অপেক্ষা

শেলী জামান খান

মেয়েটিকে দেখে সে একটু চমকে গিয়েছিল। মেয়েটির চোখে দূরের হাতছানি। মুখের হাসিতে মায়াবী আমন্ত্রণ। ড্যান্স ফ্লোরেও কয়েকবার চোখাচোখি হয়েছিল।

ছেলেটি নিঃশব্দে হাসল। তারপর গাঢ় স্বরে বলল, ‘হ্যালো, বিউটিফুল।’ সে জানে তার কণ্ঠ ও কথায় জাদু আছে। নারীরা তার গভীর কালো চোখে ডুবে যেতে চায়!

উত্তরে লাজুক ভঙ্গিতে হাসল মেয়েটি। কয়েক পা এগিয়ে এল তার দিকে। ‘কী অপূর্ব রাত। তাই না? চাঁদের আলোয় সবকিছু যেন ঝলমল করছে।’ স্বগতোক্তির মতোই কথাগুলো উচ্চারণ করল স্বর্ণকেশী। তার নীল চোখের তারায় আলোর ঝিলিক।

ছেলেটি বলল, ‘তুমি এই ব্লু মুনের চেয়েও সুন্দর! বাই দ্য ওয়ে, আই অ্যাম জ্যাক। নাইস টু মিট উইথ ইউ মিস…!’

অসমাপ্ত কথার মাঝে উৎসুক চোখে তাকাল মেয়েটির চোখের দিকে।

-‘মোনালিসা হল!’

-‘মোনালিসা, তুমি দেখছি লক্ষ্মী মেয়ের মতো মধ্যরাতের আগেই বাড়ি ফিরছ?’

-‘ফিরতে হবে। উবার ডাকব। আমার এলাকাটা খুব নিরিবিলি। তাই বেশি রাত করার সাহস পাচ্ছি না।’

–‘কোথায় থাকো তুমি?’

–এভারগ্রিন গ্রেভইয়ার্ডে।’

–‘গ্রেভইয়ার্ডে?’

–‘হুম, সেখানেই তো আমার ঘর!’

–‘ইউ আর সো ফানি’।

‘ইয়েস, আই অ্যাম’!

–‘আমি তোমাকে ড্রপ করতে পারি। আমাকেও ওই পথেই ফিরতে হবে।’

–‘রিয়েলি?’

গাড়ি স্টার্ট দিয়ে জ্যাক বলল, ‘তোমার ঠিকানা বল?’

–‘১৬২৯ বুশউইক অ্যাভিনিউ’।

–‘আরে ঠিকানাতো আসলেই গ্রেভইয়ার্ড দেখাচ্ছে। প্লিজ, বাসার ঠিকানা বল।’

–‘গ্রেভইয়ার্ডের ফাস্ট গেটে ড্রপ করলেই আমি হেঁটে চলে যাব। বাসা খুব দূরে নয়।’

–চলে এসেছি প্রায়। প্রাইভেট হাউস?

–‘আমি থাকি মাটির তলায়।’

–‘ফানি গার্ল। তুমি বেসমেন্টে থাকো? জায়গাটা আসলেই সুনসান। রাতের এমন নিরিবিলিই আমার পছন্দ। বাই দ্য ওয়ে, আমার লাস্ট নেম বলা হয়নি। আমি জ্যাক রিপার।’

মোনালিসা এবার তার নীল চোখ তুলে জ্যাকের দিকে সরাসরি তাকাল। সেখানে ঝলসে উঠল একটি নিঃশব্দ ক্রূর হাসি।

–‘জানি। অনেক খুনিই নিজেদের ‘দ্য জ্যাক রিপার’ বলতে পছন্দ করে। তোমার অপেক্ষাতেই ছিলাম রিপার’!

ঘাড়ের কাছে প্রবল ঠান্ডা নিশ্বাসের ছোঁয়ায় চমকে উঠে জ্যাক। তার হাত স্টিয়ারিং থেকে ফসকে গেল। গ্যাসে চাপ খেয়ে গাড়িটি প্রচণ্ড বেগে গ্রেভইয়ার্ডের গেটের সঙ্গে বাড়ি খেয়ে থেমে গেল।

পুলিশ এসে গাড়ির একমাত্র আরোহীর রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহটি উদ্ধার করল!

বিজ্ঞাপন

তৃষ্ণা

শুচিস্মিতা চক্রবর্তী

আজ অক্টোবরের শেষ দিন। রাত হতে আর হাতে গোনা মাত্র কয়েকটা ঘণ্টা বাকি। ঠান্ডাটা বেশ জাঁকিয়ে নেমেছে। মোটা পুলওভার গায়ে, গলার মাফলারটা খুলতে খুলতে জগিং সেরে তিয়াশা মেইন গেট দিয়ে ঢোকে। ঘাড় উঁচু করে ওপরের ব‍্যালকনিতে তাকাতেই চোখাচোখি হয় প্রৌঢ় বাড়িওয়ালা মিস্টার বাসুর সঙ্গে,

-‘গুড মর্নিং, জেঠু, আজকের হেডলাইন কী বলে?’

–‘ধুর, ধুর! আর গুড মর্নিং! সেই এক নিউজ; আজ স্টেশনে তো কাল লোকাল ট্রেনে, নয়তো নদীর ধারে শুধু নাকি লোকজনের রক্ত শূন্য বডি পাওয়া যাচ্ছে। পুলিশ, সিআইডি, ফরেনসিক কেউ কিছুই নাকি ক্লু পাচ্ছে না। কোনো অপরাধীই আজ পর্যন্ত ধরা পড়েনি, ভাবতে পার? যত্তসব, আজগুবি খবর।

–আরে বাবা, কিডনি–ফিডনি না হয় পাচার হয় বুঝলাম। তাই বলে কি জ্যান্ত মানুষের রক্ত চুষে নিয়েও আজকাল পাচার হচ্ছে নাকি?!

–কি জানি বাপু, কি যে দিনকাল পড়ল! তুমি তো বেশ রাত করেই ট্রেনে ফেরো। সাবধান থেকো।

মর্নিং ওয়াক হল?’

–হুঁ, এই তো ফিরলাম। এবার তো ‘আপনা হাত, জগন্নাথ’; যাই অফিস বেরোতে হবে। আর ফিরতেও রাত হয়ে যাবে।

উহ! গলাটা পুরো শুকিয়ে গিয়েছে। মসৃণ চকচকে গাল বেয়ে ঘাম যেন মাখনের মতো গলে গলে পড়ছে। মুখে জলের ছিটে দিয়ে টাওয়ালটা নিয়ে বেসিনের ওপরের আয়নাটার দিকে তাকাতেই মুচকি হাসি খেলে গেল তিয়াশার চোখে। এই যৌবন ধরে রাখা কি মুখের কথা!

ফিল্টারটা খুলে জলের গ্লাসটা ধরতেই গলগল করে লাল টকটকে তরল বেরিয়ে এল।

আজকাল আর শুধু ফিকে জলে তেষ্টাই মেটে না! বড্ড পানসে লাগে।

রাতের শহরের রূপই আলাদা। মায়াবী রাতে মোহময়ী তিয়াশার আবেদনে সাড়া দিয়ে বড্ড ভুল করে নিশাচর পুরুষেরা। রাতের দিকে ট্রেনগুলো বেশ ফাঁকাই থাকে। ফাঁকা কম্পার্টমেন্ট। বেশ সহজেই কাজ হাসিল হয়ে যায়।

এখন হাওয়া গরম। কিছুদিন চুপচাপ থাকতে হয়েছিল! ক‍্যানাইনগুলো শিরশির করে ওঠে। আবার গলা ভেজায় তিয়াশা লাল নোনতা তরলে!

ভাগ্যিস বেশ কিছুদিনের সঞ্চয় ছিল। তাই কয়েকটা দিন হেসেখেলে তৃষ্ণা মিটে যাচ্ছে। আজ রাতেই আসছে ‘ওয়ান্স ইন অ্যা ব্লু মুন’। রহস্যময় পূর্ণিমার রাত। আবার নতুন শিকার! ঘাড়ের কাছে একটা ছোট্ট লাভবাইট! উফ! নেশা ধরে গেছে। কিছুতেই আর তর সইছে না। আজকের রাতটি বিফল হতে দেওয়া যাবে না কিছুতেই!

আপন মনেই গুনগুনিয়ে ওঠে তিয়াশা,

‘রাত অকেলী হ‍্যায়

বুঝ গয়ে দিয়ে...!’

কয়েক জন শুভময়

অর্ঘ্য রায় চৌধুরী

বাড়িটা কলকাতা শহরেই। একদম শহরের প্রাণকেন্দ্রে। শুভময়ের বাড়িটি ভালো লেগেছিল দুটি কারণে। দোতলার ঘরটা নিরিবিলি আর ঘর লাগোয়া বিরাট ব্যালকনি। শুভময় চিরকালই ইনট্রোভার্ট টাইপের মানুষ। বন্ধু-বান্ধব খুব কম।

ঘরটা বেশি বড় না। মাথার কাছে জানালা দিয়ে খাটের ওপর রাস্তার একফালি আলো এসে পড়ে। শুভময় চটপট ঘরটা গুছিয়ে নিয়েছিল। দুটি রাত ভালোই কেটে গিয়েছিল, সমস্যাটা হল তৃতীয় রাতে।

রাত দুটো নাগাদ শুভময়ের হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। দেখল, জানালা দিয়ে চাঁদের আলো এসে ঘর ভেসে যাচ্ছে। সেই আলোতেই চোখে পড়ল, পাশেই ঠিক ওরই মতো দেখতে অবিকল একজন শুয়ে আছে। চোখ দুটো খোলা, দাঁত বের করে হাসছে। শুভময় ভেবেছিল, ঘুমের মধ্যে হয়তো ভুল দেখছে। ভালো করে দেখার জন্য চোখটা কচলে নিল, আবার তাকিয়ে দেখে সেই একই জিনিস। কী ভয়ংকর অবস্থা। শুভময় দ্রুত খাট থেকে নেমে গেল। ওই জিনিসটা এখনো ওর খাটে শুয়ে।

পাড়ার মোড়ে একটা কুকুর ডেকে উঠল। শুভময় লাইটটা জ্বেলে দিল। খাটটা এখন ফাঁকা, কেউ নেই। এসব হ্যালুসিনেশন ভেবে শুভময় একটু হাসল। ভালো করে ঘাড়ে, মাথায় জল দিয়ে আবার লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। ঠিক তখনই বাথরুম থেকে জলের আওয়াজ ভেসে এল। শুভময়ের মনে পড়ল, শোয়ার আগে পুরোনো প্যাঁচ লাগানো ট্যাপটা ও বন্ধ করেই এসেছিল। উঠে গিয়ে দেখতে পেল, একজন শুভময় ট্যাপ খুলে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে হাসি। ভয় পেয়ে ঘরে আসতেই দেখতে পেল দ্বিতীয় শুভময় খাটে শুয়ে আছে। আরেকটা শুভময় সিলিং থেকে ঝুলছে। মুখে সেই অদ্ভুত নিঃশব্দ হাসি। আরেকজন শুভময় তার চেয়ারে বসে আছে।

ঠিক তখন দরজায় বেল বেজে উঠতেই শুভময় দৌড়ে দরজা খুলে দিল। যাক বাঁচা গেল। কেউ একজন এসেছে। মূর্ছা যেতে যেতে শুভময় দেখতে পেল, ঘরে ঢুকল আরও একজন শুভময়।

কয়েকদিন পর পাড়ার লোকেরা দরজা ভেঙে ঢুকে দেখতে পেল, শুভময় সিলিং থেকে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে। মুখে একটা অদ্ভুত হাসি!

বাড়িটিতে তারপর থেকে আর কেউ আসেনি। শুধু প্রতি পূর্ণিমা রাতে ব্যালকনিতে কেউ কেউ শুভময়কে এখনো পায়চারি করতে দেখে থাকে। বারান্দায় পাতা চেয়ারটিতে বসে থাকে আরেকজন শুভময়।

বিজ্ঞাপন

শোধ

আফরোজা মামুদ

রাত জেগে অফিসের কিছু জরুরি কাজ শেষ করছিল নাইম। প্রায় মধ্যরাত। কাজ করতে করতে সিগারেটের নেশা পাওয়ায় বাইরে এল সে। বের হওয়া মাত্রই সামনে দাঁড়ানো কুকুরগুলোর মুখোমুখি হল। যেন তারা নাইমের জন্যই অপেক্ষা করছিল।

নাইম বড় করে শ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করে ঘটনা বোঝার চেষ্টা করল। চোখের সামনে যা ঘটছে, সেটি যে বিভ্রম নয় তা বুঝতে তার বেশিক্ষণ লাগল না। নাইমদের এলাকায় কুকুরের উপদ্রব খুব বেশি। তারা নিশি রাতেও সারা পাড়া মাথায় করে রাখে। এরই মধ্যে নতুন করে তাদের বাড়িতে পোষা কুকুরটির আরও পাঁচটি বাচ্চা হল। এদের অত্যাচার হতে বাঁচার জন্য বাচ্চাগুলোকে সে দূরে কোথাও ফেলে দিয়ে এসেছিল। এরপর মা কুকুরটিকেও আর কোথাও দেখা যায়নি।

সেই সদ্যোজাত বাচ্চাগুলো এখন নাইমের সামনেই হাঁটু গেড়ে বসে আছে। মা কুকুরটি নাইমকে ঘিরে চক্কর দিচ্ছে।

নাইমের মনে হলো, কুকুরের চোখগুলো মধ্য দুপুরের সূর্যের মতো গনগনে লাল। যেন আগুনের গোলা। আজ অক্টোবরের শেষ রাত। পৃথিবী এখন মধ্য রজনীর দ্বিতীয় পূর্ণিমার বিস্ময়কর আলোয় ভাসছে। আকাশের বিশাল চাঁদ আর রাস্তার নিয়নবাতির আলো যেন এক রহস্যময়, অপার্থিব পরিবেশ সৃষ্টি করছে।

নাইম লক্ষ্য করল, কুকুরটি তার চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে বৃত্তের পরিধি কমিয়ে এনেছে। এখন ঠিক নাইমের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। টান টান শরীর। ভাবলেশহীন, পাথুরে চোখ।

ঠিক যেন পার্কে বসা অন্তঃসত্ত্বা সুমীর সেদিনের চোখের মতো। মুখটা ছিল সেদিন শিল্পীর হাতে শক্ত পাথরে খোদাই করা কঠিন শিলালিপি। তাদের চার বছরের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ম্লান হয়ে গিয়েছিল নাইমের ধনবান হবু শ্বশুরের বিত্তবৈভবের কাছে। বাড়িজুড়ে কুকুরের চিৎকার, সুমির মতো উটকো কোন ঝামেলা তার নতুন সংসারে কিংবা নতুন বউয়ের মনে বিরক্তির উদ্রেক করুক, নাইম তা চায়নি।

চোখের পলকে এবার সামনের পা দুটি পেছনে নিয়ে সামান্য অবস্থান বদল করল কুকুরটা। নাইমের মনে হলো, তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগাম প্রস্তুতি এটা। ভয়ংকর আতঙ্কে তার শরীরের সমস্ত লোম কাঁটা দিয়ে উঠল। প্রচণ্ড শীত অনুভূত হলো।

জ্ঞান হারানোর আগে বুকের ওপর একটা অশরীরী শক্তির ভয়াল উপস্থিতি কেবল টের পেল নাইম।

অন্য কেউ

ফরহাদ হোসেন

মিলির ঘুম ভেঙে গেল ভোর সাড়ে ছয়টায়।

ভিকির রুমে ঢুকেই মিলি একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখল। তার বিছানার পাশে মেঝেতে শুয়ে ঘুমাচ্ছে ফরিদ, মিলির স্বামী। ঘুমানোর ভঙ্গিটাও অদ্ভুত। মনে হচ্ছে, খাটের নিচে মাথা ঝুঁকে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করছে সে।

ভিকির বয়স পাঁচ বছর। সে একা ঘুমাতে ভয় পায়। ঘুমানোর সময় ফরিদকে ডেকেছিল হয়তো। কিন্তু ফরিদ মেঝেতে কেন ঘুমিয়ে পড়েছে, সেটা মিলির বোধগম্য হল না।

মিলি চলে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াতেই একটা শব্দ হল। সে স্থির হয়ে শব্দের উৎস খুঁজতে লাগল। হঠাৎ বাথরুমের ভেতর থেকে বেসিনে পানি ছাড়ার আওয়াজ ভেসে এল। বন্ধ বাথরুমের ভেতরে পানির কল ছাড়ল কে? মিলির শরীর হিম হয়ে গেল।

বাথরুমের দরজার ফাঁক দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছে। ভিকি যেভাবে জোরে বেসিনের পানি ছেড়ে দেয়—সেভাবেই কেউ পানি ছেড়ে দিয়েছে। মিলি ঘুরে দেখল ভিকি আর ফরিদ যে যেখানে ছিল সেখানেই আছে। অথচ বাথরুমে কেউ একজন আছে—অন্য কারও উপস্থিতি পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে।

মিলি দুরুদুরু বক্ষে বাথরুমের দরজার কাছে দাঁড়াল। তার বুকের ভেতরটা ভয়ে ঢিপঢিপ করছে। তবুও সে সাহস সঞ্চয় করে বলল, ‘কে? কে ওখানে?’

–‘ইট’স মি মামি!’

কণ্ঠ শুনে মিলি কেঁপে উঠল—এত অবিকল ভিকির কণ্ঠ! এর মানে কী? কাঁপা কাঁপা গলায় মিলি আবার জিজ্ঞেস করল, ‘কে?’

–‘আমি ভিকি!’

মিলি জমে বরফ হয়ে গেল। ভিকি? তাহলে বিছানায় ঘুমিয়ে আছে—সে কে? সে কি ভুল দেখছে? না কি ভুল শুনল। কিন্তু পানির শব্দ? এই তো এখনো হচ্ছে। ভিকি যেভাবে জোরে বেসিনের পানি ছেড়ে দেয়—ঠিক তেমনই পানি ছাড়ার শব্দ হচ্ছে। মিলির ভাবনা এলোমেলো হয়ে গেল। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। মনে হলো, অনন্তকাল ধরে সে দাঁড়িয়ে আছে। ‘ভিকি?’ অস্ফুটে একবার উচ্চারণ করল মিলি।

–‘ইয়া ইট’স মি!’

বাথরুমে পানি পড়ার শব্দ থেমে গেল। সুনসান নীরবতা। মিলির শরীরের ওজন যেন হঠাৎ করেই বেড়ে গেল কয়েকগুণ। সে অসাড় দাঁড়িয়ে রইল।

বাথরুমের দরজা খুলে গেল হঠাৎ করেই। মিলি চিৎকার করল, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হল না।

আদি বাড়ির ভূত

স্বর্ণাভা হাসান

চারটা গরুর গাড়িতে করে আমরা আজ বিকেলে এসে পৌঁছেছি। এখন রাত গভীর। আমরা সন্ধ্যার পর পর খাওয়া–দাওয়া করেছি। এই পল্লিগ্রামে আমার মায়ের মামাবাড়ি। উঠোনে হ্যাজাক জ্বেলে চারদিকে চেয়ার দিয়ে বসে আমরা গল্প করলাম। বাড়ির চারপাশে বাঁশঝাড় আর বড় বড় আমগাছ। বাড়ির মাটিতে রোদ প্রায় পৌঁছায়ই না। সন্ধ্যা নামার আগেই এখানে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে।

তিন দিকে টিনের দোচালা ঘর। পশ্চিমের ঘর নিয়ে কেউ কিছু না বললেও ওদিকে যেতে বারণ। আমিরুল মামাদের পুবদিকের ঘরে আমাদের থাকার ব্যবস্থা। রাতের খাবার খেয়ে আমরা বড় পালঙ্কে উঠে বসেছি। তখন হারিকেনের আলোয় আমাদের লম্বা লম্বা ছায়া দেয়ালে। নানি আমাদের আম কেটে দিয়ে গেলেন। আম খেয়ে আমরা বেশ দূরে কুয়া তলার কাছে বাথরুমে গেলাম। সবাই একসঙ্গে।

ঘন অন্ধকার রাত। চারদিকে জোনাকির আলো। আমরা এসে বিছানায় শুয়েই ঘুমিয়ে পড়েছি। হঠাৎ ঘুম ভাঙল। ঘরের চালে বৃষ্টির মতো ঢিল পড়ছে। আর ঘরঘর করে ভারী কিছু টেনে নেওয়ার শব্দ। আমি ভয়ে বড় বু’কে জড়িয়ে ধরেছি। মিনি, রিনি সবাই চিৎকার। লোপার চিৎকারে নানি হারিকেন নিয়ে আসলেন। ‘লাহাওলা ওয়ালা...!’ পড়তে পড়তে ফুঁ দিতে লাগলেন!

ফজরের আজানের পরপরই ঢিলের শব্দ আর ঘরঘর শব্দ থামল। নানি ফিসফিস করে বললেন, তাঁদের বড় আব্বা মাটির নিচে সিন্দুকে অনেক সম্পদ রেখে গত হন। সেই বসত ঘরটা পশ্চিমের পুরোনো বাড়িটি। ওই বাড়ি কেউ ভাঙতে গেলে পরদিনই মুখে রক্ত উঠে মারা যায়। একবার জঙ্গল পরিষ্কার করতে লোক লাগানোর পর লোকটির গায়ে আঁচড় মারল কে যেন। পরদিন ও নীল হয়ে মারা গেল। ওই ভিটার ধারে কাছে গেলে গোখরো সাপেও কাটে। পাহারাদার সাপ!

সকাল হতেই চিৎকার চেঁচামেচি পশ্চিমের ঘরের পাশে একটি গাছের নিচে হেমা নামে গ্রামের এক পাগলি মেয়ের মৃতদেহ পড়ে আছে। নানা জানালেন, এই হেমা নাকি খুব উচ্ছৃঙ্খল ছিল। খোলা চুলে ঘুরে বেড়াত। মাথায় ঘোমটা দিত না। আর পশ্চিমের ওই ভিটায় কাল সন্ধ্যায় ওকে কেউ কেউ ঢুকতে দেখেছিল।

প্রচণ্ড ভয়ে আমার শিরদাঁড়া বেয়ে যেন একটি শীতল স্রোত নেমে গেল। সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। সবাই নিথর হয়ে গেলাম।

বিজ্ঞাপন

ভুতুড়ে ম্যানশন

মনিজা রহমান

‘জ্যোৎস্না রাতে এখানে এক তরুণীর কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায়!’ —কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে শরীর বেয়ে তিরতির করে অশরীরী অনুভূতি খেলে যায়।

কয়েক শ একর জমির ওপর ভুতুড়ে ম্যানশনটি অবস্থিত। গাইড জানিয়েছে, আঠারো শ শতকের শেষ ভাগে এক ডাচ ভদ্রলোক এটা বানিয়েছিল। অপঘাতে তাঁর মৃত্যুর পরে তার মেয়ে আতঙ্কিত হয়ে পুরো সম্পত্তি সরকারি তহবিলে দান করে দেয়। সরকারি ব্যবস্থাপনায় পুরো এলাকাটা ঐতিহাসিক জায়গা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।

–‘আপনি কি কান্না শুনেছেন?’ আমাদের দলের একজন গাইডের কাছে জানতে চায়।

বিশালদেহী লোকটার লালচে মুখ ধীরে ধীরে নীল বর্ণ ধারণ করতে থাকে—‘একবার শুনেছি। প্রথম যখন কাজে যোগ দিই।’

গাইড ভদ্রলোকের নাম গেইল। যদিও সে নিজেকে স্কিপার নামে পরিচয় দিতে ভালোবাসে।

–‘তরুণীকে এখানে অনেকে চিনত। আমার আগের যে গাইড ছিল, তারও আগের গাইড, তারও আগের...’।

–‘আর কত আগে যাবেন?’ সোনালি চুলের এক মেয়ে ব্যঙ্গাত্মক স্বরে প্রশ্ন করে।

মেয়েটির কথা গায়ে না মেখে স্কিপার বলে, ‘এখানে এক রেস্টুরেন্ট মালিকের সঙ্গে ডেটিং করত তরুণীটি। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরে এখানে এসে বাস করতে থাকে।’

নিউইয়র্ক আপ স্টেটের টেরা টাউন নামের এই গ্রামটি ছবির মতো সুন্দর। সারা দিন নানা জায়গায় ঘোরার পর সন্ধ্যার দিকে এখানে এসেছি। কারণ চাঁদের আলোয় এই ম্যানশনে ঘোরার নিয়ম। আজ জ্যোৎস্না রাত।

শুকনো পাতায় মচমচ শব্দ তুলে আমরা এগোতে থাকি। জ্যোৎস্না রাতে গা ছমছমে পরিবেশ। ম্যানশনে ঢোকার পরে লিভিং রুমটি নানা ধরনের চিত্রশিল্প আর পিতলের জিনিস দিয়ে সাজানো। লম্বা হল ঘরটিতে ঢুকতেই গরম হাওয়া বয়ে যায়। কুকুরের কান্নার মতো এক ধরনের বিচিত্র সুর শুনতে পাই।

‘তরুণীর সঙ্গে কয়েকটা কুকুর ছিল, যাদের কেউ আর দেখেনি’—স্কিপার জানায়।

ঘুরতে ঘুরতে আমরা এক সময় উল্টো দিক দিয়ে বের হয়ে আসি।

একটু দূরে কালো লম্বা পোশাক পরা এক ডাইনিকে দেখতে পাই। হাত–পা বাধা এক তরুণীকে পুড়িয়ে মারার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে সে। গাইড আমাদের ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ থাকতে বলে। কিন্তু আমাদের দলে সোনালী চুলের মেয়েটি কিছু না মেনে তরুণীকে বাঁচাতে এগিয়ে যায়।

কিন্তু কিছু দূর যেতে প্রস্তর খণ্ডের মতো স্থির হয়ে যায় সে।

মন্তব্য পড়ুন 0