১০০ কিলোমিটার পথ হেঁটে মঙ্গলবার শাহবাগে পৌঁছান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থী (ব্যানার হাতে)
১০০ কিলোমিটার পথ হেঁটে মঙ্গলবার শাহবাগে পৌঁছান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থী (ব্যানার হাতে)

মুণ্ডু ও লিঙ্গ কর্তনের যে দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দিনে দিনে জোরালো হচ্ছে, তার বিপরীতে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা বা সাহস কোনোটাই আমার নেই। ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে আমিও সোচ্চার। কঠোর শাস্তির দাবিতে আমিও অটল। তবে দাবিটি একটু ভিন্ন।

আগেই বলে রাখি, মৃত্যুদণ্ডের আমি সমর্থক নই। যে দিন সৌদি আরব প্রকাশ্যে একদিনে আট বাঙালির শিরশ্ছেদ করল, তার পরের কয়েক দিন আমি ঠিকমতো খেতে-ঘুমাতে পারিনি। যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান কোনো অঙ্গরাজ্যে আছে, কোনো অঙ্গরাজ্যে নেই। নিউইয়র্কে আগে ছিল না।

সাবেক গভর্নর ও বর্তমান গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমোর বাবা মারিও কুমোর আমলে ১৯৮৯ সালে প্রথম নিউইয়র্কে পা রাখি। বেশ জনপ্রিয় গভর্নর ছিলেন। ১৯৯২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আমাদের ধারণা ছিল, তিনি ডেমোক্রেটিক পার্টির টিকিট চাইবেন। চাইলেন না। ক্লিনটন এসে সবকিছু তাঁর মতো করে নিলেন।

নিউইয়র্কের রাজধানী আলবেনির পথে হাডসন নদীর ওপর অত্যাধুনিক যে সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছে, তার নামকরণ হয়েছে মারিও কুমোর নামে। ইতালিয়ান কুমো পণ্ডিত লোক ছিলেন। পড়াশোনা ছিল দারুণ। বিনম্র শ্রদ্ধায় আমি তাঁকে স্মরণ করি। এই মারিও কুমো যখন নিউইয়র্কের গভর্নর, তখন এই অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ড ছিল না। পরবর্তী রিপাবলিকান গভর্নর প্যাটাকি এসে মৃত্যুদণ্ড চালু করলেন।

বিজ্ঞাপন

একবার এক একান্ত সাক্ষাৎকারে কুমো বলেছিলেন, ‘এ নিয়ে আমি অনেক পড়াশোনা করেছি। কোথাও এমন কিছু খুঁজে পাইনি, যা দিয়ে মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করা যায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নে মৃত্যুদণ্ড নেই। বলা হয়ে থাকে, একজন মানুষের মাথা খারাপ হতে পারে, রাষ্ট্রের তো হতে পারে না।’

ধর্ষকের কঠোর শাস্তির দাবিতে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক প্রতিবাদ-বিক্ষোভ বহির্বিশ্বে আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে আমার চেনা-জানা দু-তিনজন লেখক-সাংবাদিকের মন্তব্যে হোঁচট খেয়েছি, অবাকও হয়েছি। এক প্রিয়ভাজন সাংবাদিক, ঢাকায় তাঁর বেশ নাম-ডাক। তাঁর কলামও বেশ জনপ্রিয়। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, চাঁদাবাজি, জবর-দখল, ব্যাংক ও সরকারি সম্পদ লুটপাট, অর্থপাচার, অপরাজনীতি—সব অবিচার-অনাচারের বিরুদ্ধে তাঁর কলম বেগবান। গভীর আগ্রহ নিয়ে আমিও পড়ি। ভালো লাগে। গত সপ্তাহে ফেসবুকে এক পোস্টে তিনি দাবি জানিয়েছেন, ধর্ষকদের এনকাউন্টার অর্থাৎ ক্রসফায়ারে হত্যার জন্য। আমি হোঁচট খাই। এ কী বলছেন! ন্যায়-নীতি ও মানবতা প্রতিষ্ঠার জন্য যিনি সোচ্চার, তিনি বিচারবহির্ভূত হত্যাকে স্বাগত জানাচ্ছেন। এ বিপরীতমুখী অবস্থান কী করে মেনে নেওয়া যায়! পৃথিবীর কোথাও কোনো দেশেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকে অনুমোদন করে না। এতে নিরপরাধ মানুষকে হত্যার লাইসেন্স কেউ কেউ পেয়ে যায়। এটা এক জঘন্য মানবতাবিরোধী পন্থা।

আমার বন্ধু সাংবাদিক কেন এটা চাইলেন? লন্ডনপ্রবাসী এক জনপ্রিয় লেখিকা ফেসবুকে নিয়মিত লেখেন। তাঁকে আমি চিনি ১৯৬৫ সাল থেকে। ঢাকায় অধুনালুপ্ত এক প্রভাবশালী সাপ্তাহিকে কাজ করার সময় তাঁর পরিচিতি বেড়ে যায় বহুগুণ। আমি তাঁর লেখার এক ভক্ত পাঠক। সম্প্রতি ফেসবুকে ধর্ষণের বিরুদ্ধে এক লেখায় এটা-সেটা বলার পর সর্বশেষ সমাধান দিলেন, ধর্ষককে ঢাক-ডোল পিটিয়ে হাটে-বাজারে ঘুরিয়ে প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে দিতে।

বিজ্ঞাপন

কী সুন্দর সমাধান! রাষ্ট্র কোথায়, বিচার কোথায়? নিউইয়র্কপ্রবাসী এক লেখক-সাংবাদিক ফোনে আলাপকালে বললেন, বাংলাদেশে ধর্ষকদের সৌদি আরবের মতো মেরে ফেলা হোক। বললাম, সৌদি আরবে তো শরিয়া আইন। বাংলাদেশ ইসলামিক স্টেটস না, পিপলস রিপাবলিক। উত্তরে বললেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান; শরিয়া আইনের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলবে না। আমি চুপ হয়ে গেলাম। যতটুকু জানি এই বন্ধু লেখক-সাংবাদিক বাম ঘরানার সমাজতান্ত্রিক সেক্যুলার মূল্যবোধ লালন করেন। ভেবে পাই না, ধর্ষণ ইস্যুতে সবার সব মূল্যবোধ এলোমেলো হয়ে গেল কেন?

এবার অন্য পিঠের দু-একটা কথা বলি। রাজুব ভৌমিক। নিউইয়র্কপ্রবাসী লেখক। এখানে কলেজে শিক্ষকতা করেন। একই সঙ্গে নিউইয়র্ক পুলিশের কর্মকর্তা। ফেসবুকে তাঁর একটি লেখা আমার নজর কেড়েছে। ইচ্ছে হচ্ছিল, পুরোটা এখানে তুলে ধরি। কিন্তু স্থান সংকুলানের প্রশ্নে তা পারলাম না।

রাজুব ভৌমিক বাংলাদেশিদের কাছে অনুরোধ করেছেন, ‘আপনার অধিকার, প্রতিবাদ করুন। কিন্তু বহির্বিশ্বে ধর্ষকদের স্বর্গরাজ্য হিসেবে চিত্রিত করে বাংলাদেশকে ছোট করবেন না।’ তাঁর লেখার একটি অংশ এখানে তুলে ধরলাম—

‘বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি—প্রতিদিন গড়ে ১৩ জন বাংলাদেশে ধর্ষিত হয় যা ঘৃণার অযোগ্য অপরাধ। যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা ৩২ কোটি, যা বাংলাদেশের দ্বিগুণ।

১. যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন ১ হাজার ১৮৮ জন ধর্ষিত বা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়।

২. যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ৭৩ সেকেন্ডে একজন ধর্ষিত বা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়।

৩. যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ছয়জন নারীর একজন তাদের জীবনকালে ধর্ষিত হয়।

৪. ধর্ষিতদের মধ্যে ৯৪ শতাংশ নারীর পিটিএসডি রোগ হয়। এর মধ্যে ৩৩ শতাংশ নারী আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।

যুক্তরাষ্ট্রে বসে যারা বাংলাদেশের বদনাম ছড়াচ্ছেন, তাঁদের একটু ভাবার জন্য অনুরোধ করছি।’

বিজ্ঞাপন

ফেসবুকে নিউইয়র্কপ্রবাসী চিত্র পরিচালক রওশন আরা নিপার একটি ছোট্ট পোস্ট চোখে পড়ল। সেটি হলো—‘ধর্ষণ! সমাধানটা কী? শুধুই আইন-শৃঙ্খলা, নাকি এর উৎস নির্মূল? উৎসটা কী? কেন এই পাশবিক উৎসব? প্রশ্নটা সহজ, আর উত্তর?’

আমি আরও তিনটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন জুড়ে দিয়ে এ পর্বে ইতি টানলাম। কথা হলো, আমরা কখনো কি ভেবেছি, কী চাই, আর কী চাই না? ভাবনার আরও বিষয় আছে। দুর্নীতি গ্রাস করেছে আমাদের সবকিছু। আমাদের শুভ বুদ্ধি, শুভ কাজ, শুভ চিন্তা। আমরা কি ভাবছি এর বিরুদ্ধে কথা বলার?

শোনা কথাটাই এখানে বলি, ধর্ষকের বিরুদ্ধে মামলার ৫০ শতাংশ হাওয়া হয়ে যায় পুলিশি তদন্তকালে। বাকি ৫০ শতাংশ আইনি প্রক্রিয়া, সাক্ষ্য-প্রমাণের জটিলতা ইত্যাদি ইত্যাদি কারণে। এ ছাড়া আছে মামলার দীর্ঘসূত্রতা। ততক্ষণে ধর্ষক মুক্ত বাতাসে দম নিয়ে নতুন টার্গেটের খোঁজে নেমে পড়ে। আইনের পর আইন করে কী হবে, যদি দুর্নীতি বন্ধ না হয়। যদি আইনটি সঠিকভাবে প্রয়োগ না হয়।

আমাদের দাবি থাকবে, ধর্ষণের মামলার বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার। মামলার তদন্ত ও প্রসিকিউশনে স্বচ্ছতা থাকতে হবে এবং অবশ্যই দুর্নীতিমুক্ত হতে হবে। সাক্ষ্য-প্রমাণের জটিলতার অবসান ঘটাতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় বিধি-বিধান প্রণয়ন করতে হবে। দ্রুত বিচার ও স্বচ্ছ-শক্তিশালী প্রসিকিউশন একজন ধর্ষককে সাজা প্রদানে যথেষ্ট সহায়ক। প্রয়োজনে বিশেষ আদালতও বসানো যায়।

এসব করার জন্য সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। বর্তমান প্রতিবাদ, আন্দোলন এ চাপের জন্য যথেষ্ট। সাধারণত দেখা যায়, চাপে না থাকলে অনেক ন্যায়সংগত প্রয়োজন মেটাতে সরকার এগিয়ে আসে না।

বড় কথা হচ্ছে, ধর্ষণ প্রতিরোধে আইন-শৃঙ্খলা একমাত্র পথ নয়। একটা জোরালো সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন খুবই জরুরি। সমাজ যদি জাগে, কোনো অপশক্তিই সে সমাজে টিকে থাকতে পারে না।

লেখক: নিউইয়র্কপ্রবাসী সাংবাদিক।

মন্তব্য পড়ুন 0