default-image

নিউইয়র্ক থেকে হাওয়াই অনেক দূর, তাই আগে কখনো বেড়াতে যাওয়ার সাহস করিনি। কথাটি আমার স্বামী আসিফ চৌধুরী প্রায় আফসোস করে বলতেন। যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য হাওয়াই। অথচ ৩৫ বছর এ দেশে বসবাস করে একবারও যাওয়া হলো না। মহামারির পর দুটি ছুটির শেষ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত হলো এবার হাওয়াই যাওয়া হবে।

রওনা দিলাম দুজনে। লাগোর্ডিয়া বিমানবন্দর থেকে সকাল আটটায় ফ্লাইট। কোনো বিপত্তি ছাড়াই ভোর ছয়টায় বিমানবন্দরে হাজির হলাম। সবকিছু জানা ছিল আগে থেকেই। পাশাপাশি প্রস্তুতও ছিলাম সবকিছুর জন্য। জানা ছিল, হাওয়াইয়ে পর্যটকদের জন্য মহামারি আইনে ভীষণ কড়াকড়ি চলছে।

বিমানের যাত্রা শুরু হয় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করে। চার ঘণ্টা পর বিমান প্রথমে অবতরণ করে ডালাস বিমানবন্দরে। সংযোগ ফ্লাইট ছিল ডালাস থেকে হাওয়াই। নিউইয়র্ক থেকে ফ্লাইট ছাড়তে এক ঘণ্টা দেরি হয়। ডালাসে পৌঁছে হাতে সময় মাত্র ৪০ মিনিট। দৌড়ে হাওয়াইয়ের ফ্লাইট ধরতে হলো। ডালাস থেকে সরাসরি কাহুলুই (হাওয়াই) ফ্লাইট। হাওয়াইগামী যাত্রী নিয়ে পুরো উড়োজাহাজাভর্তি। বেশির ভাগ অর্থাৎ ৯০ শতাংশ হলো শ্বেতাঙ্গ ভ্রমণকারী। সাড়ে সাত ঘণ্টার ফ্লাইট শেষে পৌঁছালাম মাউই শহরে।

বিমানবন্দরে নেমে দেখা গেল অনেক নিয়ম–কানুন। বারবার সেফ ট্রাভেল হাওয়াই ওয়েবসাইটে গিয়ে লগ ইন করে রিপোর্ট দেখাতে হয়, আমরা দুজন সংক্রমণমুক্ত। কোভিড যে সবার জীবনযাপন কঠিন করে দিয়েছে, তা উপলব্ধি করলাম হাওয়াই যাত্রা শুরুর পর থেকে। সর্বক্ষণ ভয়ে ছিলাম, যদি কিছু উল্টাপাল্টা হয় বা যদি রিপোর্ট গ্রহণ না করে।

সুখের বিষয়, সবকিছু ভালোভাবেই শেষ হলো। ভাড়া গাড়ি ছিল বলে বের হতে ঝামেলা হলো না। কাহুলু এয়ারপোর্ট থেকে হোটেল ৫০ মিনিটের পথ। হোটেলে পৌঁছে আবার নেগেটিভ কোভিড রিপোর্ট দেখাতে হলো সেফ ট্রাভেল হাওয়াইতে লগ ইন করে। নিউইয়র্কের সঙ্গে হাওয়াইয়ের রাজধানী মাউইর সময়ের ব্যবধান ছয় ঘণ্টা। হাওয়াই টাইম বিকেল সাড়ে তিনটায় পৌঁছে দিনের অর্ধেক পেলাম। ফ্রেশ হয়ে বের হলাম খাবারের সন্ধানে। গুগল খুঁজে পাওয়া গেল ‘পাইয়া ফিস মার্কেট’ নামের এক রেস্টুরেন্ট। দীর্ঘ ১৭ ঘণ্টার যাত্রায় বিমানে আমাদের খেতে দিয়েছে শুধু হালকা খাবার ও সোডা। করোনার কারণে সলিড খাবার পরিবেশন করা নিষেধ। টের পেলাম পেটে ভীষণ ক্ষুধা। গিয়ে দেখি, রেস্টুরেন্টের সামনে লম্বা লাইন। সবাই সামাজিক দূরত্ব মেনে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। আধ ঘণ্টা পর ডাক এল ভেতরে যাওয়ার। অর্ডার করা চার ডিশের মধ্যে মাত্র দুটি ডিশ শেষ করা গেল। হোটেলে রাতে আরামের লম্বা ঘুম শেষ করে জাগলাম পরদিন সকালে। ভোরেই দুজন ঘণ্টাখানিক হেঁটে দেখে এলাম হোটেলের পাশে চারদিকের মনোরম দৃশ্য। পরদিন শুক্রবার।

বিজ্ঞাপন

আমার স্বামী বাইরে গিয়ে নামাজ পড়বেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। নাশতা শেষ করে ফ্রন্ট ডেস্কে গিয়ে বুকিং করলাম পুরো সপ্তাহের ট্রিপ। পরে প্রায় ৪০ মিনিট ড্রাইভ করে পৌঁছলাম মসজিদে। সাধারণ একটা মসজিদ। জানা গেল, কোভিড–১৯–এর কারণে মসজিদে সাময়িকভাবে নামাজ পড়া হয় না। গাড়িতে বসে নামাজ শেষে যাওয়া হলো পাশের রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার সারতে। খাবার শেষে রওনা দিলাম হালিয়াকালা মাউন্টেনের দিকে। দেড় ঘণ্টা ড্রাইভ করে পৌঁছানো গেল গন্তব্যস্থানে। ৩০ মাইল গাড়ি চালিয়ে পাহাড়ের ওপরে উঠতে হয়। পুরো ড্রাইভ মনে হয়েছে রোমাঞ্চকর রোলার কোষ্টার ড্রাইভ। সাপের মতো আঁকা বাঁকা রাস্তা। ১০ মাইল গতির বেশি চালানো সম্ভব হয়নি। পাহাড়ের ওপরে উঠতে রাত হয়ে গেল। তাই দেখা হলো না সূর্যাস্ত। বেশির ভাগ পর্যটক পাহাড়ে চড়ে সূর্যাস্ত উপভোগ করেন প্রাণভরে। সিদ্ধান্ত হলো পর দিন আগেভাগে এসে সূর্যাস্ত দেখব।

ফিরতি পথে ধীরে ধীরে ১০ মাইল গতিবেগে সাবধানে গাড়ি চালিয়ে নিচে নামলাম আমরা। হোটেলে পৌঁছাতে আরও ব্যয় হলো প্রায় এক ঘণ্টা।

পরদিন সাবমেরিন টুর। ছোট আকারের লঞ্চ যোগে প্রায় ২০ জনকে ট্যুর অপারেটর নিয়ে গেল সমুদ্রের অনেকটা ভেতরে। সাবমেরিনে করে আরেকটা গ্রুপকে নিয়ে এল সমুদ্রের নিচ থেকে। এরপর আমাদের সবাইকে সাবমেরিনে ওঠানো হল। সবাই বসার পর সাবমেরিন ধীরে ধীরে পানির নিচে নেমে যেতে শুরু করল। বিস্ময়করভাবে প্রায় সত্তর মাইল নিচে। বারবার বলছিল, চারিদিক ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতে। এরপর আরও অনেক নিচে নেমে গেল। একপর্যায়ে নেমে এলাম প্রায় ১৩২ মাইল গভীরে। চারদিকে শুধু নানা জাতের নানা আকারের ছোট–বড় মাছ আর মাছ। খানিক পর দেখি বিরাট এক হাঙর। হঠাৎ দেখি পানির গভীরে পুরো এক জাহাজ। আশপাশে অজস্র মাছ ও হাঙর ঘোরাফেরা করছে অলস ভঙ্গিতে।

এক ঘণ্টা নিচে ঘোরাফেরা করে ভেসে উঠে আবার লঞ্চে ফেরত। লঞ্চে বসে ভিডিও করলাম সাবমেরিনকে। ভিডিও করতে গিয়ে বুকের ভেতরটা কেমন ধুঁক ধুঁক করছিল। বিশ্বাস হচ্ছিল না, আমরা এই সাবমেরিনে চড়ে সমুদ্রের নিচে বেড়িয়ে এলাম। বিকেলে আবার রওনা হলাম হালিয়াকালা পাহাড়ে সূর্যাস্ত দেখব বলে। সারি সারি গাড়ি পাহাড় ধরে আঁকাবাঁকা রাস্তা বেয়ে ওপরে উঠছে। পাহাড় ধরে ৩০ মাইল লম্বা রাস্তা গাড়ি চালিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা পর এবার পাহাড়ে উঠা গেল। সবাই অপেক্ষা করছে সূর্যাস্তের। আর এদিক-ওদিক হেঁটে হেঁটে ছবি তুলছে সবাই। অদ্ভুত সুন্দর এই সূর্যাস্ত। অনেক সূর্যাস্ত দেখেছি সাগর সৈকত থেকে। কিন্তু, এমন সুন্দর মনোমুগ্ধকর সূর্যাস্ত জীবনে প্রথম। উপস্থিত সবার মুখে একই কথা।

পরদিন হেলিকপ্টার রাইড। আসিফের অনেক দিনের শখ হাওয়াইতে সাবমেরিন ও হেলিকপ্টারে চড়া। একবার ভাবলাম যাব না, পরে মনে হলো না গেলে টিকিট কেনার টাকা জলে যাবে। ভয়ে ভয়ে দোয়া পড়ে চড়লাম হেলিকপ্টারে। এক হেলিকপ্টারে তিন জোড়া যাত্রী। সবার ওজন চেক করে কপ্টারে ওঠাল। প্রথমে পাইলট নিচ দিয়ে যাচ্ছিল। ভয় পাইনি এত। ১০ মিনিটে কথা বলতে বলতে নিয়ে গেল সমুদ্রের ঠিক ওপরে এবং ঘুরে দেখাল দুটো আইল্যান্ড। সমুদ্রের ঠিক মধ্যখানে (দুই আইল্যান্ডের মাঝামাঝি) থেমে দেখাল সমুদ্রের মধ্যে বহমান বিপজ্জনক স্রোতের ছোটাছুটি।

মনে পড়ছিল কবি ব্রাউনের হেলিকপ্টার ভ্রমণ করে হাওয়া হয়ে যাওয়ার গল্প। বুকের ভেতরটা যেন ভয়ে মোচড় দিয়ে উঠল। আসিফের হাত ধরে ভয়ে দোয়া–দরূদ পড়তে শুরু করি। সমুদ্রের ওপর হেলিকপ্টার এক ঘণ্টা উড়ল। পাহাড়ের ওপর ঘুরে ঘুরে কয়টি জলপ্রপাত দেখাল। দুই ঘণ্টার হেলিকপ্টার রাইড শেষ হলে মাটিতে নামার পর মনে হলো, ভালো লাগছে চারদিকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করে।

মাউইতে অনেক নামকরা সৈকত রয়েছে, প্রতিটি সৈকতই দেখতে অপূর্ব। ওদের নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। মনে হয়েছে একেকটি সৈকতের বালি থেকে শুরু করে পানি, আকাশ সবই যেন অন্য রকম। কোনোটির সঙ্গে কোনোটির মিল নেই। পুরো সাত দিন দারুন প্রতিটি মুহূর্ত কাটালাম মাউইতে। এর মধ্যে কুইপো নামের এক হাওয়াইনকে পেয়ে গেলাম বন্ধু হিসেবে। ভীষণ আন্তরিক ও খোলা মনের একজন নতুন বন্ধু, তাঁর নাম কুইপো।

বেড়ানের দিন শেষ হয়ে আসতে লাগল। অন্য কথায় নিউইয়র্ক ফেরার দিন ঘনিয়ে এল। কুইপো নাছোড়বান্দা। তিনি আমাদের দুজনকে তাঁর বাসায় দাওয়াত করলেন। হোটেল থেকে তাঁর বাসা মাত্র ৭ মিনিটের রাস্তা। বিকেলে হোটেলে ফোন করে বললেন, আমার বাসা হয়ে যেতে ভুলো না। তোমাদের জন্য আমি একটা জিনিস রেখেছি। বিকেলে গিয়ে দেখি, কুইপো আমাদের জন্য বাসার বারান্দায় বসে অপেক্ষা করছে। বাংলাদেশের মতো টিনের বাড়ি। পাশের বাগানে আম, পেঁপে এবং কলা ধরেছে প্রচুর। কিছুক্ষণ পর হাসিমাখা মুখ নিয়ে নিজ হাতে গাঁথা কাঁচাফুলের মালা পরিয়ে দিল আমাদের দুজনের গলায়। এমন অকৃত্রিম ভালোবাসা পেয়ে কি চোখের জল আটকানো যায়? পরম মমতায় নিজ হাতে মালাটি গলায় পরিয়ে যেন স্মরণ করিয়ে দিল, এ ধরণি নয় যে বৃহৎ। যদি না করতে পারি আমাদের ভালোবাসায় মাখা হৃদয়কে বিশাল সাগরের মতো।

বিজ্ঞাপন
সাহিত্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন