বিজ্ঞাপন

গানে গানে ইতিহাস জানি। সত্য মিথ্যা যাচাই করার বয়স তখনো আসেনি। ঘড়ির পুল পার মানে আলী আমজাদের ঘড়ির পুল পার হয়ে ট্রেন স্টেশনে যেতে হয়। ব্রিজে রিকশা উঠতে ঠেলা দেওয়া লাগত তখন। ব্রিজে রিকশা উঠছে আর পেছনে ঠেলা দিচ্ছেন কেউ। মাঝামাঝি পৌঁছালে ঠেলা যারা দিলেন তাঁদের মজুরি দিতে হতো।

ঘড়ির পুল তখন পর্যন্ত দেখা বড় ব্রিজ। রেলগাড়ি দেখি বিশাল লম্বা। ট্রেনের ইঞ্জিনের পোঁ পোঁ শব্দ শুনলে ভয় লাগে। আখাউড়া জংশনে ট্রেন থামতেই ফেরিওয়ালার হাঁকডাক শুরু হয়।

ছুটে চলা ট্রেনে আমরা ব্রিজ গুনতে শুরু করি। হুম হুম শব্দে ব্রিজ কতগুলো গোনা হলে দেখি ফিঙেরা পুকুরের বা নদীর পাশের খুঁটিতে বসে আছে। কখনো দেখি গরুর পিঠে বসে আছে। গ্রামগুলো কাছে আসে আবার দূরে সরে যায়। তারপর ঘুম পায়।

ঢাকা পৌঁছে আমরা ঢাকা বোর্ডিংয়ে রাতে থাকি। কমলাপুর রেলস্টেশনে পরদিন সন্ধ্যার দিকে যাই বেবি ট্যাক্সিতে। কমলাপুর রেলস্টেশন দেখে অবাক হই। আব্বার হাতের আঙুল শক্ত করে ধরি। যদি হারিয়ে যাই!

বাহাদুরাবাদ ঘাটে পৌঁছে দেখি হুলুস্থুল কারবার। আমাদের এখন ট্রেন ছেড়ে স্টিমারে চড়তে হবে। সুরমা নদীর পাড়ে যে লঞ্চ ঘাট সেখানকার ছোট লঞ্চের তুলনায় এগুলো বিশাল।

ফুলছড়িঘাটে নেমে আবার ট্রেনে উঠি। অন্ধকার রাত। নানা বাড়ির স্টেশনে ট্রেন থামে। রিকশায় করে আমরা যাই নানা বাড়ি শিলালিপিতে। ভোরে গরু-মহিষের গাড়ি আসার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে ঘুম ভাঙত। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেমন যেন অচেনা ঘ্রাণ পেতাম ধুলোমাখা এক শহরের।

শহর ছেড়ে, দেশ ছেড়ে একদিন পাড়ি দিয়ে আসি যুক্তরাষ্ট্র। দেশের চেয়ে এখানে সবকিছু আকৃতিতে বড়। রংপুরের ধাপ কটকিপাড়ায় একটা ছোট ব্রিজের পাশে ছিল আমাদের বাসা। এবার দেশে গিয়ে ওই ব্রিজটাকে ব্রিজ হিসেবে মেয়েকে পরিচয় করাতে গিয়ে মনে হলো বিরাট ভুল হয়ে গেল। মেয়ে হেসেই বাঁচে না। ব্রিজ তো নয়ই, এটা আসলে কালভার্টের চেয়ে একটু বড়। কিন্তু আগে ব্রিজই মনে হতো। ব্রিজই বলত সবাই।

দৃষ্টির পরিধি বেড়ে গেছে। ছোট ছোট সব দেখতে দেখতে বড় হয়ে এখন বড় বড় সব দেখে ছোট আর বড়র পার্থক্য করতে পারি। ফকার বিমান থেকে বোয়িং। শায়েস্তাগঞ্জ আর সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে হংকং ইন্টারন্যাশনাল বিমানবন্দর হয়ে জন এফ কেনেডি। বঙ্গোপসাগর থেকে আটলান্টিক মহাসমুদ্র। এই দেখাদেখির সঙ্গে যুক্ত হয় অনুভূতি। অন্তর্দৃষ্টিও প্রসারিত হয়। মনের চক্ষুকে বড় করতে হয়। অন্তর্দৃষ্টি সিন্ধু সমান হয়ে ওঠাই বড় কথা। মনের প্রশস্ততা বাড়াতে হবে। বই পড়ে। মন যেন সব পরিবেশে খাপ খাওয়াতে পারে। যে বিন্দুতে শুরু সেই বিন্দুতেই ঘুরপাক খায়।

ঈদের চাঁদ দেখার সেই মাঠও আজ নেই। মানুষ বেড়েছে, মাঠজুড়ে বাড়িঘর নির্মাণ হয়েছে। তালগাছগুলোও আর নেই। কেটে ফেলা হয়েছে। মৃত্যুশিলাও আর চোখে পড়ে না। এখন কেউ কি চাঁদ দেখতে যায়? মনে হয় না। চাঁদ তবু ওঠে চাঁদের মতো। এখন তো সবকিছু মোবাইল ক্লিকে হয়। ঘরে বসেই জানা যায় চাঁদ উঠেছে কিনা, ঈদ হবে কিনা। এই পৃথিবীতে সবার ঈদ হোক আনন্দময়।

সাহিত্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন