default-image

উন্নত ও সুন্দর ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় অনেক বাংলাদেশি অভিবাসী আসছেন যুক্তরাষ্ট্রে। এঁদের অধিকাংশই বসবাস করেন নিউইয়র্ক শহরে। জীবন–জীবিকার তাগিদে এই নগরে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসীদের বড় একটি অংশ বিভিন্ন রেস্তোরাঁ, কফির দোকানে কাজ করেন। অনেকে রাইড শেয়ারিং অ্যাপ উবার ও লিফটের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন।

অভিবাসী সহায়ক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবার কাছেই বেশ সমাদৃত। যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানো সব অভিবাসীরই ইচ্ছা থাকে ভালো শিক্ষা-দীক্ষা অর্জন, তারপর ভালো চাকরি করে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল জীবনযাপন করা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি অভিবাসী আসার সংখ্যা বাড়তে থাকে। এদের বেশির ভাগই ওপি-ওয়ান, ডাইভার্সিটি ভিসা (ডিভি) ও পারিবারিক ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন বা আসছেন। আবার আগে অনেকে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে অবৈধভাবে জাহাজে করে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছে, যাদের বেশির ভাগই থিতু হয়েছিল নিউইয়র্ক নগরে। কারণ, তৎকালীন সময়ে অভিবাসী হিসেবে সবচেয়ে সহজে পা রাখা যেত নিউইয়র্ক নগরে।

বিজ্ঞাপন

এশিয়ান আমেরিকান ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, নিউইয়র্ক শহরে আগত অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা দ্রুতগতিতে বাড়ছে। ২০১০ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত নিউইয়র্ক নগরে বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় ৮৮ শতাংশ বেড়েছে।

তবে অন্যান্য এশীয় দেশের সঙ্গে তুলনা করলে নিউইয়র্ক নগরে বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা বাড়লেও প্রাতিষ্ঠানিক চাকিরর ক্ষেত্রে বাংলাদেশি অভিবাসীরা এখনো পিছিয়ে আছে। নিউইয়র্ক শহরের উচ্চ জীবনব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার জন্য অনেক বাংলাদেশি ডানকিন ডোনাটস নামক কফির দোকান, অ্যাপভিত্তিক ক্যাব উবার ও লিফটে দৈনিক প্রায় ১৪-১৬ ঘণ্টাও কাজ করে থাকে।

বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর পর ডানকিন ডোনাটস ও বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় কাজ পাওয়া সহজ বলে অনেকেই এসব জায়গায় কাজ শুরু করেন। পরে কাজ ও পারিবারিক চাপে অন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির চেষ্টা না করে এভাবেই চালিয়ে যান।

এশিয়ান আমেরিকান ফাউন্ডেশনের ২০১৫ সালে প্রকাশিত এক জরিপের তথ্য বলছে, নিউইয়র্ক নগরে বসবাসরত অন্যান্য দেশের অভিবাসীর তুলনায় বাংলাদেশি অভিবাসীরা ইংরেজি দক্ষতায় পিছিয়ে আছে। ইংরেজিতে ভালোভাবে যোগাযোগ করতে না পারায় অনেকেই এমন সব জায়গায় কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, যেখানে বাংলাদেশির সংখ্যা বেশি।

নিউইয়র্ক নগরে ডানকিন ডোনাটসের আউটলেটগুলোতে বাংলাদেশি কর্মীর আধিক্যের কারণে অনেক নারী এসব জায়গায় কাজ করতে নিরাপদবোধ করেন। তা ছাড়া এসব দোকানে ভোর থেকে কাজ শুরু করার সুযোগ থাকায় অনেকেই কাজ শেষ করে ঘরে গিয়ে সংসারের কাজ করতে পারেন। ফলে তারা এসব জায়গায় কাজ করাকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। স্কুল, কলেজ পড়ুয়া অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি এসব দোকানে কাজ করার ফলে নিজেদের ইচ্ছেমতো কাজের সময়সূচি নির্ধারণ করতে পারে।

একটি অগ্রসর অভিবাসী গোষ্ঠী হিসেবে বাংলাদেশিরা নিজেদের এগিয়ে নিলেও নিজেদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কোনো চাকরির চেষ্টা না করে কফি দোকান ও রেস্তোরাঁর মতো জায়গায় ন্যূনতম মজুরিতে কাজ করছে তারা। ফলে অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছে। অথচ একটু চেষ্টা করে কমিউনিটি কলেজ বা কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ডিগ্রি, কম্পিউটার প্রশিক্ষণসহ অন্য যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক সার্টিফিকেট কোর্স করতে পারলে ভালো মজুরিতে কাজ পাওয়া সহজ হয়।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষা-দীক্ষা, কর্মক্ষেত্রে পরিশ্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশিরা নিজেদের এগিয়ে নিলেও ২০১৮ সালে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারি দপ্তরের জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ২৪ দশমিক ২ শতাংশ বাংলাদেশি এ দেশে দারিদ্র্যসীমায় বসবাস করছে। অথচ এশিয়ার অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে দারিদ্র্যের হার প্রায় ১২ দশমিক ১ শতাংশ। এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশিদের দারিদ্র্যের এই হার মোটেই আশাব্যাঞ্জক নয়।

বাইরে থেকে চাকচিক্য করলেই যেমন সোনা হয় না, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রে আসলেই যে ভাগ্যের চাকা সুপ্রসন্ন হয়ে যায় না, তা এখানে আসার পর নিউইয়র্কের আলো–বাতাসহীন বেসমেন্টে ও অমানুষিক পরিশ্রম করার পর অনেকেই বুঝতে পারেন। অর্থনৈতিক সচ্ছলতা অর্জনের জন্য অনেকেই অতিরিক্ত কাজ করার ফলে পরিবারের সদস্যদের পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। এতে করে পারিবারিক বন্ধন শিথিল হওয়ার পাশাপাশি সন্তানদের নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়।

নিউইয়র্ক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন