লেবার ডে

করোনাকালের লেবার ডে উইকএন্ড

বিজ্ঞাপন

সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সোমবার সরকারি ছুটির দিন; যুক্তরাষ্ট্রে ‘লেবার ডে’ বা শ্রমিক দিবস। এবার লেবার ডেতে সকাল শুরু হয়েছিল অলস ভঙ্গিতে। গোসল করে নাশতা করলাম। তারপর পরিপাটি হয়ে তৈরি হলাম টরন্টোর কবিবন্ধু মৌ মধুবন্তী আয়োজিত ‘ললিত কণ্ঠের ত্রিতরঙ্গ আড্ডা’য় যোগ দিতে। বন্ধু মৌ মধুবন্তির সঞ্চালনায় সুন্দর একটি অনুষ্ঠান হলো। অজস্র ভালোবাসা ও ধন্যবাদ মৌ, আমাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য!

দুপুরের আগেই বাসায় এল আমার একমাত্র ভাই বনী। বেশ কয়েক বছর ধরে আমার সঙ্গে যৌথ বসবাসের পর আমার ছোট ভাইটি নিউইয়র্ক শহরে তার নতুন বাসা নিয়েছে। থাকবে মাকে নিয়ে। নিউইয়র্ক শহরে তার কয়েকজন ‘বড় বোন’ থাকলেও সে এখন মায়ের দায়িত্ব নিতে চাইছে। তাই বসা বদল চলছে সপ্তাহজুড়ে। বাসা বদলের ধকলে বাড়ির সবাই কম-বেশি একটু ক্লান্ত। যদিও বনী নিজে একাই এক শ। তুলা রাশির জাতক আমার এ ভাই খুব মুখচোরা। অতিশয় ভালো মানুষ। কোনো কাজে, কারও মুখের ওপর ‘না’ বলতে শেখেনি। তাই নিজে যেমন খাটে, অন্যরাও সুযোগ পেয়ে তাকে খুব খাটিয়ে নেয়। মানুষকে অকাতরে দান দক্ষিণা করে ফতুর হয়। পৃথিবী এসব ভালো মানুষের জন্য দিন দিন খুব কঠিন হয়ে উঠছে আজকাল। তাই সর্বান্তকরণে চাই, কেউ যেন তার মাথায় কাঁঠাল ভেঙে না খায়।

আবেগী হয়ে আসল বিষয় থেকেই দূরে চলে যাচ্ছিলাম। ভাই গাড়ি নিয়ে এসেছে বোন আর দুলাভাইকে তার বাসায় দুপুরের দাওয়াত খেতে নিয়ে যেতে। সঙ্গে যাবে তাদের বাসার কিছু মালপত্র। মুভারকে দিয়ে নেওয়ার পরও প্রতিদিন কিছু না কিছু মালপত্র সে নিজে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের বাসা ছেড়ে তার সঙ্গে মুভ হচ্ছে আমার আরেক ছোট বোন শাহীন ও তার মেয়ে আরিয়ানা। তাই তল্পিতল্পা নেহাত কম নয়।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

পথে যেতে যেতেই ফোন এল আমাদের প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার আবাসিক সম্পাদক ইব্রাহীম চৌধুরীর। লেবার ডের সকাল। আগের দিনই শুরু হয়েছে প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার আয়োজনে ‘লকডাউন চিত্র প্রদর্শনী’। ইব্রাহীম ভাই অনুষ্ঠান-পরবর্তী আলোচনা নিয়ে কথা শুরু করলেন। অনেক কথার পর শেষে এ সপ্তাহের লেখার খবর কী জানতে চাইলেন। অজুহাত হাতেই ছিল। বললাম ছোট ভাইয়ের বাসা বদলের কথা। বললেন, বাসা বদল, লকডাউনের পর নিউইয়র্কবাসীর গরের বাইরে আসা, লেবার ডে ইত্যাদি নিয়ে লিখতে। মোদ্দা কথা লেখা না দিয়ে উপায় নেই।

