চিত্র প্রদর্শনীতে লকডাউনের দুঃসহ স্মৃতি

ঘুরে ঘুরে প্রদর্শনী দেখছেন আগতরা–
ঘুরে ঘুরে প্রদর্শনী দেখছেন আগতরা– ছবি: মাসুদুল কবির
বিজ্ঞাপন

করোনাভাইরাসের থাবায় মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল কোলাহলের নগর নিউইয়র্ক। লকডাউনে জনজীবন স্থবির। ঘরবন্দী মানুষ। যে নগরের রাস্তায় দিনরাত ২৪ ঘণ্টা থাকত জনস্রোত, সেই নগর জনশূন্য। যানবাহন নেই, মানুষ নেই। রাস্তায় কেবলই শোনা যেত অ্যাম্বুলেন্স আর লাশবাহী গাড়ির সাইরেনের শব্দ। কেমন ছিল কোভিড-১৯ মহামারি ও লকডাউনকালের নগর? ঘরবন্দী দিনগুলোতে অনেকেই সময় কাটিয়েছেন ছবি এঁকে, ছবি তুলে, গল্প, কবিতা বা মহামারির স্মৃতি লিপিবদ্ধ করে। বিশেষ করে শিশু, কিশোরদের একটি বড় অংশের সময় কেটেছে রং, তুলি হাতে। যার পেছনে অনুপ্রেরণায় ছিলেন তাদের বাবা-মা ও শিক্ষকেরা। দীর্ঘদিনের লকডাউনের ধাপে ধাপে তুলে নেওয়ার সুযোগে সেই দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে আয়োজন করা হয়েছিল ‘লকডাউন’ শীর্ষক চিত্র প্রদর্শনীর। প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার এই অনবদ্য আয়োজন ছিল রৌদ্রোজ্জ্বল শরতের দিনে পুরোপুরি আউটডোরে।

প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া করোনাকালে তোলা ছবি, চিত্রকর্ম উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে আবেগ ও নস্টালজিয়া তৈরি করেছিল। অনুষ্ঠানে আগত দর্শনার্থীরা ঘুরে ঘরে ছবি ও চিত্রকর্ম দেখেন। অনেকে এসব দেখে স্মৃতিচারণ করেন। হারিয়ে যাওয়া স্বজন, বন্ধু ও সন্তানের কথা বলতে গিয়ে, স্মরণ করতে গিয়ে চোখ সজল হয়ে ওঠে অনেকের।

৬ সেপ্টেম্বর প্রদর্শনী উপলক্ষে আয়োজন করা হয় অনুষ্ঠানের। এতে বক্তারা বলেন, ‘জীবন থেমে থাকার নয়। ধ্বংসের পাহাড় ডিঙিয়ে মানুষ উঠে দাঁড়ায়, আমরাও দাঁড়াচ্ছি। কোলাহলের নগর আবার প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। তবে করোনাভাইরাসের সঙ্গে এখনো আমাদের লড়াই চলছে। আমাদের সামনে এখন ‘নতুন স্বাভাবিকতায়’। এ চলায় আমরা আরও সহমর্মী হব। জীবনের জয়গান গেয়ে সমাজ, সভ্যতাকে এগিয়ে নেব।’

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image
দীর্ঘদিনের লকডাউনের ধাপে ধাপে তুলে নেওয়ার সুযোগে সেই দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে আয়োজন করা হয়েছিল ‘লকডাউন’ শীর্ষক চিত্র প্রদর্শনীর। প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার এই অনবদ্য আয়োজন ছিল রৌদ্রোজ্জ্বল শরতের দিনে পুরোপুরি আউটডোরে

বক্তারা বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণরোধে মার্চ থেকে নিউইয়র্ক লকডাউন শুরু হয়। মহামারি আর আইসোলেশনের দুঃসহ স্মৃতি এখনো মলিন হয়নি। এখনো কোভিড-১৯ পরাস্ত হয়নি বিজ্ঞানের কাছে। এই ভয়ানক ভাইরাসের বিরুদ্ধে বর্ম তৈরি করতে পারে, এমন একটি কার্যকর প্রতিষেধক ভ্যাকসিনের আশায় বিশেষজ্ঞদের দিকে চেয়ে আছে মানুষ।

অনুষ্ঠানে সেসব নিরলস মানুষের কাজের প্রতি সম্মান জানানো হয়, যারা এই মহাদুর্যোগে নিজের জীবন বিপন্ন করে মানুষকে সেবা দিয়ে গেছেন। অকুতোভয় ডাক্তার, নার্স, প্যারামেডিক, ফিউনারেল হোমকর্মী—এদের ঋণ বিপদগ্রস্ত মানুষ কখনো শোধ করতে পারবে না। পুলিশ প্রশাসন, ব্যাংক, ফার্মেসি, ডাকবিভাগ ও পাবলিক ট্রান্সপোর্ট কর্মীদের নিঃস্বার্থ কাজকে স্মরণ করা হয়।

অনুষ্ঠানের শুরুতে সাংবাদিক স্বপন হাই, বাংলাদেশ সোসাইটির নেতা কামাল আহমেদ, আজাদ বাকের, কবি আলেয়া চৌধুরী, সাংবাদিক ওয়ালিউল বারিসহ করোনায় নিউইয়র্কে মৃত ব্যক্তিদের স্মরণে এক মিনিট নীরকতা পালন করেন। বিশেষ শোক প্রকাশ করা হয় প্রথম আলো পরিবারের সাংবাদিক রহমান মাহবুবের সন্তান মারজান রহমানের অকাল মৃত্যুতে। প্রথম আলো পরিবারের তরুণ কবি কোহিতুর পহেলী শোকপ্রস্তাব উপস্থাপন করেন। মারজানের স্মৃতিতে কবি এইচ বি রিতার কবিতা আবৃত্তি করেন ফরিদা ইয়াসমিন। অনুষ্ঠানে কয়েকজন কবি তাদের লেখা কবিতা আবৃত্তি করেন।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

অনুষ্ঠানে উপস্থিত অভ্যাগত, সুহৃদ ও স্বজনদের উপস্থিতি সবাইকে আবেগাপ্লুত হয়ে উঠেন। বহুদিন পর প্রিয়জনদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ, কুশলবিনিময় নতুন ব্যঞ্জনা তৈরি করে সবার হৃদয়ে।

শেলী জামান খানের উপস্থাপনায় স্বাগত বক্তৃতা করেন প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার আবাসিক সম্পাদক ইব্রাহীম চৌধুরী। তিনি করোনাকালে নিউইয়র্কের সাংবাদিকদের কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরে বলেন, ভয়াবহ করোনাকালেও ঘরে বসে না থেকে জীবনবাজি রেখে তাঁরা পথে নেমেছেন, এই রোগাক্রান্ত জনপদের খবরাখবর সংগ্রহ করে সংবাদ তৈরি করেছেন। ঘরবন্দী মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন কমিউনিটির নানা খবর। করোনাক্রান্ত মানুষ কী করলে, কোথায় গেলে প্রয়োজনীয় সামগ্রী, খাদ্যসহায়তা, সেবা পাবেন সেসব তথ্য সংবলিত খবর বিরতিহীনভাবে প্রকাশ করেছে প্রথম আলো।

সিলেট ফার্মেসি, শেইডস অব ভীষণ, ট্রান্সফোটেক, এনআরবি নেতা ফকু চৌধুরী ও নিউইয়র্ক নগরের ট্রাফিক ইউনিয়ন নেতা সৈয়দ উৎবা লকডাউন চিত্রপ্রদর্শনীতে বিশেষ সহযোগিতা দেন।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

এনওয়াইপিডির বাংলাদেশি মার্কিন ক্যাপ্টেন ও বাংলাদেশি আমেরিকান পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যারাম চৌধুরী নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তুলে ধরে বক্তৃতা করেন। সার্জেন্ট এরশাদ সিদ্দিকী নিরাপদ নিউইয়র্ক নগরে পুলিশের সঙ্গে জনসমাজের সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে কথা বলেন। ট্রাফিক ইউনিয়ন নেতা সৈয়দ উৎবা লকডাউন নিউইয়র্কে তাদের সদস্যদের কাজকর্ম চিত্রপ্রদর্শনীতে উপস্থাপন করার কথা জানান। ট্রান্সফোটেক নামের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী গালিব রহমান লকডাউনের সময়ে মানুষকে সহযোগিতার কথা তুলে ধরেন।

কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব মোস্তাক আহমেদ তাঁর বক্তৃতায় প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা এমন সৃষ্টিশীল উদ্যোগ নেওয়ায় ধন্যবাদ জানান। কবি ফারুক ফয়সল ইতিহাসে মানুষের নানা বিপর্যয় থেকে উত্থানের চিত্র তুলে ধরে বক্তৃতা করেন। তিনি কবি শামস আল মোমীন এবং ফকির ইলিয়াসের কবিতা থেকে আবৃত্তি করেন।

অনুষ্ঠানে নিউইয়র্কে বাংলাদেশ কমিউনিটির অনেক গণ্যমান্য বক্তি উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ সোসাইটি ও ড্রামা সার্কেলের সাবেক সভাপতি নার্গিস আহমেদ প্রদর্শনী উন্মুক্ত করেন। তিনি বলেন, নিউইয়র্কের বেশ কিছু সৃষ্টিশীল মানুষ প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার সঙ্গে সক্রিয় থাকেন। একটি সংবাদপত্র হিসেবে নিউইয়র্কের নাগরিক সমাজে এই পত্রিকা প্রশংসনীয় কাজ করছে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

লকডাউনে প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করেন হৃদয় অনির্বাণ খন্দকার, এমবি তুষার ও মাসুদুল কবির। তিনজনের লকডাউনের ছবি দেখে দর্শকেরা আবেগাআপ্লুত হন। চিত্রপ্রদর্শনীতে সাংবাদিকদের মুঠোফোনে তোলা বেশ কিছু স্থিরচিত্র দর্শনার্থীদের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

প্রদর্শনীতে তরুণ প্রজন্মের বাংলাদেশি আমেরিকান বেশ কয়েকজনের চিত্রকর্ম স্থান পায়। লকডাউনের সময় আঁকা এসব চিত্রকর্মে একটা সময়কে ধরে রাখার নিজস্ব প্রয়াস দেখা যায়।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ইশতিয়াক রূপু আহমেদ, রওশন হক, ফকু চৌধুরী, তোফায়েল চৌধুরী, আবু তাহের, এম এ আহাদ, মনীষা তৃষা, শাহ আহমদ, নাসরিন চৌধুরী, নাসিমা সুলতানা, এমবি হোসেইন, ফরিদা ইয়াসমীন, ভায়লা সালিনা, মনিজা রহমান, মনজুরুল হক, রোমেনা লেইস, নাসিমা আক্তার, মাকসুদা আহমেদ, কান্তা কাবীর, আইরিন রহমান, উইলী মুক্তি, পলী শাহীনা, বেনজীর শিকদার, জুলি রহমান, রওশন হাসান, শামস আল মমীন, বিপ্রেস রায়, এ বি এম সালেউদ্দীন, মোহাম্মদ আলী, মিথিলা শারমিন, মাহমুদুল কবীর, সায়ান সাদিক, তোফাজ্জল লিটন, ইবনাত নূহাশ, লিতাশকা হামাদি, তাহনিনা চৌধুরী, নিলিমা চৌধুরী, মোসহাদ আহমেদ, আশিষ দেবরায়, জাহিদা আলম, আবুল কালাম আজাদ, রহমান মাহবুব, আনোয়ারুল হক, শাবানা, সানজিদা উর্মী, কারাম চৌধুরী, এরশাদ সিদ্দিকী, মনিকা হক, শিরিল হাসান প্রমুখ।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন