default-image

করোনাভাইরাস মহামারি যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষকদের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে হাজার হাজার জেলা স্কুল ও পৃথক স্কুলগুলো কোভিড-১৯ মহামারির কারণে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ছিল। সম্মিলিত নির্দেশাবলির সঙ্গে দুটি ভিন্ন শিক্ষা পদ্ধতিতে নতুন বছরে স্কুলগুলো আবার ক্লাস নিতে শুরু করে। ইনপারসন ও রিমোট—উভয়ের সমন্বয় ও সম্পূর্ণ অনলাইনের মাধ্যমে শিক্ষাদান ও গ্রহণ চলছে। কিন্তু যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তাতে শুধু শিক্ষার্থী ও ‌অভিবাবকেরাই নন শিক্ষকেরাও আক্রান্ত হচ্ছেন।

বছরখানেক আগেও শিক্ষকেরা যখন ক্লাসে প্রবেশ করে ‘গুড মর্নিং’ বলতেন, শিক্ষার্থীরা দারুণ উৎসাহিত হতো। দিনটাই শুরু হতো শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই সহজ সম্পর্ক দিয়ে নতুন কিছু শেখার প্রেরণায়। করোনা মহামারির কারণে এখন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে সেই পার্শ্ব কথোপকথন নেই। শিক্ষার্থীদের নিজেদের লড়াইয়ে শিক্ষকদের সহায়তার পরিসরটি ছোট হয়ে এসেছে। স্থায়ী সম্পর্কগুলো গড়ে তোলার মতো, বিশেষ করে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া চালিয়ে যেতে পারছেন না শিক্ষক, কাউন্সেলর, স্কুল সাইকোলজিস্ট ও থেরাপিস্টরা। এখন তাঁরা হয় নিজ ক্লাসরুমে একা কাজ করছেন, কিংবা ঘরে বসে কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁদের সামনে নতুন সমস্যা হয়ে বরং সামনে আসছে এই ছোট মনিটরটি, যা ব্যবধান গড়ে দিচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

স্বাস্থ্য নিরাপত্তার অংশ হিসেবে নেওয়া সতর্কতার কারণে মনের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপর, তা একইভাবে আক্রান্ত করছে শিক্ষকদেরও। বিরূপ প্রভাবের শিকার শুধু শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরাই নন। একইভাবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটু বেশি মাত্রাতেই বিরূপ প্রভাবের মুখে পড়েছেন শিক্ষকেরা। মানসিক চাপ যেমন বাড়ছে, তেমনি অনলাইন পাঠদানকে কার্যকর করতে এবং বিশেষ যত্ন প্রয়োজন এমন শিক্ষার্থীদের দূর থেকে সহায়তা দেওয়ার কার্যকর উপায় খুঁজতে রীতিমতো গলদঘর্ম হচ্ছেন শিক্ষকেরা। এই নতুন চিন্তা তাঁদের মানসিক অবসাদকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

মনে রাখা দরকার শিক্ষকেরা শুধু শিক্ষার্থীদেরই নয়, নিজেদের পরিবার নিয়েও উদ্বিগ্ন। এটি তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যকে ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই মানসিক দশা নিয়ে তাঁদেরই আবার শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। অনেক সময় আমরা বলি, শিক্ষকেরা ঘরে বসে সহজেই শিক্ষা দিচ্ছেন। শিক্ষকদের জন্য উক্ত মন্তব্যটা শোনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। কারণ, অন্য সবার মতোই তাঁদেরও পরিবারের খেয়াল রাখতে হয়। কেউ কেউ সিঙ্গেল প্যারেন্টস হিসেবে বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হয়। আর রিমোট লার্নিংয়ের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই সময়র পরিসর বলে কিছু আর থাকে না। গভীর রাতেও অনেক শিক্ষককে শিক্ষার্থী বা অভিভাবকদের কল বা ই-মেইলের জবাব দিতে হয়।

তবু শিক্ষকদের কোনো ‌অভিযোগ নেই। তাঁরা তাঁদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছেন। অনেক শিক্ষার্থী বিশেষ করে যাদের বাড়িতে শিশু সন্তান রয়েছে এবং দূরবর্তী শিক্ষা গ্রহণ করছে, তাদের জন্য একই সময়ে সন্তানের পড়াশোনা মনিটর করা এবং নিজ ক্লাসে শিক্ষাদান, উভয় ক্ষেত্রেই ভারসাম্য বজায় রাখা এক বিরাট সমস্যা। আবার অনেক শিক্ষকদের বাড়িতে একেবারেই নবজাতক সন্তান রয়েছে। করোনা মহামারির কারণে তাঁদের ডে-কেয়ারেও দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সেসব নবজাতকদের পাশে বা কোলে নিয়ে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কম্পিউটারে শিক্ষাদান করা, পাঠ তৈরি করা, গুগল মিট বা জুম পরিচালনা করা, অভিভাবকদের সঙ্গে কার্যক্রম বজায় রাখা ইত্যাদি বহুমাত্রিক কাজ সম্পাদন করা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

অনেক শিক্ষক সত্যিকারের জীবনে কখনো সাক্ষাৎ করেননি এমন সব শিক্ষার্থী এবং পরিবারের সঙ্গেও কাজ করে যাচ্ছেন‌ অনলাইনে। সম্পূর্ণ ‌অজানা একদল শিক্ষার্থীর পরিচয়, ব্যাকগ্রাউন্ড, সংস্কৃতি, আচরণ, ধর্মীয় অনুভূতি, প্রয়োজন সম্পর্কে জানতে ও বুঝতে বেশ সময়ের দরকার হয়। আর সেটা যদি হয় ‌অনলাইনের মাধ্যমে, তাহলে বলাবাহুল্য যে ,সেটা একজন শিক্ষকের জন্য মানসিক চাপ তৈরির বিশাল কারণ হয়ে ওঠে।

পাশের রুমে পরিবারের অসুস্থ সন্তানটিকে রেখে যিনি কম্পিউটারে বসেন সময়মতো সঠিক শিক্ষাটি দিতে তিনিই আমাদের দায়িত্বশীল শিক্ষক। কিন্ডারগার্টেন থেকে হাইস্কুল এবং জেনারেল ও স্পেশাল এডুকেশনজুড়ে শিক্ষার্থীদের সঠিক শিক্ষা প্রদানের থিমটি প্রতিটি শিক্ষকের ক্যারিয়ারজুড়ে ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে। তাদের কাজ ও দায়িত্ব স্কুল সময়ের সঙ্গে শেষ হয় না।

অনেক শিক্ষক স্ক্রিনে শিক্ষাদানের সময় ব্যাকগ্রাউন্ড ব্যবহার নিয়ে সমস্যায় পড়েন। বিশেষ করে যাদের ঘরে শিশু সন্তান, বৃদ্ধ কিংবা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কেউ থাকে, তাদের ক্ষেত্রে শিক্ষা কার্যক্রম চালানোর সময়ে হুট করে স্ক্রিনের সামনে পরিবারের ‌‌অন্যদের উপস্থিতি বিরাট এক সমস্যায় ফেলে দেন শিক্ষকদের। স্কুল প্রশাসন ও অভিভাবকদের অভিযোগ থেকে রক্ষা পেতে ও নিজ চাকরির স্থায়িত্ব বজায় রাখতে এই ‘স্ক্রিন ব্যাকগ্রাউন্ড’ ব্যবহারের বিষয়টাও অনেক শিক্ষকদের জন্য মানসিক চাপ তৈরি করছে। তা ছাড়া ঘরে নবজাতক ও শিশুদের উপস্থিতি বা শব্দে শিক্ষা প্রদানেও বাধাগ্রস্ত হতে হয় অনেক শিক্ষককে। এ নিয়ে অনেক সময় অভিভাবকদের অভিযোগের মুখেও পড়তে হয় শিক্ষকদের। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের শিক্ষকদের বেলায় শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার স্ক্রিনে বসানো ও শিক্ষা গ্রহণে মনোনিবেশ করানো ‌অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। শিক্ষকদের বিভিন্ন পদ্ধতিতে চেষ্টা করে যেতে হয়। একই পাঠের পুনরাবৃত্তিতে বহু সেশন সংযোগ করতে হয়। সেটা করতে গিয়ে নিজেকেও বহুবার নতুন করে শিখতে হয়। কম্পিউটার স্ক্রিনে অভিভাবকদের সহযোগিতা ছাড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান ‌সম্ভব হয় না। কিন্তু তারপরও কখনো কখনো অভিভাবকদের কাছ থেকে শুনতে হয়, তাঁদের সন্তান কেন উন্নতি করছে না। বিষয়টি তখন শিক্ষকদের মর্মপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সোমবার থেকে শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে বেলা ২টা ২০ পর্যন্ত শিক্ষকদের গুগল ক্লাস নিতে হয়। ক্লাসে ৪৫ মিনিট করে প্রতি ভিডিওকলে বেশ কয়েকটি সেশন থাকে। শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়, তার আগে তাদের উপস্থিতির ফর্ম পূরণ করাতে হয়। কিন্তু অনেক সময় শিক্ষার্থীরা, বিশেষত বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা ক্লাসে যোগ দিলেও বাকি কাজগুলো সম্পূর্ণ করে না, কিংবা করলেও সেটা স্কুল আওয়ারের পর করে। এ জন্য শিক্ষকদের সজাগ থাকতে হয়। তা না হলে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

ভুল করা সবার জন্য স্বাভাবিক হলেও শিক্ষকদের জন্য তাকে স্বাভাবিক বলে ধরা হয় না। এই ভাবনা মাথায় নিয়েই শিক্ষকদের শব্দ বুনতে হয়, পথ চলতে হয়। ভুলবশত সামান্য একটা শব্দের ব্যবহার, তাকানোর ধরন, বলার ধরন থেকেও শিক্ষকেরা কর্পোরাল পানিশমেন্টে যেতে পারেন। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের যেকোনো অভিযোগকে ‌অগ্রাধিকার দিতে হয়। শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে এও এক বড় চাপ শিক্ষকদের জন্য।

প্রযুক্তির ব্যবহারে নতুন শিক্ষা পদ্ধতি অনেক বয়স্ক শিক্ষকের মানসিক স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। অনেক বছর ধরে শিক্ষকতায় জড়িত পুরোনো শিক্ষকেরা কম্পিউটারের সাধারণ ব্যবহারে ঠিক থাকলেও প্রযুক্তির মাধ্যমে জুম, গুগল মিট ও গুগল স্লাইড বা ড্রাইভের মাধ্যমে ভিডিও বা লেসন প্রেজেন্টেশন করা নিয়ে বিপাকে পড়েন। এই সমস্যার সমাধানে ‌‌অনেকের পরিবার পাশে থাকলেও বেশ কিছু বয়স্ক শিক্ষক ইতিমধ্যে রিটায়ারমেন্টে চলে গেছেন। তার ওপর শিক্ষা বিভাগ ও স্কুল প্রশাসন থেকে প্রতি সপ্তাহেই কিছু না কিছু বিষয়ভিত্তিক শিক্ষামূলক ওয়ার্কশপ ও প্রশিক্ষণ নিতেই হয় শিক্ষকদের।

বিজ্ঞাপন

গত নভেম্বর মাসে প্রকাশিত হরেস ম্যানের ‘এডুকেটর অ্যান্ড ওয়েল বিং স্টাডি’ প্রতিবেদন অনুসারে, এক বছর আগের তুলনায় এখন ৭৭ শতাংশ শিক্ষিক বেশি কাজ করছেন। ৬০ শতাংশ শিক্ষক তাঁদের চাকরি কম উপভোগ করছেন এবং ৫৯ শতাংশ শিক্ষক তাঁদের স্কুল ডিস্ট্রিক্টগুলোতে স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা সতর্কতায় নিরাপদ বোধ করছেন না। ২৭ শতাংশ শিক্ষক মহামারিজনিত কারণে চাকরি ছেড়ে দিতে বা প্রাথমিক অবসরগ্রহণে যেতে এবং ‘লিভ অব অ্যাবসেন্স’-এর বিষয়ে ভাবছেন।

এই প্রতিবেদনের জন্য হরেস ম্যান এডুকেশন করপোরেশন কিন্ডারগার্টেন থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পাবলিক স্কুলের মোট ১২৪০ জন যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাবিদদের সমীক্ষা করেছিলেন। একজন প্রতিভাধর শিক্ষক কেবল শিক্ষার্থীদের আজকের প্রয়োজন মেটাতে প্রস্তুত থাকেন না। বরং তাঁদের ভবিষ্যতের আশা ও স্বপ্নের পূর্বাভাস দেওয়ার জন্যও প্রস্তুত থাকেন। নিজ ব্যক্তি জীবনের সব দুঃখ, দুর্দশা, সমস্যা একপাশে রেখে চোখের পানি সরিয়ে ক্লাসে ঢুকে শিক্ষার্থীদের হাসি মুখে ‘গুড মর্নিং’ জানিয়ে জাগ্রত করা মানুষটাই আমাদের দুর্দান্ত অভিজ্ঞ শিক্ষক।

শিক্ষকতা করতে গিয়ে বয়স, ভাষা, জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও সম্মান নিয়ে চলা মানুষটাই আমাদের শিক্ষক। পাশের রুমে পরিবারের অসুস্থ সন্তানটিকে রেখে যিনি কম্পিউটারে বসেন সময়মতো সঠিক শিক্ষাটি দিতে তিনিই আমাদের দায়িত্বশীল শিক্ষক। কিন্ডারগার্টেন থেকে হাইস্কুল এবং জেনারেল ও স্পেশাল এডুকেশনজুড়ে শিক্ষার্থীদের সঠিক শিক্ষা প্রদানের থিমটি প্রতিটি শিক্ষকের ক্যারিয়ারজুড়ে ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে। তাদের কাজ ও দায়িত্ব স্কুল সময়ের সঙ্গে শেষ হয় না।

অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন