চট্টগ্রাম সমিতির ব্যাংক হিসাব (অ্যাকাউন্ট) থেকে সভাপতি আবদুল হাই জিয়ার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে অর্থ চলে গেছে। তবে ৪২ হাজার ৮৭৩ ডলার স্ত্রী সাঈদা হাইয়ের ব্যাংক হিসাবে ট্রান্সফার করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি জানাজানি হলে পরে তা আবার ফেরত দেওয়া হয়। এসব নিয়ে নানা নাটকীয়তা চলছে নিউইয়র্কের অন্যতম পরিচিত সামাজিক সংগঠন চট্টগ্রাম সমিতিতে।

কমিটির প্রভাবশালী সদস্য ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যানের পদ থেকে মো. হানিফকে বাদ দিলে সমিতির একটি বৃহৎ অংশের কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। এদিকে চিটাগাং অ্যাসোসিয়েশন অব নর্থ আমেরিকার কমিটির মেয়াদ দুই বছর পেরিয়ে গেলেও নতুন নির্বাচন দিতে গড়িমসি করছে বর্তমান কমিটি। ২০১৭ সালের এপ্রিলে বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে আবদুল হাই (জিয়া) কমিটির সভাপতি দায়িত্ব পান। কার্যকরী কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে। কিন্তু তাঁরা এক বছরের বেশি সময় ধরে বহাল তবিয়তে আছেন। এ নিয়ে সমিতির সাবেক নেতা ও সাধারণ সদস্যদের মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ১৫ আগস্ট সমিতির বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের নিয়ে চট্টগ্রাম সমিতিকে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির হাত থেকে কীভাবে রক্ষা করা যায়, এ নিয়ে জ্যামাইকার সাটফিন পার্কে একটি সভা হয়। সভায় ১১ সদস্য ‘সমাধান কমিটি’ গঠন করা হয়।

বিজ্ঞাপন

এরই পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান কমিটি আবদুল হাইয়ের নেতৃত্বে ২৩ আগস্ট সমিতির কার্যালয়ে একটি সভা হয়। সভায় দুই সপ্তাহের মধ্যে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। একই সভায় ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান পদ থেকে মো. হানিফকে কোন নোটিশ ছাড়াই সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অব্যাহতি পাওয়ার পরপরই মো. হানিফ সভাপতি আবদুল হাইয়ের বিরুদ্ধে জালিয়াতির সব বিষয় উপস্থাপন করেন। মো. হানিফ দাবি করেন, সভাপতি জিয়ার অপকর্মের প্রতিবাদ কারায় তাঁকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

বর্তমান কার্যকরী পরিষদের ১৯ সদস্যর মধ্যে ১১ জনই পদত্যাগ করেছেন। বাকি ১০ জনের মধ্যে একজন হয়েছেন বহিষ্কার, দুজন থাকেন বাফেলো এবং আরেক সদস্য চলে গেছেন বাংলাদেশে। এগারো সদস্যের উপদেষ্টা ও সমপরিমাণ ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদেরও কোন কার্যক্রম নেই। বর্তমানে ৬ সদস্য বিশিষ্ট কার্যকরী কমিটি নিয়ে চলছে চট্টগ্রাম সমিতি।

পদত্যাগকারী সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিম বলেন, ‘আমরা দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাস পর ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সমিতির আগের কমিটির কিছু অনিয়ম–দুর্নীতির তদন্ত করতে সভা আহ্বান করা হয়। একই সভায় সমিতির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান কে হবেন, তা নিয়েও আলোচনা হয়। কিন্তু কার্যকরী কমিটির সভাপতি আবদুল হাই সংখ্যাগরিষ্ঠ কার্যকরী কমিটির কথা মানতে নারাজ। তিনি প্রভাব খাটিয়ে দুর্নীতিগ্রস্তদের পক্ষ নেন। তাই সমিতির কার্যকরী কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ ১১ সদস্য পদত্যাগ করেন। তখন পদত্যাগ না করে অন্য কোন উপায়ও ছিল না। কারণ আমরা পদত্যাগ না করলে সমিতির মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতো। মারামারি হতো। এতে করে সমিতির সুনাম ক্ষুণ্ন হতো। সংখ্যাগরিষ্ঠ কার্যকরী কমিটি সদস্য পদত্যাগ করায় কার্যকরী কমিটির বৈধতা নেই। তারপরও আবদুল হাই অবৈধভাবে ক্ষমতা ধরে আছেন। আমরা নির্বাচন কমিশন গঠন ও অচিরেই সুষ্ঠু নির্বাচন চাই।

বর্তমান কার্যকরী কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আশরাফ আলী খান বলেন, ‘কার্যকরী কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে ঠিকই। কয়েক মাস আগে আমরা সাধারণ সভা ডেকেছি। রেজুলেশন অনুযায়ী সাধারণ সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে শিগগিরই নির্বাচন কমিটি গঠন করা হবে। এখানে গ্রুপিংয়ের কারণে সদস্যদের পছন্দ–অপছন্দ আছে। সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন কঠিন হবে।’

কোষাধ্যক্ষ মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, সমিতির এখন দুটি অ্যাকাউন্ট। ১১ জন কার্যকরী সদস্য পদত্যাগ করার পর ওই অ্যাকাউন্টে এখন লেনদেন বন্ধ আছে। লেনদেন বন্ধ হওয়া অ্যাকাউন্টে ৪৮ হাজার এক শ ডলার জমা আছে। নতুন অ্যাকাউন্টে ৭০ হাজার ডলার আছে। তার থেকে ৩ আগস্ট বিগত তিন বছরের ভবন ট্যাক্সের ২৭ হাজার ডলার দেওয়া হয়েছে। বাকি আরও ৪৩ হাজার ডলার অ্যাকাউন্টে জমা আছে। আমরা চেকের মাধ্যমে সব লেনদেন করছি । নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাদের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে ঠিক। তবে তিনি অবৈধভাবে সমিতি পরিচালনা করার বিষয়টি অস্বীকার করেন। নিজেদের বৈধ কমিটি দাবি করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের বলেন, সংবিধান অনুযায়ী ১১ সদস্য পদত্যাগ করার পর কার্যকরী কমিটি পরিচালনার নৈতিক অধিকার হারিয়েছে। তারপরও বর্তমান কমিটি একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের আশ্বাস দেওয়ায় ২০১৮ সালের পিকনিকে আবদুল হাইকে আমি সহযোগিতা করেছি। কিন্তু তারা তাদের কথা রাখেনি। এ ছাড়া ট্রাস্টি ও উপদেষ্টা পরিষদের ২২ সদস্যের কার্যক্রমও স্থগিত করে রেখেছে। আমি চাই দ্রুত একটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন।

ট্রাস্টি বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মনির আহমেদ বলেন, এই কমিটি অবৈধ। তাদের সমিতি পরিচালনা করার কোন এখতিয়ার নেই। নানা অজুহাতে তারা সময় ক্ষেপণ করছে। অচিরেই নির্বাচন কমিশন গঠন ও সুষ্ঠু নির্বাচন জরুরি।

এদিকে সমিতির তিন প্রভাবশালী সদস্য সাবেক সভাপতি কাজী আযম, ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. হানিফ ও ট্রাস্টি বোর্ডের সাবেক সদস্য শাহজাহান সিরাজীর মতভেদের কারণে নির্বাচন কমিশন গঠন করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তারা তাদের পছন্দের লোক নির্বাচন কমিশনে বসাতে সব সময় তৎপর থাকেন। তাই কমিশন গঠন দুরূহ হয়ে পড়েছে।

ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. হানিফ অভিযোগ করেন, আবদুল হাই একজন দুর্নীতিবাজ। আমরা তার দ্রুত অপসারণ চাই। সাবেক সভাপতি কাজী আযম বলেন, যথা সময়ে নির্বাচন হলে আজকের এই অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের সৃষ্টি হতো না। শাহজাহান সিরাজীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।

চট্টগ্রাম সমিতির সভাপতি আবদুল হাই বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে স্বীকার করে বলেন, ‘আমরা চাই, দ্রুত নির্বাচন দিতে। কিন্তু কোভিড–১৯–এর কারণে নির্বাচন দিতে পারছি না।’ কোভিডের মধ্যে স্টেটের অনেক নির্বাচন হচ্ছে, এখানে করতে সমস্যা কী—এমন প্রশ্নে তাঁর দাবি, এটি আঞ্চলিক সংগঠন। মানুষ ঘর থেকে বের হতে চায় না।

সমিতির এসব অনিয়ম–দুর্নীতি প্রসঙ্গে সাবেক নির্বাচন কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, বিগত কয়েক বছর ধরে চট্টগ্রাম সমিতিতে দলাদলি, মারামারি ও মামলা–মোকদ্দমার জন্য চট্টগ্রাম সমিতির আগের সুনাম মুখ থুবড়ে পড়েছে। সমিতির অনেক সদস্য অনুষ্ঠানে যাওয়া বাদ দিয়েছেন। এ ছাড়া অযোগ্য নেতৃত্বের কারণে সমিতির সামাজিক কার্যক্রমও আগের মতো হচ্ছে না।

নিউইয়র্ক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন