default-image

কৈশোর বয়স থেকেই এক বন্ধু একটা মেয়ের সঙ্গে প্রেম করত—তারা একজন আরেকজনকে ছাড়া বাঁচবে না। একদিন দেখা না হলে যেন তাদের চলতো না। কী ভীষণ প্রেম! ইন্টারমিডিয়েটের পর বন্ধুটি লটারি জিতে যুক্তরাষ্ট্র চলে যায়। এতেও তাদের প্রেম টলেনি। মেয়েটি তার বিয়ের সব আলোচনাই ভেস্তে দিত প্রেমিকের জন্য। বন্ধুর প্রেমও ছিল গভীর। পাঁচ বছর পর দেশে ফিরে সোজা ওই মেয়েকেই বিয়ে করল।

এবার বন্ধুর সঙ্গে ওই মেয়ে মানে তার বউ চলে এল যুক্তরাষ্ট্রে। আরও পাঁচ বছর পর একদিন বন্ধু ফোন দিয়ে জানাল, তার সেই কঠিন প্রেমের সোনার পাখিটা আরেকজনের হাত ধরে উড়াল মেরেছে। যে মেয়েটা আমার বন্ধুর হাত ধরে সারা জীবন সুখী হওয়ার স্বপ্ন দেখত, সেই স্বপ্ন পূরণ করতে যে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে, সেই স্বপ্ন যখন সত্যি হলো-তখন তার সুখের সংজ্ঞাই বদলে গেল। অনেক সাধনার পর পাওয়া এই মানুষটিকে নিয়ে সুখী হওয়ার আর কোনো আগ্রহই তার অবশিষ্ট থাকল না।

ক্লাস নাইন-টেনের পড়ার সময় আমার এক বন্ধু ছিল অবস্থা সম্পন্ন বাবা-মার তিন সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। সে খুব আদরের, পড়ালেখায় খুব ভালো। সে যখন যা চেয়েছে, বাবা-মা তখনই সেটা দিয়েছেন। একদিন বিকেলে সবাই মাঠে খেলছি, কেউ একজন দৌড়াতে দৌড়াতে এসে জানাল-আমাদের সেই বন্ধুটি আত্মহত্যা করেছে। আজ পর্যন্ত হিসেব মেলাতে পারিনি, এত ছোট্ট বয়সে আমাদের সেই বন্ধুটির কিসের অভাব ছিল? যাকে আমরা মনে করতাম খুব ভাগ্যবান, খুব সুখী, সে-ই কিনা আত্মহত্যা করল!

বিজ্ঞাপন

পরিচিত এক বড় ভাই নিজের পছন্দে পরিবারের অমতে বিয়ে করেছিলেন। সেই মেয়েকে বিয়ে না করলে নাকি তিনি জীবনে সুখী হবেন না। কয়েক বছর পর তাঁর হাতেই মৃত্যু হয় সেই প্রিয়তমা স্ত্রী। যাকে ছাড়া তিনি বাঁচবেন না, যাকে পাওয়ার জন্য সবকিছু বিসর্জন দিয়েছিলেন—কী এমন ঘটনা ঘটল যে, তিনি ভালোবাসার সেই মানুষকে নিজের হাতে হত্যা করলেন?

আরেক বন্ধুর এক বড় ভাই কত কাঠখড় পুড়িয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কয়েক বছর পর সেই বড় ভাই দেশে ফিরেছিলেন লাশ হয়ে। তিনি খুব বিষণ্নতায় ভুগতেন। এক সময় নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন। অনেক সাধনার পর স্বপ্নিল প্রবাসে যিনি সুখী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন, শত কষ্টের পর এই প্রবাসে এসে কী এমন পরিস্থিতি তাঁকে জীবনের প্রতি বিরাগ করল?

ভালো একটা চাকরি পাওয়া, উন্নত দেশে স্থায়ী হওয়া, বাড়ি-গাড়ির মালিক বনে যাওয়া কিংবা সুন্দরী নারীকে বিয়ে করাই যদি সব সুখের উৎস হতো তবে লক্ষ্যে পৌঁছানোর পর কেউ হতাশায় ভুগত না, ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সে জড়িয়ে পড়ত না, অনেক সাধনার পর ইউরোপ-আমেরিকায় এসে লাগামহীনভাবে সুখ পাখির পেছনে দৌড়াত না, বিষণ্নতায় ভুগত না, আত্মহত্যা করত না।

তাহলে সুখের মানে কী? কীভাবে মানুষ সুখী হতে পারে?

ওপরের ঘটনাগুলোতে দেখতে পাচ্ছি, আমরা দূর থেকে যেসব বিষয়কে সুখের উপাদান হয়েছে দেখি, সেগুলো অনেক সময় সঠিক নয়।আজ যে বিষয়টা সুখী করবে বলে মনে হচ্ছে, কাল হয়তো সেই অনুভূতি আমার নাও থাকতে পারে, হয়তো সেটাই হবে আমার অসুখের কারণ। তাই প্রকৃত সুখী হতে হলে চিন্তা চেতনায় সৎ থেকে আত্মবিশ্বাস রেখে সময়ের সঙ্গে মানিয়ে চলতে হবে। নিজের ক্ষমতা সক্ষমতা সম্পর্কে জ্ঞান রাখতে হবে।

জাপানি একটা প্রবাদ আছে ‘যার তৃপ্তি নেই, সে সবচেয়ে দরিদ্র’। সুখের চাহিদাটা যদি সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাত্রাহীনভাবে বাড়তে থাকে, নিজের যা আছে তাতে যদি সন্তুষ্টি না আসে, যদি অন্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত নিজের তুলনা চলে, তবে আমরা কখনোই সুখী হতে পারব না। তাই তো আমরা দেখি জীর্ণ শীর্ণ কুঁড়েঘরে একজন নিশ্চিন্তে ঘুমায়, আর বিশাল অট্টালিকায় এসির মাঝে থাকার পরও অন্যজন রাতের পর রাত নির্ঘুম থাকে।

নিজের ওপর আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে, সেই সঙ্গে ভাগ্যকে মেনে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে, ইতিবাচক চিন্তা ধারণ করতে হবে। ক্ষমার গুণ আয়ত্ত করতে হবে, তাহলে নিজের ভেতরটা হালকা হবে, শান্তি পাবে। অন্যথায় প্রতিহিংসার দহনে ভেতর পুড়তে থাকবে। এতে ক্ষতি নিজেরই হবে। মানুষের সঙ্গে মিশতে হবে, একাকিত্বের শেকল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে হবে।

কেউ কাউকে সুখী করতে পারে না, সুখী হতে হলে নিজের সঙ্গে নিজেই প্রতিনিয়ত বোঝাপড়া করতে হবে। শেক্‌সপিয়ার বলেছেন, ‘আমি সব সময় নিজেকে সুখী ভাবি, কারণ আমি কখনো কারও কাছে কিছু প্রত্যাশা করি না, কারও কাছে কিছু প্রত্যাশা করাটা সব সময় দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।’

সুখী হতে হলে নিজের ভালো লাগাকে সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করতে হবে, নিজের মন যে বিষয়গুলোতে আনন্দ পায়, সেসব ইতিবাচক বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিতে হবে। আমাকে নিয়ে কে কী ভাবছে সেটা বড় নয়, বরং আমার নিজের মতকে কতটুকু পূরণ করতে পেরেছি, কিংবা পূরণ করার চেষ্টা করে যাচ্ছি—সেটাই বড় কথা।

যে নিজের যোগ্যতা, চাওয়া-পাওয়াকে মূল্যায়ন করতে পারে, নিজেকে ভালোবাসতে পারে, সে অন্যদের চাওয়া-পাওয়া, যোগ্যতা, ভালোবাসাকেও মূল্যায়ন করতে পারে। ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগোতে হবে। ত্যাগী মানসিকতা আয়ত্ত করতে হবে, তাহলেই জীবনকে সার্থক মনে হবে, সুখী মনে হবে।

বিজ্ঞাপন
সাহিত্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন