default-image

আমেরিকার এক-তৃতীয়াংশ বয়স্ক নারী-পুরুষ সারাক্ষণ দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। মনোবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘ক্লিনিক্যাল অ্যাংজাইটি’ বা ‘ডিপ্রেশন’। বিগত ছয় মাসের মতো কোভিড-১৯ সময়ে প্রায় অবরুদ্ধ থাকার কারণে যে দুঃসহ নিঃসঙ্গতা, একাকিত্ব, সামাজিকভাবে মেলামেশাবিহীন অবস্থা, তা এর জন্য মূলত দায়ী হলেও ফোন, ফেসবুকসহ বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে নিত্যই আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পরিচিতজনদের করোনার কারণে মৃত্যুর সংবাদ ডিপ্রেশন বা মনোবিকারের কারণ হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। আর সঙ্গে চাকরিচ্যুতি, বেকারত্ব, জীবন বিমা সমস্যা ইত্যাদি যোগ হয়ে যে অসহায় দশায় আমরা আছি, তা বর্ণনাতীত—দস্তুরমত ভীতিকর।

কোভিড-১৯ ইতিমধ্যে সারা বিশ্বে ৮ লাখ ৫৩ হাজার ২২৫ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। গত ৩০ আগস্ট পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় মৃত্যু হয়েছে ১ লাখ ৮৩ হাজারের বেশি। এ তালিকা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২ লাখের মতো মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে কোভিড-১৯ সংক্রমণে মারা যাবে।

বিজ্ঞাপন

২০২০ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর দল যে অপরাজনীতির খেলা খেলছে এবং সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন ইস্যুতে মানসিক যন্ত্রণার জাঁতাকলে ফেলছে, তাও মনোবিকারের অন্যতম কারণ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। তা ছাড়া আফ্রিকান-আমেরিকান জনগোষ্ঠীর ওপর পুলিশ ও উগ্র শ্বেতাঙ্গদের নির্যাতন, এমনকি হত্যাসহ বিভিন্নভাবে যে সহিংসতা ছড়াচ্ছে তাও মানসিক বিপর্যয়কে গভীরতর করছে।

এমন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কোভিড-১৯-এর চলমান বিভীষিকার সঙ্গে যদি ফ্লু ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে তো বটেই সারা পৃথিবীতেই মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হবে। অতীতের ফ্লু অতিমারির কথা স্মরণে আনলে আসন্ন ফ্লু মৌসুম মানবজাতির জন্য কী ভয়াবহ অবস্থা নিয়ে হাজির হয়, তা কল্পনাতীত।

১৯১৮ সালে সারা বিশ্বে যে ইনফ্লুয়েঞ্জা প্যান্ডেমিক হয়েছিল, তা ছিল ভয়াবহ। এইচওয়ান এনওয়ান (H1 N1) ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত এ ফ্লুর আবির্ভাব কোথা থেকে হয়েছিল, তা আজতক বিজ্ঞানীরা সঠিকভাবে নিরূপণ করতে পারেননি। শুধু এটুকু জানা গেছে, এভিয়ান জাতীয় জিন থেকে এ ভাইরাসের উৎপত্তি।

যুক্তরাষ্ট্রে সৈন্যদের মধ্যে ১৯১৮ সালে প্রথম ভাইরাসটির সংক্রমণে ফ্লু পরিলক্ষিত হয়। ১৯১৮-১৯ সময়ের মধ্যে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের একভাগ বা ৫০ কোটি মানুষ এতে আক্রান্ত হয়। মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৫ কোটিতে। যুক্তরাষ্ট্রেই মারা যায় আনুমানিক ৬ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ। যারা মারা গেছে, তাদের বেশির ভাগই ছিল ৫ বছরের নিচে। ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সী তরুণ-যুবার মৃত্যুর হারও ছিল অত্যধিক। বিজ্ঞানীদের মতে ১৯১৮ সালের এই ফ্লু প্যান্ডেমিক, যা স্প্যানিশ ফ্লু নামে সমধিক পরিচিত, তা যুক্তরাষ্ট্রে মানুষের গড় আয়ু ১২ বছর কমিয়ে দিয়েছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মোট ১ লাখ ১৭ হাজার ৪৬৫ মার্কিনি প্রাণ হারিয়েছিল। স্প্যানিশ ফ্লুতে মারা গিয়েছিল এর প্রায় ৬ গুণ বেশি। স্প্যানিশ ফ্লু মোকাবিলার জন্য ‘আইসোলেশন’, ‘কোয়ারেন্টিন’, ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, জনসাধারণের সমাবেশ সীমিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। ভ্যাকসিন সে সময় বের হয়নি। ২০০৩ সালেও যুক্তরাষ্ট্রে ইনফ্লুয়েঞ্জা সংক্রমণ হয়েছিল। তবে তা তত ভয়াবহ ছিল না। কিন্তু ছয় বছর পর নভেল ফ্লু (এইচ১ এন১) নামে পরিচিত ফ্লুতে যুক্তরাষ্ট্রে ১ লাখ ১৭ হাজার ৪৬৫ জন মারা যায়।

বিজ্ঞাপন

প্রশ্ন হলো ভ্যাকসিন থাকা সত্ত্বেও ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রাদুর্ভাব এত ঘনঘন; প্রায় প্রতি বছরই হচ্ছে কেন? ভ্যাকসিন নতুন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তৈরি করাই-বা প্রয়োজন কেন? উত্তর হচ্ছে অ্যান্টিজেনিক ড্রাফটের কারণে প্রতি বছরই ফ্লু মৌসুম বা সিজন আসে। একজন ব্যক্তি তার জীবদ্দশায় কয়েকবার ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হতে পারে। প্রতি বছরই ফ্লু ভ্যাকসিন নিতে হয়। ফ্লুয়ের সংক্রমণ কোনো জনপদে হলে তবেই বিজ্ঞানীরা গবেষণা শুরু করেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কার্যকারিতা, যথাযথ মান ও মানবদেহে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয়গুলো নিশ্চিত হয়ে তবেই বাজারে ছাড়ার সরকারি অনুমোদন দেওয়া হয়। অনেকগুলো সংস্থা এতে জড়িত থাকে বলে এতে সময় লাগে।

কোভিড-১৯-এর মৃত্যু মিছিল নভেম্বরের আগে থেমে যাবে বা স্তিমিত হবে—এমন কোনো লক্ষণ যুক্তরাষ্ট্রে অন্তত দেখা যাচ্ছে না। প্রশ্ন হচ্ছে— আমরা কি ভয়াবহ একটি অবস্থার দিকে দ্রুত ধাবিত হচ্ছি? করোনার ভয়াবহ থাবা, আসন্ন ফ্লু মৌসুম, ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ছত্রচ্ছায়ায় বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাস ও অরাজকতা, বর্ণবৈষম্য—এ সব সমস্যা ও বিষাদময় চিত্র যখন একসঙ্গে সামনে আসে, তখন সন্ত্রস্ত না হয়ে উপায় থাকে না।

অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন