default-image

সকালটা আজ সত্যিই সুন্দর। পারফেক্ট ফল; না গরম, না ঠান্ডা। ঝিরঝিরে বাতাস। গাছের সবুজ পাতারা হয়ে উঠেছে রঙিন। অপূর্ব এক রঙের খেলা। কোনো কোনোটি গাঢ় খয়েরি, কোনোটি-বা হালকা হলুদ, কোনোটি লাল, কোনো কোনোটিতে আছে আবার সব রঙের মিশ্রণ। আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। সকালের রোদ যখন জিহানের বাসার পাশের পার্কের গাছগুলোতে এসে পড়ে, তখন চোখ ফেরানো যায় না। রোদ আর রঙের সে কী খেলা।

সকালে লাইব্রেরিতে খুব একটা মানুষের ভিড় থাকে না। ভিড় এড়াতে সেই সময় সিনিয়র কাস্টমাররা আসেন। অনেকেই আসেন তাঁদের সহকারীদের নিয়ে হুইলচেয়ারে করে। অনেকেই লাঠিতে ভর দিয়ে আসেন। অনেকে আবার বিশেষ ব্যবস্থার সরকারি গাড়িতে চড়ে।

লাইব্রেরির ফ্লোরে দাঁড়িয়ে নতুন আসা বইগুলোতে যত্ন করে ‘সেভেন ডে’ স্টিকার লাগাচ্ছিল জিহান। সপ্তাহের প্রায় প্রতিদিনই নতুন বই আসে লাইব্রেরিতে। নতুন বইয়ের সুবাস এক ধরনের মাদকতার সৃষ্টি করে। গন্ধটি আসে নতুন কাগজ, কালি, বাঁধাইয়ের আঠা আর মোড়ক থেকে। আজ প্রায় ১০ বছর নিউইয়র্ক শহরের উপকণ্ঠে ছোট গ্রামীণ শহরের লাইব্রেরিতে ম্যানেজার হিসেবে কাজ করে জিহান। লাইব্রেরিটি চলে স্থানীয় গ্রামীণ কাউন্সিলের টাকায়। চমৎকার স্থাপত্যশৈলীতে লাইব্রেরি ভবনটি তৈরি। সামনে ও পাশে বিশাল কাচের দেয়াল। পর্যাপ্ত সূর্যের আলো আসে, প্রাকৃতিক আলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার হয় লাইব্রেরিটিতে। শীতের সকালে রোদ এসে লাইব্রেরিকে ভাসিয়ে নেয়।

জিহান বুঝতে পারে তার পাশে কেউ একজন এসে দাঁড়িয়েছে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে অশীতিপর মিসেস ড্যানিয়েল। স্বভাবসুলভভাবে জিহান বলে, ‘হাউ আর ইউ মিস?’

বিজ্ঞাপন

-ডুইং ওয়ান্ডারফুল। এর পর যোগ করেন, ‘তবে আরও খারাপ হতে পারত।’

মিসেস ড্যানিয়েল প্রায় প্রতিদিন লাইব্রেরির সেবা গ্রহণকারী প্রবীণদের একজন। মোটা লেন্সের চশমা পরেন, হাতে লাঠি নিয়ে চলাফেরা করেন। থাকেন নিজের বাড়িতেই। তাঁর এক ছেলে পরিবারসহ তাঁর বাড়িতেই থাকে। একসময় স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। মোটামুটি ভালো অবসর ভাতা পান। তাঁর এক সহকারী আছেন, যিনি তাঁকে লাইব্রেরিতে আসতে সাহায্য করেন। তবে তাঁর নাতনিটিও তাঁর খোঁজ খবর রাখে।

এদের সঙ্গে জিহানের একটা হৃদ্যতা গড়ে উঠেছে। বৃদ্ধ মানুষেরা কারও সঙ্গে কিছুটা সময় কথা বলতে চান। কিন্তু অনেকেই তাঁদের এড়িয়ে চলে। তবে জিহান সবাইকেই কিছুটা সময় দেয়। এদের সঙ্গে তাঁর হৃদ্যতা গড়ে উঠেছে।

-কী হয়েছে মিস ড্যানিয়েল? এ কথা কেন বলছেন?

-আজ সকালটা সত্যিই সুন্দর। তবে রাতে আমার একটু সমস্যা হয়েছিল। আমার এইডটা তো রাতে থাকে না। তাই একাই বাথরুমে যেতে হয়। আমার নাতনিটা টের পেলে অবশ্য সাহায্য করে। আজ বাথরুমের সামনে প্রায় পড়ে গিয়েছিলাম। নাতনিটা শব্দ পেয়ে দৌড়ে এল। ততক্ষণে আমার চশমাটা মাটিতে পড়ে একটা ফ্রেম ভেঙে গেল। ল্যান্সটা অবশ্য ভাঙেনি। নাতি সেটা ঠিক করে ফ্রেমের ভাঙা ডাঁটের জায়গায় সুতা দিয়ে বেঁধে দিয়েছে। সন্ধ্যায় কাজ থেকে ফিরে চশমার দোকানে নিয়ে যাবে বলেছে। নতুন ফ্রেমের অর্ডার দিতে হবে। তোমার কী অবস্থা বল ইয়াংম্যান?

-আমি ভালো আছি। তবে তোমার কাহিনি শুনে দুঃখ পেলাম।

প্রায়ই এমন আরও ঘটনা ঘটে। কোনো কোনো ঘটনা জিহানের মনে দাগ কাটে। মন খারাপ থাকে কিছুদিন। আবার প্রকৃতির নিয়মেই সে ঘটনা একসময় সে ভুলে যায়। বিশেষ করে যখন কেউ একজন এসে খবর দেয়, তার কোনো এক সিনিয়র লাইব্রেরি ব্যবহারকারী আর ইহজগতে নেই। লাইব্রেরি থেকে নেওয়া বইগুলো ফেরত দেয়। নিয়ম অনুসারে সেই গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিতে হয়। তাদের কোনো ফাইন থাকলে তা মওকুফ করতে হয়। ব্যাপারটা তাকে ব্যথিত করে।

সামনের রিডিং টেবিলে যেখান সকাল থাকে দিনের বেশির ভাগ সময়ই রোদ এসে পড়ে, সেখানে প্রতিদিন এক বৃদ্ধ এসে বসতেন। তাঁর সাহায্যকারী তাঁকে নিয়ে আসত। দুপুরে লাঞ্চের আগ পর্যন্ত তিনি সেখানে বসে দৈনিক পত্রিকাগুলো পড়তেন। হঠাৎ এক সপ্তাহে তাঁকে আর দেখা গেল না। বেশ কিছুদিন পর তাঁর সাহায্যকারী বেশ কয়েকটি বই ফেরত দিয়ে জানাল, তিনি কয়েক দিন আগে গত হয়েছেন। সংবাদটি শুনে বেশ কিছুদিন জিহানের মন খারাপ ছিল। এমন আরও ছোট ছোট ঘটনা প্রায়ই তার মনে দাগ কাটে। আবার সময় সব ভুলিয়ে দেয়।

জিহানের দাদির কথা মনে পড়ে। সে বাসা থেকে ইউনিভার্সিটিতে যাতায়াত করত। দাদা মারা যাওয়ার পর দাদিকে বাবা নিজেদের কাছে নিয়ে আসেন। তাদের বাসাটা তেমন বড় ছিল না। বাবা জিহানের রুমেই আরেকটা সিঙ্গেল খাট ফেলে দাদির শোয়ার ব্যবস্থা করলেন। দাদি জিহানকে ভাই বলে ডাকতেন। রাতে দাদির বাথরুম পেলে আস্তে আস্তে জিহানকে ডাকতেন। অনেক দিন ইউনিভার্সিটির পড়া শেষ করে অনেক রাতে ঘুমাতে গেলেও দাদিকে মোটেও রাগ দেখাত না। সাহায্য করত। এক দিনের কথা জিহানের খুব মনে পড়ে। ভাদ্র মাস, প্রচণ্ড গরম। জিহান রাতে জানালা খুলে শুয়েছে। ভাদ্র মাসের জ্যোৎস্না সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়। রাতে দাদির ঘুম ভেঙে জানালা দিয়ে পূর্ণিমার চাঁদটাকে দেখলেন। কিন্তু বুঝতে পারছিলেন না সেটা কি। জিহানকে খুব আদর করে ডেকে ওঠালেন।

-ভাই দেখ তো এত বড় এটা কী?”

দাদির কথায় জিহান রাগ না হয়ে হাসি পেল, ‘দাদি এটা তো চাঁদ।’

বৃদ্ধ মানুষের ঘুম হালকা হয়। হয়তো তাঁর ঘুম পাচ্ছিল না। তাই আমাকে ডেকে একটা কিছু বলছিলেন। হয়তো এমন একটা জ্যোৎস্নায় দাদা দাদিকে নিয়ে পুকুর ঘাটে সারা রাত বসেছিলেন। হয়তো দাদি যে কথাটা আমাকে সত্যি বলতে চাইছিলেন, তা বলতে পারেননি। তবে আজও যখন আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঁকি দেয়, জ্যোৎস্না সব ভাসিয়ে নেয়, জিহানের দাদির কথা মনে পড়ে। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে—‘ভালো থেকো দাদি।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0