default-image

ডাক্তার সাহেব তখনো চেম্বারে আসেননি। অফিস থেকে দেওয়া সময়ের সামান্য আগে উপস্থিত হলাম ১৭০-১২ হাইল্যান্ড অ্যাভিনিউতে স্লিপ অ্যাপনিয়া (ঘুমের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা) বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ বিল্লাহের চেম্বারে।

জ্যামাইকা হিলসাইডের ১৬৯ সাবওয়ে স্টেশনের বাম পাশের হোম লোন স্ট্রিট ধরে ওপরে উঠলে ডানে ডাক্তারের অফিস। রোগী হিসেবে এবার প্রথম আসা নয়। পাঁচ বছর আগে আরও একবার এসেছিলাম তাঁর অফিসে। স্বল্পভাষী ডাক্তার সাহেবের অফিসের আয়তন বড় হলেও রোগীর সংখ্যা তেমন চোখে পড়ার মতো ছিল না। তবে অফিসে রোগীদের সহায়তা করতে প্রস্তুত বেশ বড় একটি বাহিনী। তাই, তাঁকে দেখাতে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে শেলফে রাখা পুরোনো বাংলা পত্রিকা পড়ে সময় কাটাতে হয় না। এমনকি করোনাভাইরাসের ব্যাপক সংক্রমণের সময়কাল অর্থাৎ কয়েক মাস আগেও চেম্বারে এসেছি। তখনো ছিল সব স্বাভাবিক। ডাক্তার সাহেব সাধারণত রোগী দেখতে আসেন বিকেলের শেষ ভাগে ৬.৩০ মিনিটের দিকে। এর আগে চলে রোগীদের নানা পরীক্ষা–নিরীক্ষা। ব্যবস্থাটি রোগীদের জন্য আরামদায়ক। স্বল্প সময়ে ডাক্তার দেখিয়ে বাড়ি ফেরা যায়।

অথচ আজ সময়ের ৩০ মিনিট আগে চেম্বারে গিয়ে রীতিমতো বেশ বড় সাইজের ধাক্কা খেলাম। এ কি? অফিসের রিসেপশন রুমে রোগীদের উপচে পড়া ভিড়। রোগীদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে করোনা সংক্রমণ রোধ নীতি মেনে। দুই চেয়ারের মধ্যের চেয়ার উল্টো করে রাখা হয়েছে। যাতে কেউ যেন কাছাকাছি বসতে না পারে। তারপরও পুরো কামরাভর্তি রোগীদের প্রচণ্ড ভিড়।

বিজ্ঞাপন

রিসেপশনে তিনজন প্রশিক্ষিত টেকসহ অন্যান্য কর্মীর ছোটাছুটি চোখে পড়ার মতো। রিসেপশনের ডেস্কে রাখা তালিকা খাতায় নাম লিখতে গিয়ে চমকে উঠলাম। স্বাভাবিক সময়ে রোগীদের যে মোট সংখ্যা দেখেছি, তা আজ দাঁড়িয়েছে দ্বিগুণের বেশি। অথচ চেম্বারে এসেছি সময়ের প্রায় ৩০ মিনিট আগে। মূল কামরায় স্থান না পেয়ে এগিয়ে গিয়ে বসলাম করিডরে ডাক্তার সাহেবের কক্ষের সামনে। একটু থিতু হয়ে বসে চারদিকে তাকিয়ে অস্বাভাবিক এই ভিড়ের কারণ বোঝার চেষ্টা করলাম। যেহেতু নিজেই স্লিপ অ্যাপনিয়া রোগের একজন পুরোনো রোগী। তাই অভিজ্ঞতা থেকে অনুমান করছি বা জানি, বেশি বয়স্ক ও স্থূল আকারের অতিরিক্ত ওজনের নারী-পুরুষের ওপর এই রোগের প্রকোপ বেশি হয়।

অথচ আজকের রোগীদের উপস্থিতির মধ্যে বয়স্ক রোগীর পাশাপাশি চেম্বারে ডাক্তার দেখানোর অপেক্ষায় বসা রোগীদের মধ্যে কম বয়সের কয়েকজন রোগী দেখলাম। পুরোনো রোগী হিসেবে রিসেপশন কর্মীদের অনেকই চেনেন। সব সময় চেষ্টাও করেন, প্রত্যেক রোগীর পরীক্ষা–নিরীক্ষা দ্রুত শেষ করে বাড়ি ফেরার সুযোগ করে দিতে। আর আজ কিনা কেউই তাদের কারও চোখে পড়ছেন না। তাঁরা সবাই ভীষণ ব্যস্ত। স্বল্পভাষী ও বেশ যত্নশীল ডাক্তার মোহাম্মদ এম বিল্লাহ নিজেও চাইছেন, রোগীদের ভিড় যেন যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। তিনি নিজেও ছোটাছুটি করে রোগীদের প্রয়োজনীয় সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। করিডরের এক প্রান্তে বসে সময় কাটাতে নিজ ফোন কিছু লেখার চেষ্টার পাশাপাশি সিদ্ধান্ত নিলাম, এই অস্বাভাবিক রোগীর জটলা তাঁর অফিসে আজ কেন বা এর কারণই বা কি? তা জানতে চাইব।

ডাক্তার সাহেব হতাশ করেননি। সহকারী একজনের ডাকে ধীর পায়ে ঢুকলাম ডাক্তার বিল্লাহ সাহেবের চেম্বারে। ইতিমধ্যে আমার প্রাথমিক পরীক্ষা যেমন রক্তচাপ মাপা, ওজন নেওয়াসহ অন্যান্য পরীক্ষা সেরে আমি ডাক্তার সাহেবের মুখোমুখি। আমার রোগের বর্তমান অবস্থার সব রিপোর্ট দেখে আমার কী কী অসুবিধা, বেশ সময় নিয়ে খুঁটিনাটি সব জেনে বেশ কয়েক প্রস্থ ওষুধের নাম লিখে ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার পর আমি অনুমতি চাইলাম কয়েকটি প্রশ্ন করার সুযোগ দিতে। তিনি এত ঝামেলার মধ্যেও কয়েক মিনিট আমার জন্য বরাদ্দ করলেন।

আমার গোটা পাঁচেক সংক্ষিপ্ত জরুরি প্রশ্নের উত্তরে ডাক্তার সাহেব দিলেন চমকপ্রদ তথ্য। রোগীদের এই অস্বাভাবিক চাপের কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, এর জন্য অনেক কারণ রয়েছে, বিশেষ করে অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের ফলে বেশির ভাগ এই রোগের শিকার হন। তবে ইদানীং এই রোগের প্রকোপ বেশি দেখা দেওয়ার অন্যতম কারণ গত প্রায় এক বছর ধরে করোনার সরাসরি আঘাত। ডা. বিল্লাহ বলেন, করোনা সমাজের প্রায় ৯৫ শতাংশ অভিবাসীর জীবনযাপনের সব নিয়ম–কানুন পাল্টে দিয়েছে। করোনার ফলে অনেকের কর্মপ্রতিষ্ঠান সাময়িক বন্ধ থাকায় কাজ না করে বাসায় অনিয়ম করে সময় ব্যয় করছেন। বেশির ভাগ অভিবাসীসহ মার্কিন নাগরিকদের বিরাট অংশের দিন–রাতের স্বাভাবিক রুটিন আজ একদম আর মানা হয় না।

এই চিকিৎসক আরও জানালেন, করোনায় বাসায় বসে প্রচুর অবসর সময় থাকায় পরিবারের প্রতিটি সদস্য ব্যস্ত থাকেন নানা ধরনের মুখরোচক খাদ্য প্রস্তুতে। আর সেই অনিয়মিত ও বাড়তি খাবার সরাসরি সহায়তা করছে দেহের ওজন বৃদ্ধি করে স্থূলতার সংখ্যা বৃদ্ধিতে। এ ছাড়া আরেকটি বিশেষ কারণ যা অনেক বয়স্ক ও কম বয়স্কদের স্বাভাবিক ঘুমে প্রচণ্ড আঘাত এনেছে, তা হলো আর্থিক অনিশ্চয়তা। কেননা, নিউইয়র্কে বসবাসরত অভিবাসীদের সিংহভাগের আয় আসত হোটেলে চাকরি করে এবং ট্যাক্সি চালিয়ে। দুঃখজনক হলো, গত এক বছর ধরে করোনার তাণ্ডবে অভিবাসীদের আয়ের প্রধানতম দুটি উৎস একেবারে লন্ডভন্ড। চাকরি না থাকা বা কবে আবার স্বাভাবিক অবস্থা ফেরত আসবে, তা নিয়ে অধিকাংশ নিউইয়র্কবাসীর উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার চাপ সরাসরি সবার ব্যক্তিগত জীবনে স্থায়ী প্রভাব ফেলছে। এর ফলে বয়সভেদে নারী–পুরুষের ওপর এই স্লিপ অ্যাপনিয়া রোগের প্রভাব বাড়ছে।

এই রোগ থেকে মুক্তিরর পরামর্শ বা উপদেশ সম্পর্কে জানতে চাইলে ডা. বিল্লাহ বলেন, আমাদের বয়সভেদে সবার যথাসম্ভব স্বাভাবিক জীবনযাপনের নিয়ম মানতে হবে এবং দ্রুত সে জীবনে ফিরে যেতে হবে। করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে গিয়ে দিন–রাতের অধিকাংশ সময় নিজেকে কর্মহীন বা ঘরে আবদ্ধ রাখা চলবে না। অতিরিক্ত খাওয়া–দাওয়া একবারে পরিহার করতেই হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বাসা–বাড়ির আশপাশে হাঁটাচলা ও হালকা ব্যায়াম করে শরীরের বাড়তি ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। রাত জাগার মতো বাজে অভ্যাস ছাড়তে হবে।

এই চিকিৎসকের মতে, স্লিপ অ্যাপনিয়া বা ঘুমের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যার রোগের মারাত্মক উপসর্গ নিজের মধ্যে দেখার প্রধান কারণ, অকারণে রাত জেগে ঘুমের স্বাভাবিক সাইকেলকে উল্টো–পাল্টা করে দেওয়া।

ডা. বিল্লাহর আন্তরিকতাপূর্ণ পরামর্শ ও উপদেশের সবকিছু শুনে মুখে মাস্ক আর মুখমণ্ডলে প্লাস্টিক শিল্ড পরিধান করে সাবধানতা মেনে যখন চেম্বার ছেড়ে বের হচ্ছি, তখন শুনলাম চেম্বার ভর্তি নানা বয়সী রোগীদের অনেকে জোরালো শব্দ করে শ্বাস নিচ্ছেন। যা সত্যি স্লিপ অ্যাপনিয়া রোগের মারাত্মক লক্ষণ যা কখনো কখনো জীবননাশের কারণ হতে পারে।

বিজ্ঞাপন
নিউইয়র্ক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন