default-image

বৈশাখের আগের রাত। দেশ ছাড়া দুই বাংলাদেশি মার্কিন মেয়ের মন খারাপ। দেশে কাটানো বৈশাখ তারা ভুলতে পারে না। ভিডিও কলে ফেলে আসা দিনের স্মৃতি হাতড়ায়। মা দেশে থাকলে শাড়ি পরে চট্টগ্রামের ডিসি হিলের মেলায় যাওয়া হতো। আহা!

সন্তানদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশে মানুষ ছুটে আসে পড়াশোনার জন্য। এখানে সবকিছুই ভালো, কারও কোনো অভিযোগ নেই। তবে যেকোনো উৎসবেই সব বাঙালির মন কাঁদে দেশের জন্য। পরবাসে বাস করা বাংলাদেশের মানুষের বৈশাখ, ঈদ, পূজা—এসবে কেমন আছেন জানতে চাইলে, মন ভার করা উচ্চারণে বলতে শোনা যায়, এখানে আর কেমন উৎসব! কোনো রকমে পালন করা আর কি। উৎসব তো নয়, এ যে পেছনে ফেলে আসা দেশের জন্য মন খারাপের দিন।

বিদেশে আসার পর থেকে সবকিছুতেই পরিবর্তন এসেছে। আবহাওয়া শুধু বদলে যায়নি, পাল্টে গেছে সময়ের কাঁটা। ছোট হয়ে গেছে পরিবারের পরিধি। পরিবারের সবাইকে যেন হারিয়ে ফেলা। পরিবার বলতে বাঙালিরা শুধু মা-বাবা সন্তানদের বুঝি তা নয়। বিয়ের পর মেয়েদের জীবন ঘেরা থাকে শ্বশুর বাড়ির আত্মীয়স্বজনে। পরবাসে মাঝে মাঝে ভেবে কূল পাওয়া যায় না, সবই তো আছে কেন এত শূন্যতা? মনের গহিনে কেন এত তোলপাড়? এই দেশে আসার পর থেকে সবই ফিকে হয়ে গেছে।

আমেরিকান বাংলা কমিউনিটিতে প্রতি বছর জমজমাট বৈশাখী আয়োজন হয়। বিশেষ করে চেষ্টা করা হয় দেশের আমেজ ফুটিয়ে তুলতে। এবার করোনা এসে সব আনন্দ ফিকে করে দিয়েছে। চারদিকে শুধু আতঙ্ক। অস্থির এক সময়ের ঘূর্ণিপাক। করোনা নিয়ে শুরুতে মানুষ তেমন সাবধান না হলেও এখন হয়েছে। তাই এবার ঘরে বসে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বৈশাখ পালন করা হয়েছে।

এরপরই এসেছে পবিত্র রমজান মাস। এই পুরো মাসজুড়ে রকমারি ইফতারের আয়োজন চলে মুসলমানদের ঘরে। অলিতে গলিতে দোকানিরা নানা পদের ইফতারের পসরা সাজিয়ে বসেন।

বিজ্ঞাপন

দেশে থাকতে ইফতারের সময় ডাইনিং টেবিলে সবার জায়গা হতো না। তাই ফ্লোরে চাদর বিছিয়ে রোজার ইফতারি করার রেওয়াজ ছিল। কত পরিচিত অল্প অপরিচিতদের সঙ্গে ইফতার করেছি, তা মনে করে হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়।

যেদিন বাসায় শ্বশুর আসতেন, সেদিন অতিরিক্ত রান্না হতো। তিনি মুখে খেতেন কম। চোখে খেতেন বেশি। ঘরে ছেলের বউ যত আইটেমই তৈরি করুক না কেন, দোকানের তৈরি ইফতার কেনা কোনো দিন বাদ যায়নি। অমুক দোকানের চিকন জিলাপি ভালো, তমুক দোকানের হালিম ভালো। খেতেই হবে। আজ বাসার পাশের দোকানের তেহারির ভালো সুগন্ধ বের হয়েছে। দে দৌড়। এভাবেই ইফতারের আগে টেবিলভর্তি হয়ে যেত নানা পদের খাবারে।

যা চলে গেছে, তা কি সত্যিই গেছে! না, যায়নি। আটলান্টিকের এ পাড়ে এসে বড় পরিবার থেকে মাইক্রো পরিবার হয়ে গেছি আমরা। চারজনের পরিবার এখন দুজনে এসে ঠেকেছে। যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়া বাতাস বিবেচনায় নিয়ে বলতে গেলে বলতে হয়, এই দুজন কখন যে একজনে নেমে আসে তা বলা মুশকিল। পড়াশোনা নিয়ে হোস্টেলে থাকা মেয়েরা ব্যস্ত। একা থাকে, কী খায় চোখে দেখি না। মাঝে মাঝে আলু দিয়ে মুরগির ঝোলের আফসোস কানে আসে।

এক সময় মেয়েরা নিজেদের পছন্দ মতো জীবন সাজিয়ে নেবে। হয়তো দেশকে ভুলে যাবে। তবে দেখেছি, তাদেরও মন পোড়ে দেশের জন্য। জীবনের প্রথমবার মেয়েদের ছেড়ে ইফতার করতে মায়ের খুব অসহায় লাগে। ইফতার সামনে নিয়ে বুক ফেটে কান্না আসে। মেয়েদের বাবা এদিক-সেদিক তাকিয়ে কান্না লুকানোর চেষ্টা করে। এখানে ইফতার সাহরির জন্য কোনো সাইরেন দেওয়া হয় না। তাই মোবাইলে আজান শুনে মেয়েদের বাবা কোনো রকম গলা ভিজিয়ে রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। বুঝতে পারি তাঁর ভেতরেও উথালপাতাল কষ্ট। এই কষ্ট শুধু নিজের মেয়েদের জন্য নয়, তাঁর বাবার জন্যও। ইফতারের সময়ে বাবার জন্য দুনিয়া তোলপাড় করা সময়ের কথা মনে করে অঝোরে কাঁদবে। দেশ ছাড়ার পর তাঁর বাবার মৃত্যু হয়। এরপর থেকে ঘরে কারও সামনে কাঁদেন না। বাইরে পার্ক করা গাড়ির ভেতরে অঝোরে কেঁদে বুক ভাসান। এসব দেখে দলা পাকানো কষ্ট গলা পর্যন্ত আটকে আসে। মনে হয় এই বুঝি দম বন্ধ হয়ে আসবে। মনে হয়, কিছু সময় চিৎকার করে কাঁদলে বুঝি মনে শান্তি আসবে।

তবে সময় মন খারাপের জন্য থেমে থাকে না। সময় বয়ে যায় আপন নিয়মে। রোজার মাস যেন আরও তাড়াতাড়ি যায়। একা খেতে মন না চাইলেও ইফতার বানানোর অভ্যাস পুরোনো। মেয়েরা হোস্টেল থেকে ভিডিও কলে সব দেখে।

নিজের দেশ ছেড়ে বিদেশের মাটিতে যত সুখেই থাকুন না কেন, মনে হবে সবই আছে আবার কী যেন নেই। যতই আরাম আয়েশে থাকুন না কেন, ব্যাপারটা এমন যেন আপনি নিজের বাসায় না ঘুমিয়ে অন্য কারও বাসায় আশ্রিত। আপনার সব আছে আবার কিছুই নেই। এই না থাকার যে কষ্ট নিয়েই আমাদের উৎসব পালন করতে হয়। আর তাই ঈদের দিনটাও এখানে অনেকটাই আনন্দ-বেদনায় মিশ্রিত একটা সময়।

বিজ্ঞাপন
অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন