default-image

করোনাভাইরাসের কারণে সারা বিশ্বে মানুষের জীবন এলোমেলো হয়ে গেছে। চোখের সামনে আপনজনের মৃত্যু, প্রতিবেশীর লাশ, বন্ধুদের মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই—এ যেন এক অন্য পৃথিবী। মৃত্যুর এ মিছিল থামছেই না।

করোনা শুরুর দিকে সবাই ভেবেছিল হয়তো একটা উপায় বের হবে। বিজ্ঞানীরাও আশা দেখালেন। আশ্বস্ত হলাম,এই তো কিছুদিন, কয়েক মাস তারপর আবার আগের জীবনে ফিরব সবাই। কিন্তু ভাইরাসের প্রথম ঢেউ শেষ হয়ে বলা যায় চতুর্থ ঢেউ চলছে, এখনো কিন্তু মিলছে না এই ভাইরাসের থাবা থেকে মুক্তি।

করোনা রোধে বাজারে এল টিকা, শুরু হলো অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা। এ ক্ষেত্রে মানবিক কাজের চেয়ে বড় হয়ে উঠল ব্যবসায়িক দিক। তবুও মানুষ আশার আলো দেখল, মুক্তির আশা করল। কিন্তু এই টিকা নেওয়ার পরও পর পরও কেউ সংক্রমিত হলো।

এরই মধ্যে জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকা নিয়ে ঝামেলা শুরু হয়েছে। ৭০ লাখেরও বেশি মানুষ এই টিকা ইতিমধ্যে নিয়েছে। এর মধ্যে ছয়জনের শরীরে প্রতিক্রিয়া রক্ত জমাট বেধে যায়। যদিও এর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি। এ নিয়ে চলছে বিতর্ক। এ কারণে আপাতত জনসনের টিকা প্রয়োগ স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

এর প্রভাব পড়ছে যারা এই টিকা নিয়েছে, তাদের মনের ওপর। অনেকেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে যে, এই টিকা নিয়ে বিপদে পড়লাম না তো। এই যে মানসিক চাপ এটা আবার অসুস্থ করে দেবে মানসিকভাবেই। হয়তো দেখা যাবে ভাইরাস থেকে মুক্তি মিলেছে ঠিকই, কিন্তু মানসিক শান্তি মিলছে না। এ আরেক যন্ত্রণা।

আর যারা টিকা নেওয়ার কথা ভাবছিল, তাদের অনেকেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করছেন। এক সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে গিয়ে আরেক সমস্যায় পড়ছি। তাই এ থেকে হয়তো এখনই মুক্তি মিলবে না। এদিকে টিকা তৈরি হচ্ছে সঙ্গে ভাইরাসও পাল্লা দিয়ে ধরন বদল করছে। চীন থেকে ইতালি আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপ ছেড়ে এখন এশিয়াতে থাবা বসিয়েছে ভাইরাস তার সুযোগ মতো। ভারতে একদিনেই লাখো মানুষ সংক্রমিত হচ্ছে। বাংলাদেশে শতাধিক মৃত্যু হচ্ছে প্রতিদিন। এ পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে থামবে, কবে থামবে কেউ জানে না।

যুক্তরাষ্ট্রে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫ লাখ ৮১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে করোনায় সংক্রমিত হয়ে। গবেষকেরা বলছেন, করোনাভাইরাসের রেশ থেকে যাবে দীর্ঘদিন। এরা জিন পরিবর্তন করে। প্রকৃতিগত ভাবেই এর প্রভাব কমে আসবে, আবার বাড়বে। কিন্তু নির্মূল হবে না। আবার ফিরে আসতে পারে। তবে ফিরে আসলে আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়েই ফিরে আসবে। এখন মানুষ আপনজন হারানোর ভয়ে কাঁপছে। সবকিছুর বিনিময়ে হলেও চাইছে প্রিয় মানুষ পাশে থাকুক।

বিজ্ঞাপন

করোনা মহামারি পৃথিবীর যে ক্ষতি করছে তা পূরণ হবার নয়। তবু ও আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। এই পৃথিবীকে আমরা হয়তো আগের রূপে পাব না, কিন্তু চাইলে নতুন করে দেখতে পারি। আমাদের বাঁচতে হলে অর্থ দরকার। সে জন্য অর্থনীতির চাকাও সচল রাখতে হবে। মানুষ নেমে পড়েছে কাজে, অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করতে। কিন্তু সমস্যা হলো, মানুষের সমাগম হলেই ভাইরাস আবার সংক্রমণ ঘটাচ্ছে। এক অনিশ্চিত অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে সময় ও মানুষের জীবন। প্রযুক্তির এই ছুটে চলা জীবনে যেখানে আমরা আগে দৌড়াতাম সেখানে এখন হাঁটছি বলা চলে। এক অদৃশ্য ভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হচ্ছে জীবন বাঁচানোর জন্য।

২০১১ সালে কনটাজিয়ন নামে একটা সিনেমা দেখেছিলাম। মুভিটা নির্মিত হয়েছিল ভাইরাসকে কেন্দ্র করে। বর্তমানে যা ঘটছে তা যেন ওই মুভিটার ঘটনা। মুভিতে হয়তো পরিচালক চরিত্র বদলাতে পারেন, মৃত্যুপথ যাত্রীকে বাঁচিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভব নয়।

করোনা আমাদের এমন একটা জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে যে, আমরা চাইলেও আর আগের মতো চলতে পারছি না। সুস্থ আছি কিন্তু জীবন উপভোগ করতে পারছি না। দেখা হচ্ছে একে অপরের সঙ্গে কিন্তু আলিঙ্গন করতে পারছি না। একজনের সঙ্গে আরেকজনের ছয় ফুট দূরত্বের যে দেয়াল করোনা তৈরি করে দিল, তা সহজে ঘুচবে না। আমাদের বাঁচতে হলে এ দেয়াল ডিঙানো যাবে না। কবে এর থেকে মুক্তি মিলবে জানি না। বিজ্ঞানীরা আশ্বাস দিলেও নিশ্চিত করে কেউ কিছু বলছে না। গবেষণা যেমন এগিয়ে যাচ্ছে, সেই সঙ্গে করোনাভাইরাসও তার জিন পরিবর্তন করছে প্রতিনিয়ত।

অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন