default-image

বয়স মাত্র ২২। জন্ম ঢাকায় ১৯৯৯ সালের ২ আগস্ট। এই বয়সেই প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। এগিয়ে যাচ্ছেন সামনের দিকে। কবিতা, গান, সিনেমাটোগ্রাফি ও পরিচালনা—সব জায়গায় মেধার স্বাক্ষর রাখছেন। তাঁর নাম আলী আফরোজ (অর্ণব)।

পারিবারিক সূত্রেই ছোটবেলা থেকে সাংস্কৃতিক চর্চার সঙ্গে জড়িত। দাদা মৌলভি মোহাম্মদ খিরাজ আলী ছিলেন রংপুর বিভাগের স্বনামধন্য সাহিত্যিক। নোবেলজয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর লেখা দুইটি বই সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীতে তা শান্তিনিকেতনে সংরক্ষণ করা হয়। দাদা ছিলেন মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়ার আদর্শে উজ্জীবিত। তৎকালীন সময়ে নারী জাগরণে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। যে সময়ে নারীরা পড়াশোনা করার চিন্তাও করতে পারত না, তখন তিনি ১৯৩৩ সালে রংপুরে নারীদের জন্য খাতুনিয়া সারকুলেটিং পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর পাঠাগারের জন্য সাতটি বই পাঠিয়েছিলেন। আলীর বাবাও এক সময় সংগীত চর্চার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, ছাত্রদের গান শেখাতেন।

কথায় আছে, ‘সকালের সূর্য দেখেই বলা যায়, দিন কেমন যাবে’। সংস্কৃতিমনা পরিবারে বেড়ে উঠে আলীও যে পরিবারের আদি ইতিহাস এবং গৌরব বয়ে চলেছেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শৈশব থেকেই কবিতা লেখা, অভিনয়ের মাধ্যমে বেশ নাম কুড়িয়েছেন। শুধু স্বপ্ন দেখলেই হয় না, সে স্বপ্ন বাস্তবায়নে পরিশ্রম ও চর্চা করতে হয়, লেগে থাকতে হয়। তবেই না একদিন সোনার হরিণের মতো সাফল্য ধরা দেয়। সাফল্যের চূড়ায় এখনো পৌঁছাতে না পারলেও সে লক্ষ্যেই অবিরাম কাজ করে চলেছেন তিনি। কোনো ধারালো অস্ত্র বেশ কিছুদিন ব্যবহার না করলে একসময় যেমন তাতে জং ধরে যায়, তেমনি কোনো প্রতিভার চর্চা না করলে একসময়ে তা অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়। তাই, ছোটবেলা থেকে লালিত স্বপ্নের পেছনে প্রতিনিয়ত ছুটে চলছেন।

বিজ্ঞাপন

শুরুটা হয়েছিল ২০০৭ সালে শিশু একাডেমি থেকে পুরস্কার পাওয়ার মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে নিজের লেখা কবিতার মাধ্যমে এই স্বীকৃতি মেলে। তারপর নিয়মিত শিশু একাডেমি মাসিক ম্যাগাজিনে নিজের লেখা কবিতা ছাপা হতো তাঁর। সাফল্য হলো নেশার মতো, একবার পেয়ে গেলে তা সহজেই মানুষকে বুঁদ করে ফেলে। অল্প বয়সে এই স্বীকৃতি তাকে অনেক আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। ২০০৮ সালে শিল্পকলা একাডেমিতে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘খুকি ও কাঠবিড়ালি’ গল্পে রাঙা দা চরিত্রে শিশু অভিনেতা হিসেবে অভিনয় করেন। তারপর বিভিন্ন নাট্যমঞ্চে একই চরিত্রে একাধিকবার অভিনয়ের সুযোগ হয়। ছোট পর্দায় অভিনয় করতে করতে একদিন টিভিতে অভিনয় করারও সুযোগ চলে আসে। ২০০৯ সালে চ্যানেল ওয়ানে ঈদের জন্য নির্মিত বিশেষ নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে ছোট পর্দায়ও নিজের জানান দেন আলী। নিজের প্রতিভার জানান দিয়ে সহজেই পরিচালকদের সুনজরে আসেন। ২০১০ সালে বিটিভিতে নজরুল ইসলামের লেখা ‘দামাল ছেলে’ নাটকে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ হয়।

কবিতা, অভিনয় করার পাশাপাশি গান ও ইসলামি সংগীত পরিবেশনায়ও সমান পারদর্শী আলী। ২০০৯ সালে মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের বার্ষিক প্রতিযোগিতায় দেশাত্মবোধক ও ইসলামি সংগীত পরিবেশন করে জনপ্রিয় লেখক জাফর ইকবালের হাত থেকে প্রথম পুরস্কার গ্রহণ করেন।

বাংলাদেশে যখন আলীর প্রতিভা ডালপালা মেলতে শুরু করে, ধীরে ধীরে সবার সুনজরে আসতে থাকেন, তখনই ২০১১ সালে সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান তিনি। নতুন দেশে, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার নতুন এক সংগ্রাম শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রে আসা অন্য আট/দশজন অভিবাসীর মতোই তার গল্পটাও সংগ্রামের, টিকে থাকার। কিন্তু দুঃসাহসী অভিযাত্রীরা দুর্গম পথেও ঠিকই পথের সন্ধান করে নেয়।

নিউইয়র্কে কোনো টিভি চ্যানেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে একটু কথা বলার জন্য কখনো ৩ ঘণ্টা বসে থাকতে হয়েছে, আবার কখনো কাজ শেখার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু বসে থেকে কাজ শেখার চেষ্টা করে যেতে হয়েছে। বন্ধুরা যখন ঘোরাঘুরি কিংবা আড্ডায় ব্যস্ত, তখন হয়তো নির্বিঘ্নে ঘরে বসে ভিডিও এডিটিংয়ের কাজ শিখেছেন। শৈশব থেকে এই সাফল্যের পেছনে পরিবার ও মা–বাবার অবদানের কথা জানাতে মোটেই ভোলেননি আলী। অনেক প্রতিভাবান শিশু পরিবার থেকে সমর্থন না পেয়ে নিজের প্রতিভা মেলে ধরতে পারে না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তাঁর পরিবার পুরোই ব্যতিক্রম। সেই ছোটবেলা থেকে তার মা দিন–রাত যখন–যেখানে প্রয়োজন, সেখানে নিয়ে গেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে আসার পরও বাবা–মা প্রতিনিয়ত তার স্বপ্নের পেছনে কাজ করে যেতে অনুপ্রেরণা ও সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন।

নিউইয়র্কে এনটিভিতে এক বছর ইন্টার্নশিপ করার সুযোগ হয় আলীর। ধীরে ধীরে ফটোগ্রাফি, সিনেমাটোগ্রাফির প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে তাঁর। ২০১৪ সালে প্রথম ডিএসএলআর কেনার পর ২০১৫ সালের শুরুতে কলকাতার ম্যাগাজিন ‘দুকূল’–এ তাঁর তোলা ছবি ছাপা হয়। তারপর ২০১৬ সাল থেকে শর্ট ফিল্মের কাজ শুরু করেন তিনি।

কথায় আছে, ‘শিকারি বাঘ গোঁফে চেনা যায়’। যুক্তরাষ্ট্রে এসে এত সংগ্রামের পরও তিনি তার প্রতিভাকে হারিয়ে যেতে দেননি। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে ফরেস্ট হিল হাই স্কুলে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে বেস্ট ডকুমেন্টারি, বেস্ট শর্ট ফিল্ম, বেস্ট এডিটিং এবং বেস্ট সিনেমাটোগ্রাফি ক্যাটাগরিতে প্রথম স্থান অধিকারের মাধ্যমে যার স্বীকৃতি মিলেছে।

বিজ্ঞাপন
নিউইয়র্ক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন