default-image

নিউইয়র্ক পুলিশে প্রথম দক্ষিণ এশীয় লেফটেন্যান্ট কমান্ডার শামসুল হক যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি মার্কিনদের গর্ব। ভাসছেন প্রবাসীদের ভালোবাসা আর অভিনন্দন বার্তায়। সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার বাঘা ইউনিয়নে জন্ম শামসুলের। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ থেকে অভিবাসী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান তিনি।

শামসুল হক গত সপ্তাহে এনওয়াইপিডির গোয়েন্দা স্কোয়াডে যুক্ত হয়ে প্রথম দক্ষিণ এশীয় হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন শামসুল। প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘এ দেশে পড়াশোনা নয়, এসেছিলাম কাজ করতে। সেই কাজ করতে গিয়ে বুঝে গেছি, পড়াশোনা ও ভাষাগত সমস্যাটা অনেক বড়। তাই এখানে ঘরে বসেই সম্পূর্ণ নিজের উদ্যোগে স্কুলে পড়াশোনা শুরু করি। তারপর লাগার্ডিয়া কলেজ থেকে জিইডি ও বারুক কলেজ থেকে অ্যাসোসিয়েট সম্পন্ন করি।’

কথায় কথায় জানা গেল, বারুক কলেজের ছাত্রাবস্থায় পুরো সিটি ইউনিভার্সিটি ছাত্র সাংসদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। তখন তিনি কিউনি সিটি কলেজ বোর্ডের ট্রাস্টি ছিলেন। পরে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনপ্রশাসনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন শামসুল হক। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ফাইন্যান্স মেজর নিয়ে মাস্টার ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি বলেন, ‘আমি কখনো হাই স্কুলে পড়িনি। তবু আমি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছি, যা আইভি লীগ বিশ্ববিদ্যালয়। আমি যদি পারি তবে আমার বিশ্বাস, অন্যান্য বাংলাদেশি যদি কঠোর পরিশ্রম করেন তারাও এটি পারবেন।’

শামসুল হকের ছাত্রাবস্থায় বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রে হামলার ঘটনা ঘটে। কাছে থেকে তিনি অনেক কিছু পর্যবেক্ষণ করেছেন তখন। তিনি বলেন, ওই ঘটনার পর মুসলমানদের প্রতি মার্কিনদের মনোভাব দেখেই মূলত পুলিশে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। জঙ্গি ও মুসলমান—দুটি আলাদা বিষয়। এদের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে এমন বিশ্বাস থেকে নিজের মধ্যে কিছু করার তাড়না অনুভব করেন। এ তাড়না থেকেই ২০০৪ সালে নিউইয়র্ক নগর পুলিশে অফিসার পদে যোগ দেন।

বিজ্ঞাপন

বর্তমান পুলিশ কমিশনার ডারমট শিয়ার অধীনে ইন্টারনাল অ্যাফেয়ার্সে ইনভেস্টিগেশন সেকশনে পদোন্নতি পেয়েছেন শামসুল হক। জানালেন, ১০ বছরের চাকরি জীবনে তিনি কখনো অসুস্থতার ছুটি নেননি। তাঁর যোগ্যতা ও সততা এবং সব রকম যাচাই–বাঁচাই করার পর সেরা নম্বর পেয়ে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ পদে পদোন্নতি পেয়েছেন।

শামসুল হকের চমৎকার টিম ম্যানেজমেন্ট দক্ষতার জন্য তাঁকে লেফটেন্যান্ট কমান্ডার ডিটেকটিভ পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এ দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি সব ধরনের পুলিশের তদন্ত করতে পারবেন। বলেন, তাঁর বাবা পুলিশের চাকরি পছন্দ করেননি। বাংলাদেশে থাকা বাবা বলেছিলেন, পুলিশের চাকরিতে দুর্নীতি থাকে। তিনি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশকে এক করে দেখছিলেন। পরে অবশ্য ছেলের কাজ নিয়ে বাবা খুশি হয়েছেন।

শামসুল হক বলেন, ২০১৫ সালে তিনি উদ্যোগ নিয়ে বাংলাদেশি পুলিশ অর্গানাইজেশনের ফাউন্ডেশন গঠন করেন। বাংলাদেশিদের পুলিশে যোগদান ও পদোন্নতিসহ নানা বিষয়ে সাহায্য করাই ছিল এই ফাউন্ডেশন গঠনের উদ্দেশ্য। পুলিশের সব শাখা মিলিয়ে বর্তমানে এনওয়াইপিডিতে তিন হাজারের মতো বাংলাদেশি পুলিশে রয়েছেন। নিউইয়র্কে বাংলাদেশি মার্কিন নারী পুলিশের সংখ্যাও বাড়ছে। ভবিষ্যতে এই সংখ্যা অন্য যেকোনো দেশকে ছাড়িয়ে যাবে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উদ্দেশ্য শামসুল হক বলেন, পড়াশোনার কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি এ দেশের রাজনীতি ও সমাজনীতিতে আমাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। দেশ ও সমাজের উন্নতি করতে চাইলে নীতি নির্ধারক হয়ে উঠতে হবে। এ কারণেই নতুন প্রজন্মকে এ দেশের মূলধারার রাজনীতিতে বেশি করে যোগ দিতে হবে।

নিউইয়র্কে বাংলাদেশিদের মধ্যে কোন ধরনের অপরাধ বেশি চোখে পড়ে জানতে চাইলে শামসুল বলেন, এই প্রজন্মের একটা বড় অংশ মাদক, ছোটখাটো চুরি, শপ লিফ্টিংয়ের (দোকানে চুরি) মতো অন্যায় কাজে জড়িত হয়ে পড়ছে। সংখ্যায় কম হলেও অনেক নারীদের শপ লিফটিং করতে দেখা যায়। আর ঘরে স্বামী–স্ত্রীর মধ্যে মারপিটের ঘটনাও নেহাত কম নয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিজেকে অতি চালাক ভাবা প্রবাসীরা ভুয়া ব্যবসা-বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন।

নগরের কুইন্সে এনওয়াইপিডির পুলিশ একাডেমিতে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁকে পদোন্নতি সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে বলে জানালেন শামসুল হক। তিনি বলেন, ‘আমি প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এই কীর্তি গড়তে পেরে খুশি। তবে ভবিষ্যতে এই পদে আরও অনেক বাংলাদেশি আসবে বলে আশা করি।’

শামসুল হক বলেন, সহকর্মী বাংলাদেশিদের কাছে আমার একটাই কথা। বড় স্বপ্ন দেখুন, কঠোর পরিশ্রম করুন ও নিরলসভাবে আপনার স্বপ্নগুলোকে অনুসরণ করুন। কোনো কিছুই আপনার স্বপ্ন অর্জন থেকে আপনাকে বিরত রাখতে পারবে না।

ছবি: স্ত্রী–সন্তানসহ শামসুল হক। পারিবারিক অ্যালবাম থেকে নেওয়া

বিজ্ঞাপন
নিউইয়র্ক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন