default-image

ঝকঝকে কাচের মতো স্বচ্ছ নীল আকাশ, আর পরিচ্ছন্ন প্রাকৃতিক ঋতু হেমন্তের প্রায় শেষ। হিমালয়ের পাহাড়ঘেরা ছোট শহর কাঞ্চনজঙ্ঘা। সেখানেই থাকে পনেরো বছরের এক মেয়ে; নাম প্রথমা। ছেলেটির বয়স আঠারো; নাম নবান্ন।

নবান্ন ছোটবেলাতেই মা-বাবাকে হারিয়েছে। বাবার বিশাল ব্যবসা। প্রচুর অর্থ-বিত্তের মধ্যেই প্রথমার বেড়ে ওঠা সৎ মায়ের সংসারে। একদিন রাস্তার ধারে বসে থাকা এক শিল্পীকে দেখে প্রথমার নিজের পোর্ট্রেট আঁকানোর ইচ্ছা হয়। পনেরো বছরের অপূর্ব সুন্দরী এক মেয়ের পোর্ট্রেট আঁকানোর আবদার কে-বা ফেলতে পারে। নবান্ন পোর্ট্রেট আঁকতে আঁকতেই প্রথমার প্রেমে পড়ে যায়।

নবান্ন রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে পোর্ট্রেট এঁকে দুপয়সা রোজগার করে। আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার ইচ্ছা তার। বড় শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার ইচ্ছা প্রবল। এরই মধ্যে প্রেমের পরশ ছুঁয়ে যায় নবান্নকে। শেষ পর্যন্ত থাকতে না পেরে প্রথমাকে প্রস্তাব দিয়েই ফেলে সে।

প্রথমার সঙ্গে দেখা হওয়াটা এক সময় অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায়। একদিন দেখা না হলেই বিশাল শূন্যতা বোধ করে। কিন্তু নিয়তির কী নির্মম খেলা! হঠাৎ প্রথমা অসুস্থ হয়ে যায়। আর প্রথমার সঙ্গে দেখা হয় না নবান্নর। বারবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় নবান্ন। অনেক খোঁজাখুঁজি করে টেলিফোন নম্বর জোগাড় করে সে। ফোন করে; কথা হয়। এর পর থেকে এটা নিয়মে দাঁড়িয়ে যায়। স্কুলে যাওয়ার পথেও দেখা হয়। ধীরে ধীরে ওদের দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব এবং তারপর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একসময় নিবিড় ভালোবাসায় আবদ্ধ হয় তারা।

বিজ্ঞাপন

নবান্ন ভালো পরিবারের ছেলে। বাবা স্কুলশিক্ষক, আর মাকে সে অল্প বয়সেই হারিয়েছে। ছেলেটা পাড়ার আট-দশটা বখাটে ছেলের মতো নয়; শান্ত ও ধীর-স্থির। অল্প বয়সেই ওর ব্যক্তিত্ব ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু তারপরও প্রথমার পরিবার ভীষণভাবে অমত পোষণ করে। অনেকভাবেই বাধা দেয় নবান্নকে। কিন্তু প্রেমিক নবান্ন তার পথ থেকে এক চুলও সরে দাঁড়ায় না। প্রথমাকে এ পথ থেকে সরে আসার জন্য বোঝাতে শুরু করে। ওর শূন্যতা নবান্ন সহ্য করতে পারে না। ভালোবাসা সাহসে রূপ নেয়। যেভাবেই হোক সে তার প্রথমাকে বের করে আনবে।

প্রথমার সৎ মা ও বাবার মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হয় প্রথমাকে নিয়ে। তাই আজ সেও যেন বাঁচতে চায় ভালোবাসাহীন এ জীবন থেকে। একদিন গভীর রাতে নবান্ন প্রথমাকে নিয়ে পালিয়ে যায়। প্রথমা তো বাঁচতেই চেয়েছিল এ কারাগার থেকে।

দুজনেরই প্রেম তখন উত্তুঙ্গে। তারা একসঙ্গে সব স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। ওরা বিয়ে করে। নবান্ন জানত প্রথমার এখনো বিয়ের বয়স হয়নি। কিন্তু উপায় ছিল না আর। বিয়ের খবর শুনে বাবা-মা আর কোনো কিছু করার চেষ্টা করেনি। ঘরে ফিরিয়ে আনে তাদের সমাজের ভয়ে।

বিয়ের রাতে প্রথমার হাত ধরে নবান্ন বলল, ‘আমার দুজন এখন সারা জীবনের জন্য দুজনার। আমি আজ আমার জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস পেয়েছি। বলো তুমি কী চাও?’ প্রথমার বয়স অল্প। এত বোঝার গভীরতা না থাকলেও নিজের মনে বলতে লাগল সব কথা—‘আমি বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হতে চাই। বাবা-মা বলেছে তোমার মতো গরিব ছেলেকে বিয়ে করলে আমার জীবনে কিছুই হবে না। দুদিন পর ছেলেমেয়ে হবে। আমার নিজের পায়ে কখনোই দাঁড়ানো হবে না। সত্যি কি আমাদের বিয়ের জন্য এমন হবে নবান্ন? আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারব না?’

প্রথমার এসব প্রশ্ন নবান্নর বুকে গিয়ে বিঁধে। সে ভাবতেও পারেনি আজ প্রথম রাতে এমন করে প্রথমা তার মনের কষ্টের কথা বলবে। সে বলে, ‘ভালোই হয়েছে প্রথমা। তুমি তোমার ইচ্ছার কথা আমাকে বলেছ।’

‘আমার এই আলিশান বাড়ি। আমার যশ, প্রতিষ্ঠা সবকিছু সম্ভব হয়েছে এই কম দামি প্যান্ট আর শার্ট পরিহিত এই সাধারণ মানুষটির জন্য। তিনিই আমার স্বামী নবান্ন। এই দশ বছর নিজে কোনো দিন ভালো কাপড় না পরে আমাকে দিয়েছে। আমার লেখাপড়ার খরচ চালানোর জন্য, আমার প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের জীবনের স্বপ্নকে বাদ দিয়েছে। নিজে আর্ট কলেজে না পড়ে আমাকে পড়িয়েছে।’

নবান্ন নিজের কথা আর জানতে দিল না প্রথমাকে। সবকিছু উপেক্ষা করে প্রথমার হাতের মধ্যে হাত রেখে বলল, ‘তুমি আমার ওপর ভরসা রাখতে পার। আমি বেঁচে থাকলে তুমি যা চাও সেটাই তুমি করতে পারবে। তুমি আমার ভালোবাসা। আমি আমার ভালোবাসার স্বপ্ন শেষ হতে দেব না। তুমি আমার প্রথম প্রেম। তোমাকে জিততে হবে, সে জয় আমাদের হবে। তুমি আমার হাত ধরেছ, এ হাত আমি কোনো দিন ছাড়ব না। কথা দিলাম তুমি আবার পড়া শুরু করবে। আমার ঘরটি বড় নয়। এই এক রুমে থাকতে কষ্ট হবে জানি। এখন এই ছোট ঘরে যার যার মতো করে থাকব, যত দিন আমাদের উদ্দেশ্য পূর্ণ না হয়। আমাদের অনেক কষ্ট হবে, তবুও কাঁদবে না। আমরা দুজন খুব ভালো বন্ধু হয়ে থাকব। তুমি এখনো অনেক ছোট। তুমি তো আমার বিবাহিত স্ত্রী। কেউ তোমাকে আর আমার কাছ থেকে নিয়ে যেতে পারবে না। কোনো ভয় নেই। প্রস্তুত হও মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য। তবে কাউকে বলবে না তুমি বিবাহিত। তাহলে পড়ালেখার ক্ষতি হবে।’

প্রথমা তেমন গভীরভাবে না বুঝলেও মেনে নিয়েছিল নবান্নর কথা। শুরু হলো জীবনসংগ্রাম। নবান্ন কখনো পোর্ট্রেট আঁকে রাস্তার পাশে, কখনো দিনমজুর খাটে, কখনো ইটভাটায় কাজ করে। এভাবে সে নিজের কথা না ভেবে প্রথমাকে ইঞ্জিনিয়ার বানানোর স্বপ্ন দেখে। পরীক্ষা চলে আসে। কারও চোখে ঘুম নেই। নবান্ন রাত-দিন খাটে; আর প্রথমার শুধু পড়া আর পড়া।

মাধ্যমিকে ফলে প্রথমা জিপিএ ফাইভ নিয়ে পাস করে। নবান্নর খুশির সীমা নেই। এভাবে অক্লান্ত পরিশ্রম করে ঘরে-বাইরে সংসারের সব দায়িত্ব পালন করতে শুরু করে নবান্ন। প্রথমাকে শুধু পড়ালেখা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। একের পর এক পরীক্ষায় সফলতা আসে। উচ্চমাধ্যমিক পাস করে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ার যোগ্যতা পায় প্রথমা। আর্ট স্কুলে ভর্তি হয়ে বড় শিল্পী হওয়ার ইচ্ছা নবান্ন চাপা দিয়ে রাখল। প্রথমার চেষ্টা দেখে গর্বে বুক ভরে যায় তার। নবান্ন শুধু ভাবে একদিন সবাই বলবে, আমাদের এই বিয়ে শুধু আবেগের বসে না।

যা টাকা পায় নবান্ন, তাতে বাসা ভাড়া, সংসার, পড়াশোনার খরচ চালাতে হয়। যেহেতু পড়ালেখা তেমন করতে পারেনি, তাই ভালো চাকরিও পায় না। একদিন হঠাৎ নবান্ন ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। প্রথমার চোখ পড়ে নবান্নর হাতের ওপর। ক্ষতবিক্ষত দুই হাত চোখ এড়িয়ে গেল না। ভারী বোঝা আর কঠিন কাজ করতে করতে এমন হয়েছে।

‘নবান্ন এত ত্যাগ তুমি আমার জন্য করছ!’ কিন্তু বুঝতে দেয়নি নবান্নকে। বিয়ের রাতের কথা মনে পড়ে। পাস করার আগে যত কষ্ট হোক, আমরা সংগ্রাম করে যাব। ওর এত কষ্ট দেখে মনটা ছোট হয়ে যায়। মনস্থির করে, নবান্নকে বলবে এত কষ্ট আর করতে হবে না। কিন্তু সামনে পরীক্ষা। স্বার্থপরের মতো চেখের পানি মুছে পড়তে বসে আবার। ভালো রেজাল্ট করতেই হবে। কোনো বন্ধুকে প্রথমা আজ পর্যন্ত বুঝতে দেয়নি যে, নবান্ন ওর স্বামী। বন্ধু-বান্ধব যখন জিজ্ঞেস করে, ‘এটা কে?’ প্রথমা পরিচয় দেয়, ‘আমার ভাই’ বলে। বন্ধুদের শুধু প্রশ্ন— যে মেয়েকে ভালোবাসতে সব ছেলে এত পাগল, সে কেন সব সময় গুটিয়ে রাখে নিজেকে এভাবে?

দীর্ঘ আট বছর পর প্রথমা পাস করে বের হয়। ভালো কোম্পানিতে চাকরি পায়। অল্প দিনে বাড়ি-গাড়ি করে। সবাই বিয়ের ব্যাপারে চাপ দিতে থাকে প্রথমাকে। সিদ্ধান্ত নেয় একদিন ডেকে সবাইকে বলবে। এখন সময় এসেছে ওর জীবন পাল্টানোর। এখন সময় এসেছে জীবনকে উপভোগ করার। এত ভালো ভালো প্রতিষ্ঠিত ছেলেরা ওকে বিয়ে করতে চায়, তাদের কেন সে অপেক্ষায় রাখবে? আর তা ছাড়া প্রথমা এদের উপযুক্ত, তাই কথা বলা উচিত। বন্ধু-আত্মীয়—সবাইকে নিমন্ত্রণ করে।

বিজ্ঞাপন

বাড়িতে সানাইয়ের সুর বেজে ওঠে। নতুন বাড়ির নতুন সাজ। প্রথমা সেজেছে অপরূপ সাজে। ঘরে হইচই আনন্দ। নবান্নর এতটুকু কষ্ট নেই। প্রথমা ওকে বাদ দিয়ে তার বন্ধুদের সঙ্গে বসে আনন্দ করছে। বন্ধুদের কৌতূহল—প্রথমা এমন অপরূপ সাজে কেন সেজেছে! সবাই আজ আমন্ত্রিত। নবান্ন প্রথমাকে ভালোবাসা ও স্বাধীনতা দিয়েছিল। প্রথমা জ্ঞানী ও প্রতিষ্ঠিত। যে সিদ্ধান্ত আজ নেবে, মেনে নেবে নবান্ন।

সাধারণ পোশাকে নবান্ন বাড়ির সব অতিথির দেখভাল করছে। নবান্ন মনে মনে ভাবে, হয়তো প্রথমা পরিবর্তন হয়ে গেছে। পড়ালেখা জানা মেয়ে, ভালো চাকরি করে। এদিকে অতিথিরা ভাবছে, নবান্ন এ বাড়ির কাজের লোক। কেউ কেউ বলছে, ‘এই এদিকে এসো, আমাকে পানীয় দাও।’ প্রথমার চোখ এড়িয়ে যায় না কিছুই। সবাই খাওয়া-দাওয়া শেষে অপেক্ষা করছে।

প্রথমা কাকে পছন্দ করবে আজ? হঠাৎ প্রথমা বন্ধুদের পাশ থেকে উঠে গিয়ে নবান্নর খুব কাছে গিয়ে হাতটি ধরে ডেকে এনে বলল, ‘এসো এখানে। নবান্ন আমার হাত ধরো। এত দিন তুমি করেছ, আমি ছিলাম চুপ। আজ আমার সময় এসেছে, আমাকে বলতে দাও।’ নবান্ন চাইছিল না কেউ বুঝতে পারুক প্রথমা নবান্নর স্ত্রী। প্রথমার কত সম্মান চারদিকে।

‘আমাকে শেষ করতে দাও নবান্ন!’ প্রথমা বলে চলে, ‘আমার এই আলিশান বাড়ি। আমার যশ, প্রতিষ্ঠা সবকিছু সম্ভব হয়েছে এই কম দামি প্যান্ট আর শার্ট পরিহিত এই সাধারণ মানুষটির জন্য। তিনিই আমার স্বামী নবান্ন। এই দশ বছর নিজে কোনো দিন ভালো কাপড় না পরে আমাকে দিয়েছে। আমার লেখাপড়ার খরচ চালানোর জন্য, আমার প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের জীবনের স্বপ্নকে বাদ দিয়েছে। নিজে আর্ট কলেজে না পড়ে আমাকে পড়িয়েছে।’

প্রথমা বলে যায়, ‘আজ সেই দিন আবার আমি তোমাকে ফিরিয়ে দেব নবান্ন। তুমি আবার ভর্তি হবে আর্ট কলেজে। কথা দাও তুমি বড় শিল্পী হবে। এর জন্য আমি অপেক্ষা করব তোমার। আঠারো বছরের কোমল এই হাতকে শক্ত লোহার মতো করেছ আমার জন্য। আমাদের ছিল বাল্যবিয়ে। তারপরও স্বামীর অধিকার নিয়ে আমার কাছে আসোনি। সত্যি আজ আমি গর্বিত।’

খুশিতে নবান্ন কেঁদে ফেলে। আজ এত মানুষের মধ্যে সে তার ভালোবাসাকে পূর্ণতা দিতে পেরেছে। রুমভর্তি মানুষ হতভম্ব আজ প্রথমার কথায়। অনেকে বলছে, ‘এ কী করে সম্ভব!’

কিন্তু প্রথমার ভ্রুক্ষেপ নেই। সে বলে যায়, ‘আজ এই দিনে আমাদের বিয়ে হয়েছিল। সবাই আমাদের অভিনন্দন জানান।’

রাত গভীর থেকে গভীর হয়। সবাই ওদের স্বাগত জানাল। দীর্ঘ কয়েক বছর পর নতুন এই বাড়িতে আবার বিয়ের সানাই, নতুন বাসর, ফুলে ফুলে সাজানো বিছানা।

সাহিত্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন