default-image

যুক্তরাষ্ট্রে আগামী নির্বাচন ঘিরে বড় ধরনের গোলযোগের আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। পরাজিত হলে কোনো পক্ষই সে ফলাফল মানতে রাজি হবে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অনেক আগে থেকেই কারচুপির আশঙ্কার কথা বলে আসছেন। এমনকি নির্বাচনের ফলাফল মেনে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরেও তিনি আগাম কোনো অঙ্গীকার করতে রাজি হননি। তিনি নিজ সমর্থকদের নিবৃত্ত থাকার পাশাপাশি ‘প্রস্তুত থাকা’র পরামর্শও দিয়েছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে বলা হয়েছে, সব রকম আইনি লড়াইয়ের জন্য তাঁরা প্রস্তুত। দলের প্রার্থী জো বাইডেনের সমর্থক কিন্তু তাঁর দলের সঙ্গে যুক্ত নয়, এমন কোনো কোনো গ্রুপ থেকে অস্ত্র প্রস্তুত রাখার কথাও বলা হয়েছে।

এত দিন এই সশস্ত্র হানাহানির কথা শুধু সাংবাদিক-বিশ্লেষক মহলে সীমিত ছিল। এখন পুলিশ প্রশাসন থেকেও এ ব্যাপারে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। নিউইয়র্কের পুলিশপ্রধান জানিয়েছেন, সম্ভাব্য সহিংসতা মোকাবিলার জন্য অধিকাংশ পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়োজিত করার কথা তাঁরা ভাবছেন। একই কথা বলা হয়েছে ওয়াশিংটন ও লস অ্যাঞ্জেলেসের পুলিশ দপ্তর থেকে। ন্যাশনাল পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের এক কর্মকর্তা বলেছেন, দেশের ৮০ শতাংশ এলাকায় ছোট-বড় সংঘর্ষ ঘটতে পারে, সে জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

এ বছরের নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির কারণে সঠিক ফলাফল মিলবে না, এই আশঙ্কা দুই প্রধান দলের সমর্থকেরা ব্যক্ত করেছেন, তবে নির্বাচনের আগেই সে ফলাফল প্রত্যাখ্যানের প্রবণতা ট্রাম্প-সমর্থকদের মধ্যে বেশি। বার্কলি বিশ্ববিদ্যালয়ের গৃহীত এক জরিপ অনুসারে ৫৬ শতাংশ ট্রাম্প-সমর্থক ও ৩৩ শতাংশ বাইডেন-সমর্থক এই আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন।

নির্বাচনের আগে ফলাফল মানা না মানা নিয়ে উত্তেজনার পারদ অতিরিক্ত চড়িয়ে দেওয়ার জন্য পর্যবেক্ষকেরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক বলেছেন, ট্রাম্পের কথাবার্তার সঙ্গে অগণতান্ত্রিক তৃতীয় বিশ্বের নেতাদের কথার মিল রয়েছে। নির্বাচনের আগেই তিনি দাবি করেছেন, তিনি হারতে পারেন না। হারলে বুঝতে হবে বড় রকমের ভোট কারচুপি হয়েছে। ট্রাম্প-সমর্থক হিসেবে পরিচিত কোনো কোনো শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদী গ্রুপ ট্রাম্পের এই কথাকে যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ বলে গ্রহণ করেছে। ট্রাম্প-সমর্থকেরা ভোটের দিন সশস্ত্র পাহারার কথা বলেছে, তাতেও বিভিন্ন মহল থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

সহিংসতার আশঙ্কা থেকে সারা দেশে আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রয় ভীষণ রকম বেড়ে গেছে। এফবিআইয়ের সূত্রে বলা হয়েছে, গত বছরের তুলনায় আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রির পরিমাণ ৪১ শতাংশ বেশি। বার্তা সংস্থা রয়টার্স একটি প্রধান বন্দুক নির্মাতার উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, এখন যাঁরা তড়িঘড়ি করে আগ্নেয়াস্ত্র কিনে রাখছেন, তাঁদের অধিকাংশ নতুন ক্রেতা, অর্থাৎ এর আগে তাঁরা কখনো অস্ত্র হাতে নেননি। নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনার আশঙ্কায় অস্ত্র কেনার এই প্রতিযোগিতা বলে জানিয়েছে রয়টার্স। যুক্তরাষ্ট্রে এমনিতে অস্ত্রের অভাব নেই। এখন এই অতিরিক্ত আগ্নেয়াস্ত্র ক্রয়ের ফলে সারা দেশে এক দুর্যোগময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক বলেছেন, মানুষের হাতে বেশি বন্দুক মানে বেশি মানুষের মৃত্যু।

শুধু ট্রাম্প-সমর্থক অথবা শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদীরাই যে অস্ত্র মজুত করছে, তা নয়। সম্প্রতি এক দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে পলিটিকো জানিয়েছে, রাজনৈতিকভাবে বামপন্থী এমন ব্যক্তি ও গ্রুপগুলোও অস্ত্র সংগ্রহে আগ্রহ দেখাচ্ছে। টেক্সাসের একটি আগ্নেয়াস্ত্র প্রশিক্ষণ ক্লাসে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে কথোপকথনের ভিত্তিতে পত্রিকাটি জানিয়েছে, সাধারণ নাগরিকদের অনেকেই মনে করেন, নাগরিক অসন্তোষ থেকে গৃহযুদ্ধ বেধে যেতে পারে। একজন উদারনৈতিক অস্ত্র ক্রেতা বলেছেন, ‘বিপদ ঘাড়ে এসে পড়লে আমি কি পুলিশকে ফোন করব? না, তার চেয়ে অনেক নিরাপদ নিজের হাতের কাছে পর্যাপ্ত অস্ত্র ও বারুদ মজুত রাখা।’

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি মিশিগানের ডেমোক্রেটিক গভর্নরকে অপহরণ ও সেখানকার আইন পরিষদে হামলা করে ক্ষমতা দখলের এক গোপন পরিকল্পনা ফাঁস করেছে এফবিআই, তাতে বোঝা যায় বিপদ ঘরের কত কাছে এসে পড়েছে। অপহরণ ও গৃহযুদ্ধ শুরুর অভিযোগে পুলিশ সেখানে ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে, যাঁদের সবাই শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদী আদর্শে বিশ্বাসী। গভর্নর গ্রেচেন হুইটমোর অতিদক্ষিণপন্থী এই সব গ্রুপকে সহিংসতায় উসকে দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অভিযুক্ত করেছেন। তিনি মনে করেন, প্রেসিডেন্ট নিজে যখন এই সব মিলিশিয়াকে ‘প্রস্তুত থাকা’র পরামর্শ দেন, সে কথা এদের কাছে যুদ্ধের প্রস্তুতির আহ্বান বলে মনে হওয়া অসম্ভব নয়।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য দোষ ডেমোক্র্যাট ও বামপন্থীদের ঘাড়ে চাপাতে আগ্রহী। তিনি অভিযোগ করেছেন, বর্তমানে পুলিশের ক্ষমতা প্রয়োগের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী যে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলন গড়ে উঠেছে, তা ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত শহরগুলোতে অরাজকতার সৃষ্টি করেছে। কোনো প্রমাণ ছাড়াই তিনি বলেছেন, বিভিন্ন শহরে লুটপাটের যেসব ঘটনা ঘটেছে, তার পেছনে চরমপন্থী হিসেবে বিবেচিত অ্যান্টিফা বা অ্যান্টিফ্যাসিস্ট গ্রুপগুলো দায়ী। তিনি জো বাইডেনকে অ্যান্টিফাকে নিন্দা করার দাবি জানিয়েছেন।

এফবিআই প্রধান ক্রিস্টোফার রে অবশ্য অধিকাংশ সহিংসতার জন্য শ্বেত শ্রেষ্ঠত্ববাদী গ্রুপগুলোকেই দায়ী করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে কংগ্রেসের সামনে এক শুনানিতে তিনি জানান, এই সব গ্রুপের হাতে বর্ণভিত্তিক সহিংসতা কার্যত অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদে পরিণত হয়েছে। তাঁর এই কথা যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে খুশি করেনি, তা বলাই বাহুল্য।

এসবই যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। কার্নেগি এন্ডাউমেন্টের সিনিয়র ফেলো রেইচেল ক্লাইনফেল্ট নিউইয়র্ক টাইমস-এ এক দীর্ঘ নিবন্ধে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, আশু রাজনৈতিক সহিংসতার সব উপাদানই এখানে মজুত রয়েছে। এ দেশ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, এমনকি ভৌগোলিক বিভক্তির কারণে এখন সংঘর্ষের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। মাত্র ১৭ শতাংশ মানুষ সরকারের প্রতি আস্থাবান। সরকারি প্রতিষ্ঠান, যেমন আইন পরিষদ ও বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নেই। রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ পোষণ করে।

ক্লাইনফেল্ট মনে করেন, এই মেরুকরণে বিশেষ মদদ দিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। রাশ টেনে ধরার বদলে রিপাবলিকান পার্টি বিনা প্রতিবাদে তাঁর ছাতার নিচে জড়ো হয়েছে। এসবের অনিবার্য পরিণতি সামাজিক অসন্তোষ ও সহিংসতা।

মন্তব্য পড়ুন 0