ফিরে আসি এবার ‘লেবার ডে’ প্রসঙ্গে। এই দেশে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সোমবার লেবার ডে উদ্‌যাপিত হয়। সে হিসাবে এবার লেবার ডে ছিল ৭ সেপ্টেম্বর। জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে শ্রমিকদের সম্মান দেখানো হয় এ দিন। এ দেশে যারা কাজ করেন, তাঁদের সবাই শ্রমিক। প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবাই এখানে শ্রমিক।

১৮৮৬ সালের পর ‘লেবার ডে’র গোড়াপত্তন হয়েছিল। আগে নিয়ম ছিল, শ্রমিকেরা সপ্তাহে সাত দিনই দৈনিক ১২ ঘণ্টা হিসাবে কাজ করবে। পরে শ্রমিকেরা সংগঠিত হয়ে আন্দোলন শুরু করলে এক সময় আট ঘণ্টা কাজের দাবি আদায় হয়। এ জন্য রক্ত দিতে হয়েছিল শ্রমিকদের। ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা, কাজের পরিবেশ উন্নত করারও বেশ কিছু দাবি তোলা হয়। বহু শ্রমিকের দেহের ঘাম ও রক্ত ঝরেছে অধিকার আদায়ের সে সংগ্রামে। কত শ শ্রমিক জীবন দিয়েছে। শ্রমিকদের বেতনের নির্দিষ্ট স্কেল, একটানা লম্বা সময় কাজের বদলে নির্দিষ্ট ৮ ঘণ্টা কাজ, বাড়তি কাজের জন্য বাড়তি পারিশ্রমিক, ন্যায্য মজুরি, সাপ্তাহিক ছুটি, অসুস্থতাজরিত ছুটি, বার্ষিক ছুটি, উৎসব ছুটি এসবই আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে।

‘লেবার ডে’ প্রথম উদ্‌যাপিত হয়েছিল ১৮৮২ সালে। ১০ হাজার শ্রমিকের এক বিরাট দল নিউইয়র্কের সিটি হল থেকে প্যারেড করে ইউনিয়ন স্কয়ারে যায়। প্যারেড শেষে সবাই মিলে রিজার্ভার পার্কে পিকনিক, গানবাজনা করে পুরো দিনটি মাতিয়ে তোলে। লেবার ডের প্যারেডসহ দিনটির সব আয়োজনে ছিলেন আমেরিকান ইউনিয়ন মুভমেন্টের বিশিষ্ট নেতা পিটার জে ম্যাকগায়ার, যিনি পেশায় ছিলেন একজন কাঠমিস্ত্রি।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

১৮৮৭ সালে বেসরকারিভাবে ওরেগন অঙ্গরাজ্যে প্রথম লেবার ডেকে ছুটির দিন হিসেবে পালন করা হয়। তখনো দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ধারাবাহিক আন্দোলন চলছিল। ১৮৯৪ সালে ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের পুলম্যান শহরে শ্রমিকদের কম মজুরির প্রতিবাদে শ্রমিক ইউনিয়ন লাগাতার ধর্মঘট ডাকে। সেই ধর্মঘটের রেশ ছড়িয়ে পড়ে অন্য অঙ্গরাজ্যেও। বিক্ষোভ ভয়ংকর আকার ধারণ করে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ক্লিভল্যান্ডের নির্দেশে পুলম্যান শহরে তখন সেনাবাহিনী নেমেছিল। সংঘর্ষে ১৩জন শ্রমিক নিহত, ৫৭ জন আহত হয়। প্রচুর সম্পদ নষ্ট হয়।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ক্লিভল্যান্ড দ্রুত শ্রমিক নেতা ‘রেস’-এর সঙ্গে আলোচনায় বসেন। শ্রমিকদের দাবি মেনে নিয়ে লেবার ডেকে সরকারি স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হন। নিউইয়র্ক শ্রমিক ইউনিয়নের প্রস্তাব অনুযায়ী সেপ্টেম্বরের প্রথম সোমবার লেবার ডে নির্ধারণ হয়।

কংগ্রেস এক দিনের জাতীয় ছুটি ঘোষণা করে। অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আনন্দে প্যারেড, পিকনিকসহ নানা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দিনটি উদ্‌যাপন করার রেওয়াজ চালু হয়। ‘লেবার ডে’ এলেই মানুষ লম্বা ছুটি উপভোগ করতে পরিবার-পরিজন নিয়ে দূরে কোথাও বেড়াতে যায়।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আমেরিকার বাইরে সারা বিশ্বে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের দিনটি অবশ্য ভিন্ন। বিশ্ব এই দিনটিকে পালন করে ‘মহান মে দিবস’ হিসেবে। রক্তঝরা সংগ্রাম করে পাওয়া এই দিনটি বিশ্বব্যাপী শ্রমিকদের কাছে এক গৌরবময় দিন। এই দিনটির জন্মও কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রেই। ১৮৮৬ সালের এই দিনে শ্রমিকেরা আট ঘণ্টা কাজের অধিকারের দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের সব শিল্পাঞ্চলে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন। শিকাগোর ‘হে’ মার্কেটের সামনে বিশাল শ্রমিক জমায়েত ও বিক্ষোভ হয়েছিল। পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন ১১ জন লড়াকু শ্রমিক। আমেরিকাজুড়ে শ্রমিক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র সরকার তীব্র আন্দোলনের মুখে শ্রমিকদের সব দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলন। তখন দিনটিকে ‘মে দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিশ্বের সব দেশে আজও পালিত হচ্ছে দিবসটি।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

পরিতাপের বিষয় যে দেশটি আন্দোলনের উৎস, যেখান থেকে শ্রমিকদের লড়াইটা শুরু হয়েছিল, সেই দেশটিতে এখন আর মে দিবস পালন হয় না। অধিকাংশ মার্কিন জনগণের মধ্যে লেবার ডের ইতিহাস, এর তাৎপর্য, কারা স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন—এসব জানার ব্যাপারে তেমন একটা উৎসাহ নেই। বরং সারা সপ্তাহ পরিশ্রম করার পর দু-তিন দিন হাতে পাওয়া গেলে ওই সময়টা আনন্দ করে কাটাতেই এরা বেশি আগ্রহী। আমেরিকানরা এক কথায় ‘ফান লাভিং’ জাতি। সরকারি ক্যালেন্ডারে সেপ্টেম্বরের প্রথম সোমবার ‘লেবার ডে’ সরকারি ছুটি হিসেবে চিহ্নিত আছে। ক্যালেন্ডার দেখে বছরের শুরুতেই লোকজন প্ল্যান তৈরি করে ফেলে, লেবার ডে উইকএন্ড কীভাবে কাটাবে। তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে দূরে কোথাও বেড়াতে চলে যায়। মাছ ধরা, পিকনিক, ক্যাম্পিং অথবা সমুদ্র সৈকতে ভ্রমণ করে সবাই আসন্ন শীতের প্রস্তুতি নিতে থাকে। অবশ্য মহামারি চলাকালে এবার সামারের চিত্রটি ছিল গতানুগতিকতার সম্পূর্ণ বিপরীত। কোভিড-১৯ মহামারির ভয়ে দীর্ঘদিন মানুষ ঘরবন্দী ছিল। ছিল সরকার আরোপিত লকডাউনের মধ্যে। ধাপে ধাপে লকডাউন শিথিল হতেই মানুষ বাইরে বের হতে শুরু করে। যারা খানিকটা দ্বিধান্বিত ছিলেন, আউটডোরে যাবেন কি যাবেন না, তারাও লেবার ডের উইকএন্ডে ‘হুররে’ বলে বেরিয়ে পড়েছেন হ্যাং আউটের উদ্দেশ্যে।

আমাদের আবাসিক সম্পাদক সাহেব তাই আজকের দিনে তার সাংবাদিক, রিপোর্টার বা লেখক বাহিনীর কাউকেই খুঁজে পাচ্ছেন না। কেউ ছুটেছে সাগরে, কেউ পাহাড়ে, কেউ বনে, কেউ-বা ছুটির নিমন্ত্রণে! কারণ শীত এসে যাচ্ছে। ভ্যাকসিন না এলে, করোনার প্রকোপ বাড়লে আবারও গৃহবন্দী হতে হবে যে!

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন