‘মমতাবিহীন কালস্রোতে /বাংলার রাষ্ট্র সীমা হতে/ নির্বাসিতা তুমি/ সুন্দরী শ্রীভূমি।’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেটে ভ্রমণে এসে এভাবেই সিলেটকে দেখেছিলেন। বহুদিন থেকে সিলেটে একটা প্রবাদ প্রচলিত আছে—‘শ্রীহট্টে মধ্যমা নাস্তি’। অর্থাৎ, সিলেটের লোকেরা সকল ক্ষেত্রেই উত্তম। পৃথিবীতে অনেক কিছুই দু চোখ দিয়ে দেখা হলেও অন্তর্দৃষ্টিতে সব সময় দেখা হয় না।

বৃহত্তর সিলেটে জন্মগ্রহণ করেও দুটি পাতা একটি কুড়ির বিভাগ সিলেটকে দেখা হয়নি হৃদয় খুলে। এমনকি চা বাগান থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরত্বে বাস করেছি এক দশকেরও বেশি সময়। কখনো চা বাগানের আঙিনা মাড়াইনি। বিদেশ বিভুঁইয়ে নিকট আত্মীয়দের থাকার সুবাদে চা বাগানের পাশ দিয়ে এয়ারপোর্ট রোড যে কতবার মাড়িয়েছি, তার ইয়ত্তা নেই। প্রবাসী স্বজনদের আগমনে ফুরফুরে আনন্দে ভরা থাকত মনটা। চা বাগানের পাশ দিয়ে যেতে যেতে দারুণ এক আকর্ষণে বিমোহিত হতাম। আবার প্রবাসীদের বিদায় জানাতে সেই একই রাস্তা, সেই মালিনীছড়া, সেই লাক্কাতুরা, দুটি পাতা একটি কুঁড়ির সবুজে ঘেরা সুন্দর পরিপাটি চা বাগানের বিস্তৃত এলাকা। দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে অনেক ছায়া বৃক্ষের কান্না শুনতাম। এমনি করেই চা পাতার কুঁড়ি স্পর্শ করার আকাঙ্ক্ষা মনেই থেকে গেল।

তিন দশকেরও বেশি সময় হলো আমি প্রবাসী। শিকড়ের টানে স্বল্প সময়ের জন্য দেশে যাওয়া হয়। দেশে জনজীবনের পরিবর্তন দেখে অবাক হই। আবার ক্ষুধার্ত মানুষগুলোর দুঃখে আহত হয়ে সবকিছু বিলিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা হয়। আমার মতো পরিবারের সবাই মিস করে সিলেটকে। সিলেটের বিখ্যাত স্থাপনাসহ বিশাল চা বাগানকে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে পরিবারের সবাইকে নিয়ে দেশে গেলাম। সবাই চা বাগান দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করল। এখন এই চা বাগানকে ঘিরে গড়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র। বিরাট পরিসরে গড়ে উঠেছে খেলার মাঠ। সবই শোনা কথা। দেখা হয়নি। তাই আমিও ভাবলাম এ সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না।

বিজ্ঞাপন

সুনামগঞ্জ থেকে গাড়ি নিয়ে চলে গেলাম সিলেট, তথা বাংলাদেশের প্রথম প্রতিষ্ঠিত মালিনীছড়া চা বাগানে। চা বাগান দেখার অভিপ্রায়ে প্রথমেই থমকে গেলাম শ্রমিকদের সামনে। চা শ্রমিকদের দাবি তাদের একটা ফি দিতে হবে; তারপর ওরা নির্ধারিত জায়গাগুলো দেখাবে। আমরা রাজি হলাম। একজন চা শ্রমিক সবাইকে রাস্তা দেখিয়ে আগে আগে চলতে লাগলেন। আমরা তাঁকে অনুসরণ করে হাঁটছি। ছোট-বড় টিলার কখনো নিচু, কখনো উঁচু পথ মাড়িয়ে শ্রমিক বস্তির সামনে গিয়ে থামলেন সে লোক। ওখানে ছোট চালা ঘরে চায়ের পসরা নিয়ে বসে আছেন এক নারী। এই শ্রমিক নারীর চোখ একটু টেরা। বাঁশের তৈরি বেঞ্চে বসা ছিলেন দুজন চা শ্রমিক। আমরা যাওয়ার পরই দুজন তড়িঘড়ি করে উঠে গেলেন। ভাবলাম ব্যবসাটা মন্দ না। জিজ্ঞেস করে জানলাম, তাঁদের কাছে নিজস্ব প্রক্রিয়ায় তৈরি ‘গ্রিন টি’ও আছে। রেগুলার চা তো নস্যি। ভর দুপুরে কোন চা খাব; কোনোটাই যেন রুচিতে যাচ্ছে না। পরে কিছুক্ষণ বসার খেসারত হিসেবে কয়েক কাপ লাল চায়ের অর্ডার দিয়ে চা শ্রমিক লোকটার সঙ্গে গল্পে মাতলাম। চা শ্রমিকদের জীবনধারার অনেক গল্প শোনা হলো। শুনে অবাক হলাম, শ্রমিক লোকটার মুখে কোনো দুঃখের কাহিনি নেই। এতক্ষণ পরিবারের অন্যরা ফটোসেশনে ব্যস্ত ছিল।

প্রাচীনকালে চীন দেশের বিখ্যাত পানীয় ছিল চা। চীনে ‘টি’-এর নাম ছিল ‘চি’। সেখান থেকেই পরে তা হয়ে যায় চা। পরে চা হয়ে যায় বিশ্বের সর্বাধিক সমাদৃত পানীয়। ব্রিটিশরা চায়ের সুখ্যাতি দেখে চীন থেকে চুরি করে নিয়ে আসে ২০ হাজার চারা। ভারতের দার্জিলিং পাহাড়ে এবং চট্টগ্রামে এসব চারা রোপণ করে পরীক্ষামূলকভাবে বাগান তৈরি করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, যা ব্রিটিশ রাবাবি বলেও খ্যাত। পরে ভারতের আসাম হয়ে সিলেটে গড়ে ওঠা প্রথম মালিনীছড়া চা বাগান প্রতিষ্ঠা করে। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে শুরু হয় চা চাষ।

উনিশ শতকের প্রথম ভাগে আসাম ও তদ্‌সংলগ্ন এলাকায় চা চাষ শুরু হয়। তারই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরে ১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দে জমি বরাদ্দ করে চা চাষের উপযোগী করা হয়। কিন্তু এই প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি। পরে চট্টগ্রাম ক্লাবসংলগ্ন একটা চা বাগান গড়ে ওঠে। কিন্তু অল্প দিনে বিলুপ্ত হয়ে যায় সেই চা বাগান। অতঃপর ১৮৫৪ সালে সিলেটের এয়ারপোর্ট রোডে মালিনীছড়া চা বাগান বাণিজ্যিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলত এটাই সিলেট, তথা বাংলাদেশের প্রথম চা বাগান।

চা বলতে সাধারণত আমরা বুঝি এক ধরনের ‘ক্যামেলিয়া সিনেনসিস’ নামক উদ্ভিদের পাতা থেকে তৈরি পানীয়কে। প্রক্রিয়াকরণের বিভিন্ন ধরনের কারণে এতে গুনের যে তারতম্য ঘটে, তা হয়তো আমরা অনেকেই জানি না। প্রস্তুত প্রণালিতে একেক ধরনের চায়ে একেক স্বাদ যুক্ত হয়। কিছু কিছু চা ওষুধ হিসেবে ব্যবহার হয়। যেমন ‘ক্যামামেল টি’-তে কোনো ক্যাফেইন না থাকায় নিদ্রাজনিত সমস্যায় খুবই উপকারী। ভেষজ চা এক ধরনের উদ্ভিদের পাতা, ফুল ও ফল থেকে উৎপাদিত হয় বলে এতে কোনো ক্যাফেইন থাকে না। বর্তমান পৃথিবীতে অনেক ধরনের চা উৎপন্ন হচ্ছে—লাল চা, কালো চা, সবুজ চা, সাদা চা ইত্যাদি।

সিলেটের শ্রীমঙ্গলের চা বাগানে প্রায় সাত প্রকার চায়ের মিশ্রণে এক বিলাসবহুল চা তৈরি করা হয়। সিলেটের চা পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে রপ্তানি হয় বলে এটি ‘সিলেটী টি’ হিসেবেও খ্যাতি অর্জন করেছে।

বিজ্ঞাপন

লন্ডনপ্রবাসী এক সিলেটী উদ্যোক্তার ‘টি হাউসে’ বিশ্বের অনেকগুলো দেশে উৎপাদিত প্রায় ১১৬ ধরনের চা রয়েছে। যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারসহ ব্রিটিশ পার্লামেন্টের অনেক গুণীজন ‘সিলেট টি হাউসের’ চায়ের স্বাদ নিয়েছেন।

সেই উনিশ শতকের শুরু থেকে চায়ের যে বিস্তার ঘটেছে দেশে, তাতে এই পানীয় এখন দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পানীয়। দেশের রাস্তার পাশের পানের দোকানেও এক পাশে বসানো থাকে ফুটন্ত জলের বড় কেটলি। পথচারী লোকজন চায়ের স্বাদ নিচ্ছে। একেকজনের প্রিয় একেক ধরনের চা। কেউ দুধ চা, কেউ আদা চা, কেউ-বা চিনি ছাড়া লাল চা। বাসা-বাড়িতে মেহমান আপ্যায়নে চায়ের সঙ্গে টা-ও থাকে। সঙ্গে থাকে জিরা-কাটা সুপারি দিয়ে পানদান। সবই মূলত চায়ের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

চায়ের স্তুতি কতজনই না করেছেন। পশ্চিমবঙ্গের শিল্পী কবীর সুমনের সেই বিখ্যাত গানে তিনি বলছেন—‘এক কাপ চায়ে আমি তোমাকে চাই।’ নন্দিত কথাসাহিত্যিক হ‌ুমায়ূন আহমেদও চায়ের স্তুতি করেছিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে— ‘এক কাপ উষ্ণ চা একজন ভালো বন্ধুর মতো।’ সে যা-ই হোক স্বাদে হোক, গন্ধে হোক, উষ্ণতায় হোক, চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠুক। চা-প্রেমীদের প্রতিটি দিন শুরু হোক এক ধোঁয়া ওঠা চায়ে চুমুক দিয়ে। চায়ের আসর জমে উঠুক। একে কেন্দ্র করে তর্কের ঝড় বয়ে যাক বন্ধুদের মধ্যে।

মন্তব্য পড়ুন 0