়ে গেছে। লোকের ভিড়ে গিজগিজ করা নিউইয়র্কে নেই আগের মতো পর্যটকদের আনাগোনা। এয়ারলাইনসগুলোর ফ্লাইটও বন্ধ রয়েছে। সব মিলিয়ে ক্যাবিদের যাত্রী সংখ্যা এখন তলানিতে ঠেকেছে। সব মিলিয়ে নিউইয়র্কের ক্যাবিদের এক ভয়াবহ দুর্দিন চলছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশি ক্যাবিদের অবস্থা আরও নাজুক। কারণ, ক্যাব চালনার সঙ্গে অনেক অনিবন্ধিত বাংলাদেশিও জড়িত। ফলে কাজ হারানোর তালিকায় থাকলেও তা দেখিয়ে সরকারি সুবিধা নেওয়ার সুযোগ তাদের হাতে নেই।

এই বাংলাদেশি ক্যাবিদের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখে। একই সঙ্গে এই ক্যাবিরাই আর্থিক নানা সহায়তার মাধ্যমে সচল রাখেন নিউইয়র্কে বাংলাদেশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নানা প্রতিষ্ঠানকে। এরাই ছিলেন এসব কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি। এখন এই দুর্দিনে তাদের পাশে দাঁড়ানোটা এসব সংগঠনর কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে করোনার বাস্তবতায় এসব সংগঠন ও এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গও আদতে সমস্যার মধ্য দিয়েই যাচ্ছেন। তারপরও সবাই মিলে এক ধরনের উদ্যোগ হয়তো নেওয়া যেতে পারে, যা পুরো মহামারিকালে বহু বাংলাদেশি ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিকভাবে এগিয়ে আসার মধ্য দিয়ে করে দেখিয়েছেন।

কিন্তু এসবই একটা সাময়িক সমাধানই এনে দেবে। নিউইয়র্কের ক্যাব শিল্প যে সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা এখন স্থায়ী সমাধান দাবি করে। আর এমন সমাধান শুধু প্রশাসনই দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশি কমিউনিটির বিভিন্ন সংগঠন স্থানীয় ও অন্য দেশের সংগঠনগুলোর সঙ্গে একজোট হয়ে ক্যাবিদের সংগঠন ট্যাক্সি ক্যাব অ্যালায়েন্সের সঙ্গে বসে একটা পরিকল্পনা নিতে পারে। সবাই মিলে সে পরিকল্পনা নগর কর্তৃপক্ষের সামনে হাজির করলে প্রশাসনের পক্ষে পদক্ষেপ না নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। নিরুপায় হয়ে পড়া ক্যাবিদের ও ক্যাব শিল্পকে বাঁচাতে এখন সম্মিলিত উদ্যোগই জরুরি।

বিজ্ঞাপন
অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন