default-image

একদিকে করোনা, অন্যদিকে নিউইয়র্কে কনকনে ঠান্ডা। এর মধ্যেই ভয়াবহ তুষারপাত। সবকিছু মিলে নিউইয়র্কের আকাশ ভালো ছিল না। এমন বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যে যারা কিছুটা আলোর মুখ দেখবেন বলে ২ ফেব্রুয়ারি আশা করেছিলেন, চোখ রেখেছিলেন নিউইয়র্ক সিটি ডিস্ট্রিক্ট-২৪ সিটি কাউন্সিল নির্বাচনের দিকে, তাদের হতাশই হতে হয়েছে। এই নির্বাচনী এলাকায় ৪ বাংলাদেশি প্রার্থী লড়ছিলেন সিটি কাউন্সিল নির্বাচনে। জয় দূরে থাক, বাংলাদেশ প্রার্থীদের কেউই জয়ী প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ার মতো ভোটও পাননি।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটি ডিস্ট্রিক্ট-২৪ সিটি কাউন্সিল নির্বাচনে চার বাংলাদেশি প্রার্থী যেন ঠিক বরফ ঢাকা নিউইয়র্কে ডুবলেন। ছবিটি যেন সেই কথা বলে!

নির্বাচনে বিপুল ভোটে পরাজিত হয়েছেন চার বাংলাদেশি প্রার্থী। একই আসনে চার বাংলাদেশি মার্কিন প্রার্থী হয়েছেন বলে এমন ভরাডুবি হয়েছে বলে মনে করছেন নিউইয়র্কে বসবাসরত বাংলাদেশি মার্কিনরা।

চার প্রার্থী হলেন—মৌমিতা আহমেদ, সোমা এস সাঈদ, দিলীপ নাথ ও মুজিব ইউ রহমান। বহুল আলোচিত নির্বাচনে জেমস এফ জেনারো ৬৯ দশমিক ২৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। আর চার বাংলাদেশি মার্কিন প্রার্থীর মোট প্রাপ্ত ভোট ৩০ দশমিক ৭২ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

বোর্ড অব ইলেকশন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২ হাজার ৩৯ ভোটার নির্বাচনে আগাম ভোট দেন। ২ ফেব্রুয়ারি রাতে বোর্ড অব ইলেকশন অফিস সূত্রে পাওয়া বেসরকারি ফলাফলে জানা যায়, নির্বাচনে বিজয়ী জেমস এফ জিনোরো মোট ৩ হাজার ১৩৯ ভোট পেয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশি মার্কিন মৌমিতা আহমেদ পেয়েছেন ৮২৩ ভোট।

অন্য বাংলাদেশি মার্কিন প্রার্থীদের মধ্যে অ্যাটর্নি সোমা এস সাঈদ ৪৬১ ভোট, দিলীপ নাথ ২২১ ও মুজিব-উর রহমান পেয়েছেন ১১৮ ভোট। এ ছাড়া অন্যান্য প্রার্থীর মধ্যে দীপ্তি শর্মা ২৫৮, নীতা জেইন ১৫৯ এবং মাইকেল আর্ল ব্রাউন ৬৬ ভোট পেয়েছেন। চার বাংলাদেশি প্রার্থী মিলে মোট ভোট পেয়েছেন ১ হাজার ২৩, যা বিজয়ী প্রার্থীর পাওয়া ভোটের অর্ধেকের চেয়ে কম।

৪ প্রার্থীর শোচনীয় পরাজয়ে নিউইয়র্ক বাঙালি কমিউনিটিতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। একই পদে ৪ বাংলাদেশি মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাটা কেউই ভালোভাবে গ্রহণ করছেন না। তারা মনে করছেন, এতে করে নিউইয়র্কে দিন দিন অন্যান্য কমিউনিটির মানুষের কাছে বাংলাদেশি কমিউনিটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

নির্বাচনে বাংলাদেশিদের এমন ভরাডুবি সম্পর্কে সংগঠক ও লেখক ইশতিয়াক রুপু আহমদ বলেন, ‘কনকনে ঠান্ডায় বরফ ভেঙে ভোট দিতে গেছি। অথচ অনেক প্রবাসী ভোট না দিয়ে ঘরে বসে ফেসবুকে শুভ কামনা দেন। আমাদের উচিত, যে দেশে বসবাস করি, যে দেশের নাগরিকত্ব নিয়েছি, সেই দেশে আমাদের স্বদেশী প্রার্থীদের সমর্থন ও ভোট দেওয়া।’

ইশতিয়াক রুপু আরও বলেন, ‘আমাদের প্রধান সমস্যা, অন্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সঙ্গে মেলামেশা না করে হঠাৎ করে প্রার্থী হয়ে যাওয়া। তুলনামূলক এখনো বাংলাদেশি ভোটার সংখ্যা কম। আবার প্রার্থী হলেন চারজন। শুধু কমিউনিটি মিডিয়ায় প্রার্থীরা রাজনীতির প্রচার না করলে আরও বেশি ভোট পাওয়া যেত। আর এ কারণেই এই ভরাডুবি।’

কমিউনিটি নেতা মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশিরা নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার জন্য প্রার্থী হন না। দেশে ও প্রবাসে নিজেদের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে প্রমাণ করার জন্য ভোটে দাঁড়ান। তাই, কোনো ঐক্য ছাড়া এ রকম একটি ডিস্ট্রিক্ট নির্বাচনে চারজন প্রার্থী দাঁড়ানোই প্রমাণ করে, আমরা বাংলাদেশের রাজনীতি যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও ধারণ করছি।’

নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী সম্পর্কে ডিস্ট্রিক্ট-২৪ এলাকার একজন ভোটার এস মোহাম্মদ বলেন, নিজেদের মধ্যে এত প্রার্থী, তারপরও বাংলাদেশি মার্কিন প্রার্থীকে আগাম ভোট দিয়েছি। জানি, কেউ পাশ করবে না। কারণ, এসব প্রার্থী কেউই আমাদের এলাকায় থাকেন না। আমি তো বাংলা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে তাদের চেনার চেষ্টা করলাম।’

এস মোহাম্মদ আরও বলেন, গণহারে প্রার্থী হয়ে নিউইয়র্ক বাঙালি কমিউনিটিকে ধীরে ধীরে পচনের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে, এখানে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের বাঙালিদের ভবিষ্যৎ খুব খারাপ হচ্ছে।

মোশাররফ সবুজ নামের আরেক বাংলাদেশি মার্কিন বলেন, বাংলাদেশি ও বাঙালি একজন আরেকজনের ভালো চায়, এমন উদাহরণ খুঁজে পাওয়া খুব দুষ্কর। একজন ওপরে উঠতে চাইলে অন্যজন তার পা ধরে টেনে কীভাবে নিচে নামানো যায়, সব সময় সেই চেষ্টাই করে। তার জ্বলন্ত প্রমাণ, গত কয়েক বছরের এখানে যতগুলো স্থানীয় নির্বাচন হয়েছে, তার সবখানেই বাংলাদেশি একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। কোনো এলাকা বা আসনে একজনের হয়ে সবাই মাঠে নেমেছে, এমন নজির খুঁজে পাওয়া যায় না। এ কারণে অনেকের চরম লজ্জাজনক পরাজয় হয়েছে। এসব মানুষের মন-মানসিকতার পরিবর্তন হওয়া উচিত।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশিরা মনে করছেন, একই আসনে চারজন বাংলাদেশি প্রার্থী হওয়ায় ভোটাররা বিরক্ত, বিভ্রান্ত হয়েছিল। একজন প্রার্থী হলে এই আসনে অনায়াসেই বাংলাদেশি কোনো প্রার্থী বিজয়ী হতে পারতেন। তাঁরা মনে করেন, নিউইয়র্কের বাঙালি কমিউনিটির কাঁদা ছোড়াছুড়ি এবং পরশ্রীকাতরতা পরিহার করতে হবে। এসব কাজে কেউ হুট করে উড়ে এসে জুড়ে না বসে সৎ, যোগ্য, শিক্ষিত ও সমাজে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ করতে হবে।

সিটি কাউন্সিলম্যান নির্বাচিত জেমস এফ জিনারো ২০০২ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত কাউন্সিল ডিস্ট্রিক্ট–২৪–এর নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন। এ সময়ের মধ্যে তিনি ২০০১ সালে প্রথম, ২০০৫ সালে দ্বিতীয় এবং ২০০৯ সালে তৃতীয়বারের মতো সিটি কাউন্সিলম্যান নির্বাচিত হন। এরপর তিনি ২০০৮ সালে নিউইয়র্ক স্টেট সিনেটর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং সিনেটর ফ্রাঙ্ক পাদাভানের কাছে পরাজিত হন। এরপর ‘টার্ম লিমিট’-এর কারণে ২০১৩ সালের সিটি কাউন্সিল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা থেকে তাঁকে বিরত থাকতে হয়।

নিউইয়র্ক থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন