default-image

২০২০ সালের গোড়ার দিকে নিউইয়র্ক নগরে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর থেকে এই নগরের অনেক কিছু দ্রুত পাল্টাতে শুরু করে। গণপরিবহন বিশেষ করে সাবওয়েতে যাত্রী সংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে। নগরের রাজপথ ফাঁকা হতে থাকে। নিউইয়র্ক যেন হয়ে উঠে এক ভুতুড়ে নগর।

সাবওয়ে কন্ডাক্টর অ্যাড্রিয়ান ক্রেস্পো দেখতে পেলেন, করোনার প্রাদুর্ভাব শুরুর পর নগরের প্ল্যাটফর্মগুলোতে যাত্রীর ভিড় ক্রমাগতভাবে কমছে। এক বিকেলে ‘এ’ ট্রেন যখন নগরের অন্যতম ব্যস্ততম ‘ওয়েস্ট ফোর-ওয়াশিংটন স্কয়ার পার্ক’ স্টেশনে পৌঁছায়, ট্রেনে তখন মাত্র দুজন যাত্রী। ৫৯ বছর বয়সী ট্রেনচালক মিস ক্রেসপো বলেন, ‘নগরের ব্যস্ত অপরাহ্ণে যখন যাত্রীর ভিড় থাকার কথা, সে সময়ে সাবওয়ে ট্রেন খালি দেখে বড় কষ্ট হয়।’ তিনি বলেন, তাঁর কেমন যেন ভয় হয়, এটা খুবই ভয়াবহ এক পরিস্থিতি।

বছর খানিক আগেই মহামারির কারণে আক্ষরিক অর্থেই নিউইয়র্ক নগরের সাবওয়ে ব্যবস্থা যাত্রীশূন্য হয়ে পড়ে। করোনায় আক্রান্ত হন এই সংস্থার হাজারো কর্মী, যার ফলে উত্তর আমেরিকার বৃহত্তম এই গণপরিবহন সংস্থাটি অর্থনৈতিকভাবে কার্যত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।

বিজ্ঞাপন

গত বসন্তে নগরের সাবওয়ে যাত্রীদের মাত্র ৭ শতাংশ সাবওয়েতে চড়েছেন। এখন সেই সংখ্যা অল্প বেড়েছে। আর্থিক সহায়তা পেয়ে মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্টেশন অথোরিটির (এমটিএ) স্বাভাবিক মাত্রার এক-তৃতীয়াংশে উন্নীত হয়েছে।

কয়েক শ কোটি ডলারের ফেডারেল সহায়তা পেয়ে এমটিএ এখনো নড়াচড়া করছে। নগরের পুরো সাবওয়ে ও বাস ব্যবস্থাপনাসহ মেট্রো নর্থ, লং আইল্যান্ড রেল রোডের মতো আরও দুটি রেল সিস্টেম পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত এই সংস্থাটি প্রেসিডেন্ট বাইডেনের ‘আমেরিকা উদ্ধার পরিকল্পনায়’ আরও ছয় শ কোটি ডলারের প্রণোদনা পেয়েছে।

তবে সংস্থাটির দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকা অবশ্য নির্ভর করছে যাত্রী সাধারণের ফিরে আসার ওপর। সংস্থাটির রাজস্বের প্রায় ৪০ শতাংশ আসত টিকিট বিক্রি থেকে। এমটিএ এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অন্য সব পরিবহন সংস্থার তুলনায় এগিয়ে রয়েছে।

নিউইয়র্ক নগরের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নাগরিকের টিকাদান সম্পন্ন হয়েছে। নিউইয়র্ক নগর ও শহরতলির জনজীবনে প্রাণের স্পন্দন ফিরে আসছে। এতে সাবওয়ের যাত্রীসংখ্যা বাড়লেও সংগত কারণেই এই আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে, নগরের সাবওয়ে আর কখনোই তার আগের জৌলুশে ফিরে যাবে না। আজ এমনি এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি নিউইয়র্ক নগরের ঐতিহ্যবাহী সাবওয়ে ব্যবস্থা। এমন পরিস্থিতিতে সংস্থাটি অনিবার্যভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ছে। পুরো ব্যবস্থাটির আকার সীমিত করে এটিকে হ্রাসপ্রাপ্ত যাত্রী সংখ্যার ভিত্তিতে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, নতুন স্বাভাবিকতায় সাবওয়ে সিস্টেমকে ঢেলে সাজানোর অর্থ হচ্ছে, নগরজুড়ে ট্রেনের স্বল্পতা। এতে আগের মতো ব্যস্ত সময়ে চাঞ্চল্য থাকেব না। একটি ছেড়ে গেলে পরবর্তী ট্রেনের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হবে। শহরতলি অভিমুখী ট্রেনের সংখ্যা কমে যাবে, সেবার মান হ্রাস পাবে। মহামারির আগে কানেকটিকাট, লং আইল্যান্ড ইত্যাদি এলাকা থেকে আগত কর্মীদের অনেকেই এখনো ঘরে বসে কাজ করছেন। ফলে ইতিমধ্যেই এই প্রবণতা দেখা দিয়েছে। এসব রুটে যাত্রী সংখ্যা মহামারির আগের চেয়ে এক চতুর্থাংশ কমে গেছে।

এবারের শীতের শেষে নিউইয়র্কে মহামারি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তারপরও অনেক কোম্পানিই তাদের কর্মপরিবেশ নির্ধারণের নীতি পরিবর্তন করেছে। কর্মীদের বাসা থেকে কাজ করার ব্যবস্থাকে অনেকে স্থায়ী করার চিন্তাভাবনা করছে।

করোনাভাইরাস বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা অনিশ্চিত। এ অবস্থায় কোনো বিষয়েই ভবিষ্যদ্বাণী করে কিছুই বলা যায় না। তবে এমটিএ অনুমোদিত মিককিনসী অ্যান্ড কোম্পানির পর্যবেক্ষণে আশার আলো দেখানো হচ্ছে। তারা বলছেন, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ নিউইয়র্ক সাবওয়ে সিস্টেম ও মেট্রো রেলের জৌলুশ আবার ফির আসবে। এর যাত্রীসংখ্যা মহামারির আগের অবস্থার ৮০ থেকে ৯২ শতাংশে ফিরে যাবে বলে তারা আশাবাদী।

বিজ্ঞাপন
নিউইয়র্ক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন