default-image

রমজান, ঈদ কিংবা যেকোনো উৎসবে প্রবাসীরা নিজেদের বাজেটের বড় একটি অংশ দেশে স্বজনদের জন্য পাঠিয়ে থাকেন। এবারও ব্যতিক্রম নয়। পবিত্র রমজান ও ঈদ সামনে রেখে তাঁদের কষ্টার্জিত অর্থ দেশে স্বজনদের কাছে পাঠাতে ভিড় করছেন নিউইয়র্ক নগরের মানি এক্সচেঞ্জ বা অর্থ স্থানান্তরের শাখা ও দোকানগুলোতে। রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় পাঠাতে সকাল থেকে রাত অবদি মানি এক্সচেঞ্জে উপচে পড়া ভিড়। কথা বলার সময় নেই এক্সচেঞ্জ কর্মকর্তাদের। এক্সচেঞ্জের ভেতর থেকে রাস্তার ফুটপাত পর্যন্ত দীর্ঘ লাইন। তবে কোনো কোনো মানি এক্সচেঞ্জ সুযোগ বুঝে অর্থ পাঠাতে বাড়তি ফি নিচ্ছে বলে প্রবাসীরা অভিযোগ করছেন।

প্রতি মাসের নিয়মিত ব্যয়ের বাইরে রমজান ও ঈদে দেশে বাড়তি টাকা পাঠাতে হয়। তার ওপর করোনা নিয়ন্ত্রণে দেশে চলছে লকডাউন। ফলে অনেক পরিবারে আয় কমে গেছে। তা ছাড়া ২ শতাংশ নগদ আর্থিক প্রণোদনার কারণে প্রবাসীরা বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠাতে বেশি আগ্রহী। তাই গ্রাহকদের বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে বলে মনে করছেন মানি এক্সচেঞ্জ কর্মকর্তা ও অর্থ স্থানান্তরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এজেন্টরা। দ্রুত স্বজনদের কাছে অর্থ পাঠাতে পেরে প্রবাসীরাও খুশি। তবে, সুযোগ বুঝে কোনো কোনো এজেন্ট রেমিট্যান্স পাঠানোর ফি বাড়িয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ করছেন গ্রাহকেরা।

২০ এপ্রিল বিকেলে কুইন্সের ওজোন পার্কের সোনালি এক্সচেঞ্জে গিয়ে দেখা যায়, ভেতরে গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইন। সেই লাইন এসেছে ফুটপাতেও। সবাই সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। পার্শ্ববর্তী অ্যাংকর ট্রাভেলসের শাখায়ও একই চিত্র। কাছাকাছি আরেকটি অর্থ স্থানান্তরকারী প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড এক্সপ্রেসেও গ্রাহকদের ভিড়। একই অবস্থা স্থানীয় মানি ট্রান্সফার কোম্পানি এজেন্টদের শাখায়ও।

নিউইয়র্কপ্রবাসী নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার মো. তাজুল ইসলাম প্রায় ১১ বছর ধরে ব্রুকলিনের ইস্ট নিউইয়র্কে বসবাস করেন। তিনি বললেন, দেশে স্বজনদের জন্য রমজানের আগেই ইফতারসহ আনুষঙ্গিক খরচ ও ঈদ সামনে রেখে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা পাঠিয়েছেন। স্ত্রী-সন্তান, মাসহ স্বজনেরা রয়েছেন দেশে। ঈদের আগে হয়তো আরও পাঠাতে হতে পারে। দুই দিনের মধ্যে অ্যাকাউন্টে এবং ক্যাশ পিকআপ হলে ২৪ ঘণ্টায় স্বজনেরা টাকা তুলতে পারে।

তাজুল বলেন, সরকার ঘোষিত ২ শতাংশ প্রণোদনা পাওয়ার কারণে দেশে স্বজনেরা কিছুটা হলেও বেশি টাকা তুলতে পারে। কিন্তু, এখানে এজেন্টরা মাঝে মাঝে অতিরিক্ত ফি নেয়। তাঁর মতে, প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখে। তাই, টাকা পাঠানোর ফি না থাকলেই ভালো হতো।

সিলেটের গোলাপগঞ্জের মো. জিয়াউদ্দিন (৫১) ১৩ বছর ধরে পরিবার নিয়ে থাকেন ওজোন পার্ক এলাকায়। দেশে মা-বাবাসহ স্বজনেরা রয়েছেন। রমজানে খরচের জন্য ৩০ হাজার টাকা আর ঈদের খরচের জন্য পাঠালেন ৭০ হাজার টাকা। বাবা-মা ও ভাইবোনসহ ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে এই টাকা পাঠিয়ে যারপরনাই খুশি এই প্রবাসী। নিয়মিতই তিনি বাড়িতে টাকা পাঠান। তবে, রমজান, ঈদ কিংবা যেকোনো উৎসবে বাড়তি টাকা পাঠিয়ে থাকেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

২০ এপ্রিল দুপুরে কথা হয় ব্রুকলিনের চার্চ ম্যাকডোনাল্ডের সোনালি এক্সচেঞ্জের কর্মকর্তা মো. ওয়াহিদের সঙ্গে। দম ফেলার ফুসরত নেই তাঁর। ব্যস্ততার ফাঁকে শুধু বললেন, ২ শতাংশ প্রণোদনা ঘোষণার পর বৈধপথে দেশে টাকা পাঠানো বেড়েছে। তবে, গত দুই সপ্তাহে চাপ বেড়েছে অনেক। প্রতিদিনই গ্রাহকদের ভিড় বাড়ছে, ঈদের আগ পর্যন্ত ভিড় আরও কয়েক গুন বাড়বে। তাঁর সামনে গ্রাহকদের দীর্ঘ ভিড় থাকায় তিনি বাড়তি তথ্য জানতে হলে প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

নিউইয়র্ক নগরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বাঙালি অধ্যুষিত এলাকাগুলোর মধ্যে কুইন্সের জ্যাকসন হাইটস্, জ্যামাইকা হিলসাইড, ওজোন পার্ক, ব্রুকলিনের চার্চ ম্যাকডোনাল্ড, ফুলটন ও ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টার-স্টার্লিংয়ের অর্থ প্রেরণকারী বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোতে গ্রাহকদের বেশ ভিড়। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালি ব্যাংক লিমিটেডের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান সোনালি এক্সচেঞ্জ, বিএ-এক্সচেঞ্জ, স্ট্যান্ডার্ড এক্সপ্রেসসহ দেশীয় মানি এক্সচেঞ্জগুলো ছাড়াও চয়েস, রিয়া, ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নসহ বিভিন্ন অর্থ স্থানান্তর প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট নিয়ে টাকা পাঠানোর কাজে নিয়োজিত বাংলাদেশিদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও গ্রাহকদের ব্যাপক ভিড় দেখা গেছে।

কেবল তাজুল ইসলাম বা জিয়া উদ্দিন নয়, প্রতিদিন মানি এক্সচেঞ্জ বা মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠানের এজেন্টদের অফিসে প্রবাসীদের টাকা পাঠানোর জন্য ভিড় করতে দেখা যায়। একসময় জ্যাকসন হাইট্‌স, চার্চ-ম্যাকডোনাল্ড কিংবা জ্যামাইকার মতো ব্যস্ততম এলাকাগুলোতে এক্সচেঞ্জে যেতে হতো। এখন মানি এক্সচেঞ্জগুলোর শাখা বেড়েছে এবং মানি ট্রান্সফার কোম্পানিগুলোর এজেন্ট রয়েছে ঘরের পাশের এমন বাঙালি গ্রোসারিতেও। নিউইয়র্ক সময় সন্ধ্যায় ক্যাশ-পিকআপের মাধ্যমে টাকা জমা দিলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শুধু পিন নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে বাংলাদেশে সকালে টাকা তোলা যায়।

প্রবাসে কষ্টার্জিত অর্থ স্বজনদের কাছে পাঠানোর ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছেন তরুণেরা, যাদের বেশির ভাগই একা (ব্যাচেলর) থাকেন। ২০ এপ্রিল বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান এক ডলারের বিপরীতে ৮৫ দশমিক ১০ টাকা দাম নির্ধারণ করে। অ্যাকাউন্টে পাঠাতে ব্যাংক ভেদে এই তারতম্য ঘটে। একইভাবে ক্যাশ পিকআপে কিছুটা কম পাওয়া যায়।

স্ট্যান্ডার্ড এক্সপ্রেস-ওজোন পার্কের কর্মকর্তা শাহনেওয়াজ হোসেন বলেন, ১৫ রমজানের পর বাংলাদেশে রেমিট্যান্সের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। নিয়মিত ব্যস্ততার বাইরে দ্বিতীয় রমজান থেকে তাঁদের এখানে গ্রাহকদের চাপ বাড়ছে। বৈধপথে দেশে অর্থ প্রেরণে ২ শতাংশ প্রণোদনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তিনি।

অ্যাংকর ট্রাভেলসের পরিচালক তাছলিমা বেগম বলেন, তাঁদের গ্রাহকদের বেশির ভাগই নোয়াখালী ও সিলেট অঞ্চলের। এর বাইরে ঢাকার ব্যাংক হিসাবে বেশি টাকা পাঠানো হয়। কারণ, ঢাকায় সারা দেশের মানুষ বাস করে থাকেন। মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে তাঁদের প্রতিষ্ঠানে টাকা পাঠানোর চাপ বেড়েছে, প্রতিদিনই গ্রাহকদের ভিড় বাড়ছে।

নিউইয়র্ক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন