বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মুক্ত আলোচনায় বাংলাদেশ কমিউনিটির নেতা, রাজনীতিক, লেখক, সাংবাদিক, পুলিশ কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই সভার অন্যতম উদ্যোক্তা নাসির আলী খান বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে অন্তত ১২ জন প্রবাসী বাংলাদেশি তরুণ অতিরিক্ত মাদক সেবনের কারণে মৃত্যুবরণ করার কথা জানা গেছে। তবে এই সংখ্যাটা আরও বেশি ২০ জনের মতো। সামাজিক ভীতির কারণে বাবা-মায়েরা সন্তানদের এসব মৃত্যুর ঘটনাকে হৃদ্‌রোগ বা অন্য কারণ হিসেবে তুলে ধরছেন। এ কারণে সংকটের সঠিক চিত্র সামনে আসছে না।’

নাসির আলী খানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তারা মাদক সমস্যার ভয়াবহতার চিত্র তুলে ধরেন। সেই সঙ্গে সংকট মোকাবিলায় কী করণীয় রয়েছে, তা নিয়ে বিস্তারিত পরামর্শমূলক আলোচনা করেন।

স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের প্রতিনিধিরাও মাদকের ভয়াবহতার কথা স্বীকার করে বলেছেন, মাদকের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েই কাজ করছেন তাঁরা। এ সময় বক্তব্য রাখেন ১০৭ প্রিসিঙ্কটের পুলিশ কর্মকর্তা সাওয়াল আহমেদ ও ১০৩ নম্বর প্রিসিঙ্কটের পুলিশ কর্মকর্তা নিলাদ্রী দাস।

পুরো অনুষ্ঠানে সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশি আমেরিকান পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন (বাপা)। সংগঠনটির সভাপতি ক্যাপ্টেন কারাম চৌধুরী মাদক সমস্যা সমাধানে তাঁদের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘এই সংকটে কারও সহায়তা প্রয়োজন হলে, আমরা পাশে আছি’।

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ জুন্নুন চৌধুরী নিউইয়র্কে মাদক সমস্যা বাড়ার পেছনে নানা কারণ তুলে ধরেন। এর মধ্যে পরিবারের ভেতরে সম্পৃক্ততার অভাব, বাবা-মায়ের অতি প্রত্যাশা, সন্তানদের সঙ্গে দূরত্ব, হতাশা এবং বন্ধুদের চাপ উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, এটিকে কেবল একটি সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখলেই চলবে না। মানসিক বিষয় হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। সংকটে পড়লে কীভাবে সহায়তা পাওয়া যাবে তার বিস্তারিত তুলে ধরে তিনি বলেন, ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাওয়া কিংবা লুকিয়ে রাখলে হবে না। সমস্যায় পড়লে সমাধান করার চেষ্টা করতে হবে। নিউইয়র্ক সিটিতে এ নিয়ে নানা সহায়তা দেওয়া হয়।

সাংবাদিক ও লেখক হাসান ফেরদৌস মাদক সংকট সমাধানে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। তরুণদের কথা বেশি করে শুনতে হবে। বিশেষ করে তাঁদের সাফল্যের কথাও প্রচার পেতে হবে। সেই সঙ্গে গণমাধ্যমকেও মাদকের ভয়াবহতা নিয়ে প্রচার প্রচারণা চালাতে হবে।’

জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারের সাধারণ সম্পাদক মনজুর চৌধুরী বলেন, ‘করোনা মহামারিতে তরুণদের মধ্যে হতাশা বেড়েছে। সেই কারণেও মাদক সমস্যা বেড়েছে। এ নিয়ে ধর্মীয় নেতাদেরও কাজ করতে হবে। জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারে জুমার নামাজের খুতবায় বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে যেন ইমাম কথা বলেন, সেই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সাংবাদিক রওশন হক বলেন, বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানদের সম্পর্ক হওয়া উচিত বন্ধুত্বপূর্ণ। তাদের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছাতে হবে। কালচারাল গ্যাপ বা সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কারণে এ দেশে বেড়ে ওঠা সন্তানের মনোভাব বুঝতে বাবা-মায়েদের অনেক সময় বেগ পেতে হয়। সেই সঙ্গে ব্যস্ত এই নগরে টিকে থাকার জন্য কাজে ব্যস্ত থাকার কারণেও সন্তানদের ঠিকভাবে সময় দিতে পারেন না অনেকে। এসব কারণেও সন্তানের পথ হয় আলাদা। শত কষ্টেও বিষয়টি নজরে নেওয়ার কথা বলেন তিনি।

নিউইয়র্কে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তাদের আগামী প্রজন্মের সাফল্যের গল্প কম নয়। তবে আছে ভীত হওয়ার মতো অনেক কারণও। তারই একটি ভয়াবহ মাদক সমস্যা। আসক্তদের মধ্যে বেশির ভাগই তরুণ; তাই সংকট সমাধানের যেকোনো উদ্যোগে তরুণদের বেশি করে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানানো হয় অনুষ্ঠানে।

তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি অনুভা শাহীন বলেন, মাদক সমস্যার কথা এলে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে দুই ধরনের মানুষ দেখা যায়। এক ধরনের মানুষ হলো যারা পিছু হটে যায়, বিব্রত বোধ করে। আরেক ধরনের মানুষ কেবল সমালোচনাই করে। সংকট যেহেতু চিহ্নিত করা গেছে, আশা করছি সমাধানের উদ্যোগও হবে জোরালো।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, কেবল তরুণদের সচেতন করলেও চলবে না। মাদকের উৎস বন্ধ করতে হবে। তার জন্য প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপও চেয়েছেন তাঁরা। সেই সঙ্গে অতি প্রত্যাশার চাপে সন্তানদের ভারাক্রান্ত না করে উৎসাহ জোগানো এবং সৃজনশীল কাজে সম্পৃক্ত করারও পরামর্শ দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন—স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায়, শহীদ হাসান, সাপ্তাহিক ঠিকানা পত্রিকার সিইও এম এম শাহীন, কমিউনিটি নেতা মোরশেদ আলম, কমিউনিটির নেত্রী মাজেদা উদ্দিন, লেখক ও সাংবাদিক ফাহিম রেজা নূর, জ্যাকসন হাইটস বিজনেস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহ নেওয়াজ, সাপ্তাহিক পরিচয় সম্পাদক নাজমুল আহসান, উত্তর আমেরিকা প্রথম আলোর আবাসিক সম্পাদক ইব্রাহীম চৌধুরী, সাপ্তাহিক নবযুগের সম্পাদক শাহাবউদ্দিন, সংগীত শিল্পী রানো নেওয়াজ প্রমুখ। সার্বিক সহায়তা দিয়েছেন কমিউনিটি বোর্ড মেম্বার আহনাফ আলম ও রিয়েলটর আনোয়ার হোসেন।

এদিকে অনুষ্ঠানে টুইন টাওয়ার হামলার ২০ বছর পূর্তিতে নিহতদের স্মরণ করা হয়। ঘৃণ্য সেই সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় যারা ফার্স্ট রেসপন্ডার ছিলেন—পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার কাজ করেছেন। অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন। তাঁদের প্রতিও গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়।

নিউইয়র্ক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন