default-image

লকডাউন দিয়েই এবারের রমজানের শুরু। চলুন সব মুসলিম এক হয়ে এই রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করি এবং আল্লাহর সান্নিধ্য কামনা করি। মহামারি থেকে পানাহ চাই। রমজান মাস হলো পুণ্য অর্জনের একটি পবিত্র মাস। রমজানের সঙ্গে ইফতারের আয়োজনটা আমাদের সংস্কৃতিতে বেশ জমকালো ব্যাপার। সারা দিনের রোজার শেষ হয় ইফতারের মাধ্যমে। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী রোজাদাররা ইফতার করেন। কেউ বিশাল আকারে টেবিল সাজিয়ে রাখেন ইফতারের আগ মুহূর্তে, আবার কেউ বা সামান্য একটা খেজুর ও পানি দিয়েই ইফতার সারেন। রোজার সঙ্গে ইফতারের সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

পবিত্র রমজান মাসের একটি ইবাদতের মূল্য অন্য মাসের ৭০টি ইবাদতের সমান অর্থাৎ এই মাসে এক ইবাদতের সওয়াব অন্যান্য মাসের ৭০ গুন। মুসলমানদের আচার ব্যবহার, সংযত কথাবার্তা, দান-খয়রাত ইত্যাদি রমজান মাসে একটা আলাদা শান্তিময় পরিবেশের সৃষ্টি করে। এত কথা বলার কারণ হলো, বর্তমানের ইফতার প্রথা-ইফতার রোজার একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। রোজাদারকে ইফতার করানো সুন্নত ও অনেক পুণ্যের কাজ।

রমজানে মুসলিম আত্মীয়-স্বজনেরা তথা গরিবদের ইফতার দিয়ে থাকে। এতে একদিকে যেমন সুসম্পর্ক বজায় থাকে, অন্যদিকে একটা শান্তিপূর্ণ সৌহার্দ্যময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সামর্থ্য অনুযায়ী, প্রত্যেক ব্যক্তিই নিজ খুশি মতে ইফতার করাতে পারেন। এর কোনো ধরা-বাঁধা নিয়ম নেই। কিন্তু বর্তমানে মেয়ের শ্বশুর বাড়ি ইফতার দেওয়াটা গ্যাসট্রিক আলসারের মতো একধরনের ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। রমজান মাস এলে মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে ইফতার পাঠানো যেন একটা প্রতিযোগিতার মতো দেখা যায়। প্রয়োজনের চেয়ে অধিক খাদ্যসামগ্রী পাঠানো যেন একটা গর্বের বা সম্মানের ব্যাপার—এমনটিই মনে করেন অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তি। আর নতুন বিয়ে হলে তো কথাই নেই, দু-তিনবার ইফতার সামগ্রী পাঠানো যেন একটা রেওয়াজে পরিণত হয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

যে বাবার অনেক আছে, তিনি মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে ২/৩ বার ইফতার পাঠিয়ে যেমন বেয়াইর বাড়িতে তার মুখ উজ্জ্বল করেন, ঠিক তেমনি মেয়ের জামাইও মহাখুশিতে থাকেন তার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনকে আপ্যায়ন করিয়ে। শ্বশুর বাড়ির ইফতার দিয়ে সামাজিক স্ট্যাটাস বাড়ান বন্ধু বা আত্মীয় মহলে। কিন্তু যে বাবা গরিব, অসহায়, কিংবা মধ্যবিত্ত, তাঁর জন্য রমজান মাস বেশ কষ্টের, হতাশার মাস, আফসোসের মাস, নীরবে চোখে পানি ফেলার মাস।

কিন্তু কেন? আমরা তো জানি, এ মাস রহমতের মাস, শান্তিপূর্ণ মাস। তবে কেন আমাদের সমাজে এই পবিত্র মাসে মুসলমানে মুসলমানে বৈষম্যমূলক ব্যবহার? কিছু সমাজপতি, শিল্পপতি, ধনাঢ্য ব্যক্তির গড়ে তোলা সামাজিক নিয়মকানুনে অসহায় গরিব বাবারা আজ বলি হচ্ছেন এই কুসংস্কারাচ্ছন্ন নিয়মকানুনে। কত অসহায় বাবা ঋণ করে কিংবা বড় লোক আত্মীয়ের কাছে হাত পেতে টাকা জোগাড় করে মেয়ের বাড়িতে ইফতার পাঠান।

একবার এই বাবা-মায়ের কথা বিবেক দিয়ে ভাবুন তো। এটা তাদের ওপর জুলুম নয়? শুধু কি ইফতার? ইফতারের সঙ্গে থাকতে হয় নতুন কাপড়ও, যদি মেয়েটির নতুন বিয়ে হয়ে থাকে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গরিব কন্যাদায়গ্রস্ত বাবা-মায়েরা। এমনিতেই বাজারে দ্রব্যমূল্যের চড়াদাম। ফলে হয়তো কোনো গরিব বাবা-মাকে মেয়ের বাড়িতে অনেক কষ্টে টাকা সংগ্রহ করে ইফতার পাঠাতে হয়। ভালোভাবে ইফতার পাঠাতে না পারলে যদি মেয়েকে শ্বশুরবাড়ির লোকের লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সইতে হয়, এই ভয়েই বাধ্য হয়েই ইফতার পাঠাতে হয় বাবাকে। ভালোভাবে ইফতার সামগ্রী পাঠাতে না পারলে যদি সমাজের কাছে নববধূকে বা তার পরিবারের লোকদের হেয় প্রতিপন্ন হতে হয়। এখন এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে।

এদিকে ইফতার পাঠাতে গিয়ে হয়তো সেই পরিবারের সদস্যদের বা ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ঈদের জামাকাপড় বা খাদ্যসামগ্রী জোটানোও মুশকিল হয়ে পড়ে অনেক ক্ষেত্রে। ফলে ঈদের আনন্দ ম্লান হচ্ছে সেসব পরিবারের। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, এর ফলে সত্যিকার অর্থে আমরা ইফতারের প্রকৃত তাৎপর্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছি দিন দিন।

আমার প্রশ্ন হলো—কে এই নিয়মগুলো বের করেছে? কেউ কি জানেন? হয়তোবা বলবেন ইতিহাস। কিন্তু বর্তমানে যারা খুব নিয়ম করে মেয়ের বাড়ি থেকে এসব ইফতার সামগ্রী আদায় করেন, এগুলোর পক্ষ নিয়ে কথা বলেন, তাদের কাছে আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে, আপনারা বলেন এগুলো সমাজের সৌন্দর্য, সমাজে সুন্দরভাবে বসবাস করতে হলে সামাজিক নিয়ম–কানুন মেনে চলতে হয়। ভালো কথা, খুবই ভালো কথা। কিন্তু সমাজের সৌন্দর্য রক্ষার জন্য শুধু মেয়ের বাবা-মাকে কেন ভোগান্তির কিংবা কষ্টের স্বীকার হতে হবে? ছেলের বাড়ি থেকে কেন আদান-প্রদান হয় না? মেয়ের বাড়ির বাবা-মা যদি ছেলের বাড়ির গোষ্ঠীকে ইফতার খাওয়াতে পারেন, তবে ছেলের বাড়িরও উচিত মেয়ের বাড়ির গোষ্ঠীকে ইফতার খাওয়ানো।

এক পক্ষ শুধু গাড়ি বোঝাই করে ইফতার পাঠাবেন, আর অন্য পক্ষ আরামে খাবেন, তা কি করে হয়? দুপক্ষ সমানভাবে ইফতার আদান-প্রদান করলে তবেই না সমানে সমান হবে, সমাজ সুন্দর হবে। হজরত মোহাম্মদ (স.) আরফার ময়দানে বিদায়ী হজের শেষ বক্তব্যে তাঁর উম্মতদের উদ্দেশে বলেছেন, কোনো মুসলমানের কাছেই কোনো মুসলমানের দেওয়া জিনিস ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য হবে না, যতক্ষণ না সে নিজ ইচ্ছায় বা মুক্তমনে তা দিচ্ছে। জোর করে কেউ কারও ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দিতে বা আদায় করতে পারবে না।’

ইসলামে জোরাজুরি, জবরদস্তির কোনো বিধান নেই। তাই ইফতার নিয়েও আমাদের এরূপ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। এ বিষয়ে প্রত্যেক শুভবুদ্ধিসম্পন্ন, সচেতন নাগরিককে এগিয়ে আসতে হবে। ইফতার প্রথাটা যাতে বাধ্যতামূলক না হয়, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। সুখের কথা হলো, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মীয় বিভিন্ন সংগঠন তথা শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সচেতন নাগরিক এ প্রথা রোধ করতে অনেকটাই সমর্থ হয়েছেন। আর জনসাধারণেরও এতে মিলেছে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন।

বিজ্ঞাপন

বলতে দ্বিধা নেই, একমাত্র বাঙালি মুসলিম সমাজেই ইফতার প্রথাটা বাধ্যতামূলক বা নিয়মে পর্যবসিত হয়েছে। তাই, অবিলম্বে ইফতার প্রথা রোধ করাটা প্রয়োজন। আমার কথায় হয়তো কেউ কষ্ট পেতে পারেন, কিন্তু আমার কথাগুলো একবার বিবেক জাগ্রত করে ভাবুন। আমি চাই, আমাদের সামাজিক বন্ধন, সুসম্পর্ক বজায় থাকুক প্রতিক্ষেত্রে। আমরা কেই কাউকে ছোট করে না ভাবি, কেউ যেন কাউকে মনঃকষ্ট দিয়ে কিছু স্বার্থ আদায় না করি। ধনীরা এই ইফতার প্রথা মেনে চলেন বলেই গরিবদের ভোগান্তি হয়। যাঁরা সামর্থ্যবান তাঁরা যদি পদক্ষেপ নেন, এই অনিয়মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান, তাহলে অবশ্যই সম্ভব এই ইফতার প্রথাকে না বলা। আমি চারপাশের এসব অত্যাচার, অনিয়ম দেখে খুব বিচলিত হই। করোনার কারণে দেশে অভাব-অনটন বেড়েই চলেছে, ঘরে ঘরে যেহেতু সব মানুষের কাজকর্ম বন্ধ, তারপরও সমাজের মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত এই শ্রেণির মানুষগুলো আজ করোনার কারণে প্রায় অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়ছে। তাই সামাজিক এসব প্রথা বন্ধ হওয়া অতীব জরুরি।

করোনার কারণে হয়তো এসব লেনদেন এবার কম হতে পারে। করোনাকালে সামর্থ্যবানদের উচিত, মেয়ের বাড়িতে ইফতার না দিয়ে অসহায় গরিব মানুষের পাশে দাঁড়ানো। প্রতিবারই তো লোক দেখানো সমাজে মেয়ের বাড়িতে ইফতার পাঠিয়ে সুনাম কুড়ান আর তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন। এবার না হয় একটু ব্যতিক্রম করেন। আপনার বাসার বিলাসী ইফতার ত্যাগ করে এলাকার গরিব দুস্থদের ইফতার বিলিয়ে দিন। এতে অসহায় মানুষের মুখে যেমন হাসি ফুটবে, তেমনি আল্লাহও খুশি হবেন। আল্লাহ চাইলে মুহূর্তেই করোনা নামক মহামারি থেকে মানবজাতিকে রক্ষাও করতে পারেন। তিনিই তো মহান। মনুষ্যত্ববোধ জাগ্রত হোক সমাজের প্রতিটি মানুষের। আবার বলি, বিবেককে জাগিয়ে তুলুন, মেয়ের বাবা-মায়ের কথা একবার ভাবুন। শ্বশুর বাড়ির ইফতারকে না-বলুন।

অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন