প্রায় ডুবে থাকে মাঠের পাশে সবুজ ঘাস ছিঁড়ে নিচ্ছে ঘোড়াগুলো ছন্দ তুলে। কখনো মাথা তুলে ডেকে উঠছে অজানা আওয়াজ তুলে। আর ঘোড়াগুলোর ছন্দময় চলা–হাঁটায় আমি খুঁজতাম আমার স্বপ্নে থাকা সেই গল্পের ঘোড়াগুলোকে। ১০ বছরের কিশোরের সেই চলা থেমে গেল একটি লাল টকটকে রঙের ঘোটকির আজব ভালোবাসায়।

বিজ্ঞাপন
default-image

শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর উপচে পড়া জলে শহরের বড় অংশ ডুবে যেতো বর্ষায়। আয়তনে ছোট আর গ্রামীণ আদলের মফস্বল শহরে আরও অন্য পাঁচ/দশটা অফিসের মতোই পুলিশের থানা অফিস ছিল শহরের মধ্য বরাবর। ইংরেজ আমল থেকে স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত সময়ে প্রতি থানায় দ্রুত বাহন বলতে অফিসারদের সাইকেল ও নানা আকারের দেশি–বিদেশি ঘোড়াই ছিল সম্বল। শুকনো মৌসুমে ওসি সাহেব আসামি ধরতে গ্রামে যেতেন ঘোড়া চড়েই। থানা প্রাঙ্গণে অনেক খোলা জায়গা ছিল। একসময় চারদিক ঘেরা ছিল সবুজ ছোট ছোট পাতার ঘন ঝোপের সারির তৈরি শতভাগ প্রাকৃতিক দেয়াল দিয়ে। পরে কাঁটাতারের তৈরি বেড়া দিয়ে প্রাঙ্গণ নিরাপদ রাখা হতো। থানার সামনে ছোট মাঠের সমান জায়গার ঠিক মাঝখানে ছিল ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অফিস। পশ্চিমে ছিল পুলিশ সদস্যদের কাঠের পাটাতনের তৈরি পুলিশ ব্যারাক। পূর্বদিকে থানা এলাকার শেষ সীমানায় ওসি সাহেবের বাসার উত্তর প্রান্তে ঘোড়ার আস্তাবল। লম্বাটে ঘরের চারদিকে অর্ধেক করে টিনের বেড়া থাকলেও ওপরে ছিল শক্ত ঢেউ টিনের চার চালা। সেখানে থাকত থানার হাফ ডজন দেশি–বিদেশি ঘোড়ার বহর।

ছোট বেলা থেকে দেখেছি নিজের বাসায় রাজ্যের গৃহপালিত পশুপাখি। দুধেল গাভি, ছাগল ছানাসহ তিতর পাখি, কবুতরসহ নানা জীব–জন্তুর বিচিত্র ডাক শুনে কাটতো সারা দিন। এত সবের পরও ১৯৬৮ সালে এক কিশোরের স্বপ্নে কখনো আসত ইসলামিক মিথে বর্ণিত দুল দুল ঘোড়া। আরও আসত এখতিয়ার বিন খিলজির চড়া ঘোড়াটি। যে ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ করতে বঙ্গদেশে এসে জয় করে নিলেন পুরো দেশ। কোনো রাতে স্বপ্নে দেখতাম ঘোড়ায় চড়েছি। জোর কদমে চলছে অচেনা কোনো সমুদ্র তীর ধরে। কল্পনায় দেখতাম, বিদ্যুৎ গতিতে চলছে দুলদুল, নয়তো খলিফা হয়রত আলীর আদরের পুত্রদের নিয়ে ছুটে চলা ঘোড়ার বহর।

ছোট বেলা শোনা একটি গল্পের নায়ক ছিল দুলকি আর মুলকি নামের দুটো ঘোড়া। যার হার মেনে নিতে পারেনি তার মালিক। তাই চিৎকার করে বলে দেয় আরও দ্রুত চলার মূলমন্ত্র। যা প্রয়োগ করতেই প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসার ঘোড়াটি দ্রুত চিরদিনের জন্য চোখের আড়াল হয়ে যায়। আরেকটি ঘোড়ার অবয়ব আমার লুকায়িত মানসে সারাক্ষণ জুড়ে থাকত। স্কুল ছুটির ফাঁকে মহকুমা শহরের কোর্ট প্রাঙ্গণে যেতাম চার আনা দামের ছানার মিষ্টি আর কাচের ছোট্ট গ্লাসে বসানো মিষ্টি দই খেতে। তখন দেখতাম, একজন জটায়ুআলা তার মাথা ঢেকে শুকনো ছিপ ছিপে এক লোক মাটিতে বিছিয়ে ক্যালেন্ডার বিক্রি করতেন। সেই ক্যালেন্ডারগুলোতে ছিল নানা বিষয় বর্ণিত। এসবের মধ্যে আমার চোখ আটকে যেত সাদা ধবধবে মাথায় উঁচু পালক লাগানো শরীরের দুই পাশে জোড়া পাখা লাগানো বিশাল আকারের ঘোড়া বোরাকের ছবিতে। যাতে চড়ে আমাদের নবী করিম গিয়েছিলেন সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে।

কোনো রাতের শেষ প্রহরে বোরাককে দেখতাম আকাশজুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে কোনো আরোহী ছাড়া। অন্য একটি ঘোড়ার আত্মিক উপস্থিতি টের পেতাম আমার মধ্যে। সেটি ছিল আমার এক চাচার খুব যত্নে লালিত–পালিত ঘোড়া নুর জামালের। কালো ও লাল রঙের মিশেলের সেই ঘোড়াটি ছিল পল্লি অঞ্চলের সেকালের নামকরা রেসের ঘোড়া। চাচা নুর জামালকে মশা থেকে রক্ষা করতে মশারির নিচে রাখতেন। খাওয়ানো হতো খৈল ভুসি, কচি ঘাস আর দেশি–বিদেশি হরেক জাতের ফল। বাসার পাশেই শহরের একমাত্র খেলার মাঠ। সবাই ডাকতেন এ টিম ফিল্ড। বর্ষায় প্রায় ডুবন্ত মাঠজুড়ে চলত ফুটবল খেলা। কখনো মহকুমার বাইরে থেকে টিম আসত। শহরজুড়ে প্রচণ্ড উত্তেজনা। দুপুর থেকে শহরের নানা প্রান্ত থেকে খেলাপাগল লোকজনে পূর্ণ হয়ে গেছে এই টিম ফিল্ড। বৃষ্টির শহর সুনামগঞ্জ। খেলা শুরুর সঙ্গে অঝোরধারার ঝুম ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে যেত।

বিজ্ঞাপন

তারপরও মাঠে খেলা থামছে না। মাঠের চারপাশে দাঁড়ানো দর্শকেরা ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন পায়ের পাতা ডুবে যাওয়া বৃষ্টির জলে। সবার চোখ মাঠে অথচ আমি পেছন ফিরে বৃষ্টিতে ভিজে দেখছি থানার ঘোড়াদের। যাদের মধ্যে দুটি পুরুষ ঘোড়া আর অন্যটি মাদি ঘোড়া। পরে সেটির নাম জেনেছি সুলেখা। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ধীরে ধীরে দর্শক সারি থেকে চলে আসতাম ঘোড়াদের আশেপাশে। মাঠের এক পাশের উঁচু লম্বাটে প্রান্তে সবুজ ঘাসের ছড়াছড়ি। প্রায় ডুবে থাকে মাঠের পাশে সবুজ ঘাস ছিঁড়ে নিচ্ছে ঘোড়াগুলো ছন্দ তুলে। কখনো মাথা তুলে ডেকে উঠছে অজানা আওয়াজ তুলে। আর ঘোড়াগুলোর ছন্দময় চলা–হাঁটায় আমি খুঁজতাম আমার স্বপ্নে থাকা সেই গল্পের ঘোড়াগুলোকে। ১০ বছরের কিশোরের সেই চলা থেমে গেল একটি লাল টকটকে রঙের ঘোটকির আজব ভালোবাসায়। তেমনি একদিনে হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই খেলার মাঠে।

অন্যদিনের ন্যায় ধীর পায়ে গিয়ে দাঁড়াই সুলেখা নামের ঘোটকীর পাশে। সে কী বুঝল জানি না। আমাকে দেখেই সামনের পা দুটো তুলে রীতিমতো লাফানো শুরু করে দিল সুলেখা নামের মাদি ঘোড়া। আগ–পিছ না ভেবে মুখের লাগামে আটকানো লম্বা রশির অন্য মাথা আটকানো খুঁটি কষ্ট করে তুলে হাঁটা দিলাম বাসার দিকে। খুশি মনে ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে আমার পেছন পেছন আসছে সুলেখা। যাকে আমি ভাবছি দুল দুল নয়তো সাদা রঙের জোড়া পাখা লাগানো ইসলামের ইতিহাসে স্থান করে নেওয়া বেহেশতি ঘোড়া বোরাক! হাঁটতে হাঁটতে পেছন ফিরে তাকালেই সুলেখা মাথা তুলে মুখ আর নাক দিয়ে বিচিত্র শব্দ তুলে আওয়াজ করে যেন বলত।

তোমার এই ভালোবাসায় আমি মুগ্ধ ও ভীষণ খুশি।

সাহিত্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন