মেডিসন স্কয়ার গার্ডেনে অনেক দিন পর এল সে। ছোটাছুটি ও কোলাহলে জীবনের সংজ্ঞা এখানে প্রতি মুহূর্তে নতুন রূপে দেখা দেয়। এতটুকু অবসর নেই কারও প্রতি মনোযোগী হওয়ার। নিজেকে নিয়েই পৃথিবী। পেন স্টেশনটি একেবারে নিচে। নন্দিতা ক্যারি-অন লাগেজটি টেনে নিয়ে এগোচ্ছে এক্সিটের খোঁজে। আন্ডারগ্রাউন্ডে বিশাল ট্রেন স্টেশনে সে কোন তলায়, বুঝে উঠতে পারছে না। সাইনগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ল। গ্রাউন্ড লেভেল থেকে সম্ভবত আট-নয় তলা নিচে হবে নন্দিতার অবস্থান। এম-ট্র্যাকে শিকাগো থেকে এসেছে। ওপরের লেয়ারে সাবওয়ে। তারও ওপরে স্ট্রিট লেভেল।

এখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কিংবদন্তিতুল্য রবিশঙ্কর, জর্জ হ্যারিসন ও ওস্তাদ আল্লারাখার কনসার্ট সারা বিশ্বময় আলোড়ন তুলেছিল। আমেরিকানদের এখনো মনে আছে। আয়োজকদের প্রতি নন্দিতার কৃতজ্ঞতাবোধ কোনো দিন কমবে না। হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলো ফিরে আসে।

বিজ্ঞাপন

মেডিসন স্কয়ার গার্ডেনে আননসহ মেয়েদের নিয়ে সার্কাস দেখতে এসেছিল অনেক বছর আগে। বড় মেয়ে অহনা তখন নবম গ্রেড, ছোট মেয়ে শানায়া সপ্তম গ্রেডে পড়ত। রিংলিং ব্রস সার্কাসের ফ্লাইং ক্যাচারেস দলটি এসেছে নিউইয়র্কে। রোববার ছুটির দিন। সন্ধ্যায় পৌঁছে যায়। মিডল সেকশনে চারটি সিটে তারা বসল। চিপস, পপকর্ন ও সোডা নিয়ে শীতের রাতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। প্রথমবারের মতো অহনা ও শানায়ার সার্কাস দেখা। সে কী আনন্দ! সাড়ে ৭টায় সার্কাস শুরু হলো চোখ ঝলসানো আলোকসজ্জা দিয়ে। অসাধারণ শারীরিক নৈপুণ্য। ভূমি থেকে অনেক ওপরে শূন্য আকাশে যেন বাদুড়ের মতো সুন্দরী তরুণীরা উড়ছিল। ভয়ে অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে—যদি নিচে পড়ে যায়। নির্ঘাত মৃত্যু। শো শেষে রাত ১১টায় বাসায় ফেরে।

ফেলে আসা দিনগুলো মনে আসায় কিছুক্ষণের জন্য আনমনা হয়ে পড়ে নন্দিতা। এস্কেলেটর ও সিঁড়ি বেয়ে মেডিসন স্কয়ার গার্ডেনের বাইরে চলে আসে। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। ট্যাক্সি নিতে লাইনে দাঁড়ায় সেভেন্থ অ্যাভিনিউয়ের ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে। কুইন্সের বেল বুলেভার্ডের বাসায় যাওয়া হবে না। যেতে পারবে না। অহনা ও শানায়াকে দেখতে অস্থির হয়ে উঠেছে। শিকাগো থাকায় ভুলে গিয়েছিল মেয়েদের কথা। ওরা বলে দিয়েছে তাকে ক্ষমা করবে না। ফোন করলেও হ্যাং-আপ করে নেয়। মেয়ে দুটো বাবার পক্ষ নেবে কল্পনাও করতে পারেনি নন্দিতা।

আননের প্রতি কি নন্দিতা অন্যায় করেছিল! বিয়ে বিচ্ছেদ বাবদ সে অনেক ডলার নিয়েছিল সত্যি। সেটা তার প্রাপ্য। বিনিময়ে পুরো বাড়িটা আননকে দিয়ে দিয়েছে। স্বাধীনভাবে চলবে বলে মেয়েদের কাছে আনতে কোর্টের আশ্রয় নেয়নি শেষ পর্যন্ত। নন্দিতাকে আনন অতিরিক্ত ডলার দিয়ে ফাইনাল সেটেলমেন্ট করে। অ্যাটর্নি বলেছিল, ইচ্ছে করলে নন্দিতা আরও সুবিধা আদায় করতে পারত।

নিউইয়র্কে সে সময় তাদের জীবন খুব চমৎকার ছিল। কুইন্সে‌ বে-সাইডে সুন্দর একটি বাড়ি কিনেছিল। দুজন একসঙ্গে অফিসে যেত। মেয়েদের স্কুল খুব কাছে। কোনো ভাবনা ছিল না। উইকেন্ডে জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী ও বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোতে বাঙালি সাজে সবাই যেত। অহনা ও শানায়া কাজিনদের পেয়ে গল্পে মেতে উঠত। কখনো বাড়িতে থ্যাংকস গিভিং পার্টির আয়োজন করত। একদিন সব ওলটপালট হয়ে গেল।

বিখ্যাত ব্রিটিশ কোম্পানি ম্যাকানন এরিকসনে জব পেয়ে নন্দিতা নিজের অজান্তেই বদলে যেতে থাকে। অহমিকা চলে আসে। আননের ভাইবোনকে অ্যাভয়েড করতে শুরু করে। ঘরে থাকলেও বলত, ঘরে নেই। তাদের টেলিফোন তুলত না। দিন দিন সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে। এতে নন্দিতার করার কিছু ছিল না।

বিজ্ঞাপন

একদিন আনন বলে বসল, ‘নন্দিতা তোমাকে আমেরিকায় হায়ার এডুকেশনের সুযোগ করে দিয়ে জীবনে সবচেয়ে বেশি ভুল করেছি। আমি কল্পনাও করতে পারি না অহংকারে এভাবে বদলে যাবে। তুমি উদাহরণ হয়ে রইলে। অন্য মেয়েদের ভয়ানক ক্ষতি করলে। এতে ছেলেরা ভয় পেয়ে এক শবার ভাববে বিয়ের পরে স্ত্রীকে আরও উচ্চশিক্ষা দেবে কিনা। আগে আমি অনুরূপ কিছু বাস্তব কাহিনি জানতাম। আমি কখনো এমন সংকীর্ণতাকে প্রশ্রয় দিইনি। কারণ, আমার সামনে অনেক চমৎকার দৃষ্টান্ত ছিল। যেখানে উচ্চশিক্ষা নিয়ে পারিবারিক জীবন মধুময় হয়ে উঠেছে। জানি না তুমি পরিবার থেকে কী শিক্ষা নিয়ে এসেছিলে। তোমাদের ব্যাপারে আমাদের তো ভালো জানা ছিল। নিজের আচরণ ও মূল্যবোধ উন্নত না রেখে বংশমর্যাদা দিয়ে কিছু হয় না বুঝলে নন্দিতা?’ একটু থেমে আবার বলল, কখনো ছেলেদেরও একই কাহিনি ঘটাতে দেখেছি। এটা মূল্যবোধের পরিপন্থী। গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’

আননের লেকচার শুনে নন্দিতা ভয়ানক ক্ষেপে যায়। মানসিকভাবে প্রায় ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। ভাইয়েরা নন্দিতাকেই দায়ী করে। ডিভোর্স হয়ে যায় শেষ পর্যন্ত। ভেবেছিল মেয়েরা তার সঙ্গে থাকবে। তারপর এতটা বছর পার হয়ে গেল। কাউকে জানায়নি সে নিউইয়র্ক আসছে। ভাইদের ওপর সুপ্ত অভিমান রয়েছে। তা ছাড়া অফিসের কাজ। সারা দিন ব্যস্ত থাকবে।

ক্যাবে উঠেই বলল, ‘প্লিজ ফোরটি নাইন স্ট্রিট, ল্যাক্সিংটন অ্যাভিনিউ, ইস্ট মেরিয়ট।’ অল্প সময়ে চলে এল হোটেলে। আগামীকাল রোববার। সারা দিন হাতে আছে। সোমবার দুপুরে মিটিং। সকালের ফ্লাইটে শিকাগো থেকে নিকলস চলে আসবে। তখন একসঙ্গে মিটিংয়ে যাবে। প্রয়োজনীয় ফাইলগুলো ডাউনলোড করে নিয়েছিল। নিকলসও নিয়ে আসবে। দুশ্চিন্তার কিছু নেই। ফ্রেশ হয়ে বের হলো। ডিনার করা হয়নি। হোটেল থেকে বেরিয়ে কাছের ‘চিপল্যাট মেক্সিকান গ্রিল’ ফাস্ট ফুড রেস্তোরাঁয় ঢুকল। বউল অর্ডার করল; ব্ল্যাক বিন, রাইস, চিকেন, চিজ, লেটুস, চিলি, সাওয়ার ক্রিম, সালসা ও গকোমলি নিল। সঙ্গে চিপস ও সোডা। চমৎকার একটা ডিশ হয়ে গেল। খেতে অনেক স্বাদ। দেরি না করে হোটেলে ফিরে আসে।

রোববার সকাল। মাথায় নতুন প্ল্যান আসলো। কয়েক ব্লক দূরে ‘এভিস কার রেন্টাল’ থেকে গাড়ি ভাড়া নিল। তারপর সোজা ড্রাইভ করে কুইন্সের বে-সাইড। আননের বাড়ি থেকে সামান্য দূরে গাড়ি পার্ক করে অপেক্ষা করছিল কেউ বের হয় কিনা দেখতে। ডানকিন ডোনাট থেকে ব্রেকফাস্ট ও কফি নিয়ে এসেছে আগেই। প্রায় দু ঘণ্টা পরও ঘর থেকে বের হতে কাউকে দেখল না। বাড়িতে কোনো সাড়া-শব্দ নেই। চলে যাবে, সেই মুহূর্তে দেখল—আনন একা বের হয়ে আসছে। ভয় পাচ্ছিল যদি ওর দিকে আসে। অনেক শুকিয়ে গেছে। কোন দিকে তাকাচ্ছিল না। আনমনে ড্রাইভওয়ের দিকে গেল। গাড়ি নিয়ে বের হয়ে গেল সে।

প্রায় পনেরোটি বছর তারা একসঙ্গে থেকেছিল। কখনো ভাবেনি আলাদা হয়ে যাবে। কলেজজীবনে দেশে পুলকের সঙ্গে নন্দিতা গভীর প্রেমে জড়িয়ে গিয়েছিল। পুলকের ভীরুতায় তাদের মিলন হয়ে ওঠেনি। কোনো ভালো চাকরি খুঁজে পায়নি সে। নন্দিতাকে বিয়ে করার সাহসটাও হারিয়ে ফেলেছিল। বাধ্য হয়ে আমেরিকায় প্রতিষ্ঠিত ছেলে আননকে পারিবারিকভাবে বিয়ে করে নন্দিতা। আমেরিকায় প্রথম দিকের দিনগুলো স্বপ্নের মতো ছিল।

আর ভাবতে পারে না। আনন কি বিয়ে করেনি? অহনা ও শানায়া কোথায়? ওরা কি বাবার সঙ্গে থাকে? নন্দিতা অনেকক্ষণ পার্ক করা গাড়িতে বসে রইল। আনন ফিরে এল না। এখন কী করবে? আসলে এভাবে আসা ঠিক হয়নি। পুরোপুরি ছেলেমানুষী করে ফেলেছে। নিউইয়র্ক থেকে চলে যাওয়ার পর অনেক দিন নিজেকে সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন রেখেছিল। সে জন্য অনেকের সঙ্গে এখন দূরত্ব বেড়ে গেছে। আননের সঙ্গে বিচ্ছেদের ব্যাপারটায় নিকট আত্মীয়েরা নন্দিতাকে দায়ী করছিলেন। নন্দিতা কষ্ট পেয়েছিল। সেই কারণে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিল। এতগুলো বছর কারও সঙ্গে সম্পর্ক রাখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি। টেলিফোন করলেও রেখে দিত। এভাবে হারিয়ে যায় সে সবার মধ্যে থেকে। বেদনায় তুষের আগুনের মতো প্রতিনিয়ত ক্ষয়ে যাচ্ছিল সে। তারপর ঘুরে দাঁড়াল। ফাস্ট লাইফ লিড করছে এখন। কাউকে পরোয়া করে না। স্বাধীন জীবন। একসময় ভুলে যায় নিউইয়র্কের দিনগুলোর কথা।

পরিচিত নেইবারহুড বে-সাইড। অহনা ও শানায়াকে নিয়ে কত বিকেল কাটিয়েছে কর্করেন পার্কে। বিশাল ঝুলন্ত সেতু ‘থ্রো নেক ব্রিজ’ কুইন্স ও ব্রঙ্কসকে যুক্ত করেছে। লিটল নেক বে জলরাশির অন্য প্রান্তে গ্রেটনেক। মিটমিট করে জ্বলতে থাকা বিশাল ঝুলন্ত সেতুর দিকে তাকিয়ে কত সন্ধ্যা কাটিয়ে দিয়েছে তারা। আজ খুব অপরিচিত লাগছে নেইবারহুডকে। অহনা ও শানায়ার সঙ্গে তবে দেখা হবে না? নাড়ির বাঁধন। গাড়ি থেকে বের হয়ে ধীরে ধীরে আননের বাড়ির দিকে গেল। সে তো মা। তাকে কীভাবে অস্বীকার করবে ওরা। দরজায় অনেকক্ষণ নক করল।

বিজ্ঞাপন

রোববার; নিশ্চয় ঘরে আছে। নক করতে লাগল। কোনো সাড়া-শব্দ নেই। কোথায় তাহলে? ফোন নম্বর আছে। কল করল। রিং হচ্ছে। টেলিফোন কেউ তুলছে না। এমন কী ঘটল যে, কেউ বাসায় নেই। টেলিফোনও ধরছে না। আননকে কি কল করা যায়? না সেটা করতে পারে না সে। তার সঙ্গে অনেক বাজে ব্যবহার করেছিল। আননকে বিয়ে করে আমেরিকায় এসেছে নন্দিতা। ইচ্ছে করলে তাদেরকে ফিরিয়ে দিতে পারত সেদিন। সেটা করেনি। যাকে ভালোবেসেছিল সেই পুলক সেদিন চাকরি না থাকার অজুহাতে কাপুরুষের মতো নন্দিতাকে ফিরিয়ে দেয়। নন্দিতা পরিবারের কথা ভেবে আননকে বিয়ে করে। আমেরিকায় আসার পর ভাইদের নিয়ে আসে। পরিবার দাঁড়িয়ে যায়। আননের কাছে তাঁরা কৃতজ্ঞ। আননের সঙ্গে অন্যায় করেছে নন্দিতা। এটা আর শোধরানো যাবে না। এখন সে ভীষণ একা।

অনেকক্ষণ কলিং বেলে চাপ দেওয়ার পরও কেউ দরজা খুলল না। গাড়িতে ফিরে এল। স্টার্ট দিয়ে আরও কয়েক মিনিট চেয়ে রইল বাড়িটার দিকে। হয়তো বাসায় কেউ নেই; অথবা তার প্রবেশাধিকার নেই। ম্যানহাটন ফিরে যেতে হবে। বেল বুলেভার্ড থেকে ক্রস আইল্যান্ড পার্কওয়ে (ইস্ট) নিয়ে লং আইল্যান্ড এক্সপ্রেস (ওয়েস্ট) ধরে মিড টাউন টানেল ফলো করল। ফিরে এল হোটেলে। বিষণ্নতায় মনটা ছেয়ে আছে। কখন ঘুমিয়ে পড়ল খেয়াল নেই। ডিনারের জন্য রিসিপশনে যায়। টিভিতে চলছিল ব্রিটিশ শিল্পী অ্যাডেলের হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া গানটি। ব্রিটেনের কোনো হলে গানটি গাওয়ার সময় অ্যাডেলে কেঁদে ফেলেন। সঙ্গে সঙ্গে হাজারো দর্শক তাঁর সঙ্গে গাইতে গিয়ে চোখের পানি চেপে রাখতে পারেনি। নন্দিতা টিভির দিকে তাকিয়ে তারও চোখ ভিজে যায়।

Never mind I’ll Find Someone Like You

I wish nothing but the best for you too

Don’t forget me I Bagged I Remember you

Said sometimes it lasts in love

But sometimes it hurts instead

Nothing compares No worries or Cares

Regrets and mistakes they’re memories made

Who would have known

How Bittersweet this would Taste

মন্তব্য পড়ুন 0