default-image

১১ জুন ১৯৭২। সদ্য স্বাধীন দেশের অন্যতম জেলা শহর সিলেটে কলেজপড়ুয়া চার তরুণের সন্ধ্যার নিয়মিত আড্ডা শুরু নয়াসড়কস্থ চৌরাস্তার ছমাদের ছোট্ট হোটেলে। সেই চার তরুণের একজন নিউইয়র্কপ্রবাসী মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী মাসুম। সঙ্গে আরও ছিলেন হাবিবুল আলম বাকী, ওয়াজউদ্দিন আহমেদ কয়েস, মোয়াজ্জেম হোসেন। সবার ভেতরে সুপ্ত বাসনা, দেশের জন্য কিছু করবেন। ভাবনার রাজ্যে নানা বিষয়ের বিচরণ। বন্ধুদের একজন প্রস্তাব দিলেন, চলো সাইকেলে চড়ে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে যাই। ভারতের রাষ্ট্রপতিকে কৃতজ্ঞতার বার্তা পৌঁছে দিয়ে আসি।

বাংলাদেশের ৭ কোটি জনগণের প্রতি ভারতের এই ভালোবাসার পুরো প্রতিদান হয়তো বাংলার জনগণ দিতে পারবে না। তবে এই সময়ে বার্তাটি হবে ইতিহাসের এক অধ্যায়। ১০ মাসের পাক বাহিনীর অত্যাচার ও পীড়ন থেকে বাংলার জনগণকে মুক্ত করতে যারা নিজের তাজা রক্ত দিল। প্রতিবেশী সরকার দিল আশ্রয় আর খাদ্য। বিনিময়ে আমদের কি কিছুই করবার নেই? যেমন ভাবা হলো, তেমনি দ্রুত প্রস্তুতি পর্ব শুরু হলো। সিলেট শহরের প্রশাসনিক দায়িত্ব তখন সাংসদ ও প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা দেওয়ান ফরিদ গাজী সাহেবের হাতে। পরদিন সকালে গাজী সাহেবের বাসা থেকে সংগ্রহ করলেন টাইপ করা সাদা কাগজে প্রশাসনিক সিল মোহর দেওয়া যার যার জাতীয় পরিচিতিসহ প্রত্যয়ন পত্র। সদ্য স্বাধীন দেশে সেই এক পাতার কাগজটি ব্যবহৃত হতো পাসপোর্ট হিসেবে।

এরপর সবাই যোগাযোগ করলেন তৎকালীন চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি পরিবহন ব্যবসায়ী খন্দকার আবদুল মালিকের সঙ্গে, যিনি সবাইকে দিলেন দেশের বাইরে যেতে প্রয়োজনীয় ভ্রমণ সম্পর্কিত সনদপত্র। আগেই সিদ্ধান্ত ছিল, সাইকেলযোগে প্রথমে ভারতের শৈল্য শহর শিলংয়ে যাবেন। সেখান থেকে সড়ক পথে ভারতের রাজধানী দিল্লি। ভাগ্য ভালো। প্রত্যেকের পারিবারিক সিনিয়র সদস্য কারও না কারও বাইসাইকেল ছিল, এর সঙ্গে সবাই পেলেন ২৫ টাকা করে হাত খরচ। চারজনের মধ্যে দুজন ছিলেন জেল রোডের বাসিন্দা, হাবিবুল আলম ছিলেন সেই সময়ের জেলারের সন্তান। অন্য একজন যার নাম ছিল মোয়াজ্জেম হোসেন। তাঁর বাসার পাশে বর্তমান সিলেটের চেম্বার বিল্ডিং, যা আগে ছিল মিউনিসিপ্যালটি কর্তৃক পরিচালিত গরুর খোঁয়াড়। অন্য দুই বন্ধুর অন্যতম দুরন্ত যুবক মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর বাসা তাঁতি পাড়া। যিনি ছিলেন প্রয়াত শিক্ষকের সন্তান। আরেক মোয়াজ্জেম থাকতেন একসময়ের নীরব নিস্তব্ধ এলাকা যক্ষ্মা হাসপাতালের পাশে। বর্তমান যা শাহী ইদগাহ বলে সবাই চিনেন।

বিজ্ঞাপন

১৯৭২ সালের ১১ জুন এক ভোরে সিলেট জেলের সামনে ছোট্ট মাঠ থেকে যাত্রা শুরু চার সাইকেল চালকের। যাদের স্বপ্ন ও লক্ষ্য বাংলার নিপীড়িত জনগণের কৃতজ্ঞতার বার্তা পৌঁছে দেবেন ভারতের সেই সময়ের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরির কাছে।

মনে মনে টের পেলেন, অদৃশ্য এক আওয়াজ চল চল দিল্লি চল, ভালোবাসার ডালি মেল। যাত্রা শুরুর আগের দিন মাথায় এল ছবি তোলার পরিকল্পনা। সেদিন বিকেলে চার বন্ধু সাইকেলসহ ভ্রমণের জন্য তৈরি সাদা সার্ট (দেশের লাল সবুজ পতাকা সাঁটা) আর কালো প্যান্ট পরে হাজির হলেন সিলেটের টাইম স্কয়ার খ্যাত বন্দর বাজার সংলগ্ন শিল্প আশ্রম স্টুডিওতে। যেটি ছিল সিলেট শহরের আদি স্টুডিওর একটি। বর্তমানে নিউইয়র্কপ্রবাসী অশীতিপর সেদিনের ফটোগ্রাফার নিশীত পুরকায়স্থ স্মৃতি হাতড়ে ভেজা কণ্ঠে বললেন, আমি বেশ কয়েকটি ছবি তুলি তাদের। সাইকেল চড়ে দিল্লি যাওয়ার আগ্রহ শুনে আমি নির্বাক হয়ে যাই। ভাবলাম, ওরা আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছে। তবে তাদের উদ্যম দেখে গর্বে বুক ফুলে উঠে।

পূর্ব দিগন্তে ভোরের আলো ফোটার সময়ে দুরন্ত চার তরুণের স্বপ্নের ডানা মেলতে শুরু করল। তামাবিল রোড ধরে ধীরে ধীরে সাইকেলের প্যাডেল চেপে শুরু যাত্রা। লক্ষ্য অনেক দূর। ৫–১০ মাইল কিংবা শত মাইল নয়, প্রায় হাজার মাইল ভারতের রাজধানী দিল্লি। জনপ্রতি মাত্র ২৫ টাকা পকেটে নিয়ে সদ্য স্বাধীন দেশের জনগণের কৃতজ্ঞতা পৌঁছে দেওয়ার সাহসী দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন চার তরুণ। সীমান্তের আনুষ্ঠানিকতা সেরে তাঁরা যখন শিলং শহরের কাছাকাছি, ঠিক তখনই একটি ভারতীয় সামরিক জিপ থামল তাদের পাশে। সবাইকে চমকে দিয়ে জিপ থেকে আধাসামরিক পোশাক পরিহিত সিলেট অঞ্চলের বীরপ্রতীক খেতাবধারী সাহসী মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত ইয়ামিন চৌধুরী। সাইকেল চেপে দিল্লি যাওয়ার পরিকল্পনা শুনে প্রথমে চমকে উঠলেও পরে এ ধরনের সাহসিক যাত্রার জন্য শুধু শুভ কামনা জানাননি, পাশাপাশি সবার পকেটে পুরে দিলেন বেশ ভালো পরিমাণ আর্থিক সহায়তা।

সন্ধ্যার সামান্য আগে শিলং শহরে উপস্থিত হয়ে পূর্ব থেকে ভারতের পশ্চিমে যাওয়ার যাত্রা পথ নির্দিষ্ট করে পরদিন শুরু হলো ঐতিহাসিক যাত্রা। কখনো সড়ক পথে, কখনো বা রেলপথ ধরে ছুটে চলছেন বাংলার তথা সিলেটের সাহসী চার তরুণ, যারা সদ্য স্বাধীন দেশের জনগণের ধন্যবাদ বার্তা পৌঁছে দিতে চান ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ভি পি গিরির কাছে। প্রথমে আসাম রাজ্য ছেড়ে বাংলার এক অংশ পশ্চিমবঙ্গের শহর–বন্দর আর শত শত গ্রাম পেরিয়ে রুক্ষ বিহার প্রদেশ অতিক্রম করে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন ভারতের রাজধানী দিল্লি অভিমুখে। জয় বাংলার লোক জেনে এবং পাশাপাশি বাইসাইকেল ও পোশাকে বাংলাদেশের পতাকা দেখে খাদ্যপানীয় আর আশ্রয় দিতে এগিয়ে এসেছিল কত অজানা গ্রামের সরল মানুষ। মফস্বল শহরের কিশোর কিশোরীরা। ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা টিফিনের অর্থ তুলে দেয় চার তরুণের হাতে।

প্রায় সাত সপ্তাহের এই বাইসাইকেল যাত্রাপথে যে শহরগুলো সাহসিকতার সঙ্গে চার তরুণ অতিক্রম করেছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রথম শহর ছিল আসামের রাজধানী গুয়াহাটি। তারপর পাতাচার কুচি, নজলী, বড় কেটা, কুচবিহার, জলপাইগুড়ি, ময়নাগুড়ি, শিলিগুড়ি, কলকাতা, বিহার, কানপুর, হরিয়ানা, রাজস্থান, অমৃতসর ও গুজরাট রাজ্য ছিল উল্লেখযোগ্য। প্রায় সাত সপ্তাহ পরে তাঁরা গিয়ে পৌঁছলেন ভারতের রাজধানী দিল্লি শহরে।

রাজধানী পৌঁছে সৌভাগ্যক্রমে সাক্ষাৎ পেলেন স্থানীয় সাংবাদিকদের। তাঁদের সহায়তায় থাকার জায়গা পেলেন দিল্লির রাফি মার্গ রোডের প্যাটেল হাউসের অতিথিশালায়। পরদিন দুপুরের পর রাষ্ট্রপতি ভবনে সাক্ষাৎ পেলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরির সঙ্গে। বেশ বড় সাংবাদিক দল সহকারে রাষ্ট্রপতি সহাস্যে চারজনকে স্বাগতম জানালেন। সদ্য স্বাধীন দেশ থেকে সাহস করে কোনো আর্থিক সংস্থান ছাড়া এমনতর ভ্রমণ করে শুভেচ্ছা বয়ে নিয়ে আসায় সবাইকে ধন্যবাদ জানালেন তিনি। সঙ্গে আসা সাংবাদিকদের ছবি ওঠানো শেষে রাষ্ট্রপতি তাঁদের হাতে তুলে দিলেন ভারতীয় ৫০০ রুপির একটি চেক।

চেকটি ছিল এলাহাবাদ বাঙ্কের। রাষ্ট্রপতি ভারতীয় জনগণের পক্ষে খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে চার সাহসী তরুণের বয়ে নিয়ে আসা শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করে বলে উঠলেন—জয় বাংলা।

বিজ্ঞাপন
নিউইয়র্ক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন