default-image

ছোটবেলাতেই স্বপ্ন দেখেছিলেন মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন নিয়ে কাজ করবেন। ১৯৭১ সালের ভয়াল সেই দুঃসময় খুব কাছ থেকেই দেখেছিলেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অত্যাচার। নিতান্তই কৈশোরোত্তীর্ণ এক বালিকা তখন তিনি। তারপর কত পথ পাড়ি দিলেন। কত চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজ তিনি এক কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন। এই অদম্য নারীর নাম আইরিন জুবেদা খান।

সম্প্রতি জাতিসংঘে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাবিষয়ক বিশেষ দূতের দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। এই পদে তাঁর আগে ডেভিড কায়ি দায়িত্ব পালন করছিলেন। চলতি আগস্ট মাস থেকে পরবর্তী তিন বছর পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করবেন। অবশ্য জাতিসংঘে তাঁর দায়িত্ব পালনের ইতিহাস এটাই প্রথম নয়। এর আগে ১৯৮০ সালে জাতিসংঘের শরণার্থী-বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরে (ইউএনএইচসিআর) যোগ দিয়ে টানা কুড়ি বছর কাজ করেন আইরিন জুবেদা খান। ১৯৯৫ সালে ইউএনএইচসিআরের ভারত মিশনের প্রধানের দায়িত্ব পান। এত কম বয়সে তাঁর আগে এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব আর কেউ পাননি। ১৯৯৯ সালে কসোভো সংকটের সময় ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন আইরিন। ওই বছরই সংস্থাটিতে ডেপুটি ডিরেক্টর অব ইন্টারন্যাশনাল প্রোটেকশন হিসেবে পদোন্নতি ঘটে তাঁর।

বিজ্ঞাপন

সিলেটের এক বিখ্যাত পরিবারে ১৯৫৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর জন্ম হয় আইরিন জোবেদা খানের। তাঁর প্রপিতামহ গজনফর আলী খান ছিলেন ব্রিটিশ আমলে প্রথম বাংলাদেশি আইসিএস। ১৮৯৭ সালে ভারতের সর্বোচ্চ ক্যাডার সার্ভিস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তিনি প্রথম স্থান দখল করেছিলেন। তার আগে ১৮৬২ সালে ওই পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম বাঙালি আইসিএস হন।

ব্রিটিশ সরকার গজনফর আলী খানকে ‘সিআইই’ খেতাবে ভূষিত করেছিল। সিলেট জেলার ঐতিহ্যবাহী ওই পরিবারে অনেক কৃতি পুরুষের জন্ম। প্রয়াত রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহাবুব আলী খান ছিলেন আইরিন খানের চাচা। আইরিন খানের দাদার বোন জিল খান আসাম অঞ্চলের প্রথম নারী, যিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছিলেন। আইরিন খানের বাবার নাম সিকান্দার আলী খান। তাঁর দাদা ছিলেন ব্যারিস্টার আহমদ আলী খান, যিনি ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন আইন বিষয়ে। আইরিন খানের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। ঢাকার গ্রিন হেরাল্ড স্কুলে পড়াশোনা শুরু হলেও খুব অল্প বয়সে দেশ ছেড়ে চলে যান আয়ারল্যান্ডে। সেখান থেকে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি নেন। আইনে সর্বশেষ পাঠ নেন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই পর্যায়ে তাঁর বিষয় ছিল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংক্রান্ত আইন।

১৯৭১ সালের ভয়াল স্মৃতি আইরিনকে মানবাধিকার নিয়ে পড়াশোনায় অনুপ্রাণিত করেছিল। ১৯৭৭ সালে মানবাধিকার কর্মী হিসেবে ‘কনফার্ম ইউনিভার্সেল’ নামে একটি সংস্থা গঠনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেন তিনি। ১৯৭৯ সালে আন্তর্জাতিক জুরি কমিশনে যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। ২০০১ সালে আইরিন খান অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে যোগ দেন। এ পর্যায়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের গুয়ানতানামো বে ডিটেনশন সেন্টারের কতিপয় বিতর্কিত আইনের পরিবর্তন সাধনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। ২০০৪ সাল থেকে তিনি দুনিয়াব্যাপী নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধের ডাক দিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন বিরামহীন।

বিজ্ঞাপন

২০০৯ সালের মে মাসে অ্যামনেস্টির ‘ডিমান্ড ডিগনিটি’র বিষয়েও একটি আন্দোলনের সূচনা ঘটান আইরিন। সেখান থেকে দাবি তোলা হয়েছিল—‘মানবাধিকার হচ্ছে মানুষের মৌলিক অধিকার। একজন গরিব মানুষেরও অধিকার রয়েছে মানুষের মতো বেঁচে থাকার।’ নয় বছর ওই পদে দায়িত্ব পালন শেষে ২০০৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর তিনি স্বেচ্ছায় এই পদ থেকে সরে দাঁড়ান। যোগ দেন ইউনিভার্সিটি অব সেইফোর্ডের আচার্য পদে। একই সঙ্গে চ্যারিটি কমিশন অব ইংল্যান্ডের সদস্য হিসেবে কাজ করেন।

মানবাধিকার নিয়ে কাজের জন্য অনেক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছে আইরিন খান। এর মধ্যে অন্যতম হলো ২০০২ সালে ফোর্ড ফাউন্ডেশনের ফেলোশিপ ও পিলকিংটন উইম্যান অব দ্য ইয়ার পুরস্কার ও ২০০৬ সালে সিডনি শান্তি পুরস্কার। ২০১০ সালের ১৫ মে তিনি বাংলাদেশে ফেরত আসেন এবং যোগ দেন বাংলাদেশের শীর্ষ ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের কনসালটিং এডিটর হিসেবে।

অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন