default-image

সকাল থেকে গা গরম লাগছে। মাথা ভার ভার। গতকাল হঠাৎ বৃষ্টি এসে সব তছনছ করে দিল। ব্যবসা জমে উঠেছিল। বিকেলের আলোয় প্রেমিক-প্রেমিকারা আসছিল। ফুল কিনছিল যখন, তখনই আকাশ গুড়ুম গুডুম করে বিদ্যুৎ চমকাল। ঝরঝর বৃষ্টি শুরু হলো।

নয়নতারা আমার মেয়ে। খুব বুদ্ধিমতী। নয়নতারা ফুলের ব্যবসাটা ভালো বোঝে। আর বুঝবে না বা কেন! ওকে কোলে করেই তো এক কাপড়ে বের হয়ে আসি স্বামীর ঘর থেকে। স্বামী ছিল ড্রাগসের কারবারি। তারপর আমি জরিনা খালার কাছে আশ্রয় নিই। খালার সঙ্গে ফুলের ব্যবসা শুরু করি।

—নয়ন ও নয়ন তাড়াতাড়ি আয়।

আমরা মা-মেয়ে ফুলগুলো দ্রুত গুছিয়ে নিই। ভিজেই বাড়ি আসি।

—পেয়ারা খাব

কথাটা কানে আসে আমার। আড় চোখে দেখি মদিনা টাওয়ারের দারোয়ানের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁত বের করে অশ্লীল ভঙ্গিতে লুঙ্গি ধরে কথাটা বলেছে এক বজ্জাত। আমি মুখের জমে থাকা থুতু শব্দ করে ফেলে নয়নতারার বুকের দিকে তাকাই। বৃষ্টির তোড়ে ওর জামা বুকের সঙ্গে লেপ্টে গেছে। সদ্য জেগে ওঠা বুক জোড়া কবুতরের বুকের মতো জেগে উঠেছে। হাত দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা করছে। হাতের পাশ দিয়ে পেয়ারার মতো একটুখানি দেখা যাচ্ছে। আর সেদিকে তাকিয়ে অশ্লীল ইঙ্গিতে কথাটা বলেছে ওই লোকটা। দ্রুত হেঁটে পেছনের গলিতে ঢুকে পড়ি। গলির শেষ মাথায় একটা লম্বা টিন শেড। তার একটাতে আমরা মা-মেয়ে থাকি।

বিজ্ঞাপন

—নয়ন গামছাটা ল।

আমি ওর চুলের পানি মুছে দিই। ওর জামা বদলের সময় ওর সদ্য জেগে ওঠা স্তনযুগল দেখি। আমার চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই মাংসপিণ্ড সব হারামির নজর কাড়ে। মেয়েটা আমার খুব চটপটে। কোঁকড়া চুলের অনিন্দ্য সুন্দরী।

—মা নয়ন তুই যাগোর কাছে ফুল বেচোস কেউ কী তোর গায়ে হাত দেয় নি!

—না আম্মা। তুমি এক্কেরে বোকা। তাগোর গালফ্রেন্ড থাকে লগে।

—হ। একলা বেটারা কিনে না?

—আংকেল? হ তারা মাথায় পিঠে হাত দেয়।

—বুকে হাত দেয় কেউ?

—না না। আর দিতে আইলে গুলাপের ডাল দিয়া চক্ষু উপড়ায়ালাম।

—হ, সাবধান থাকিস। আমরার কইলাম কেউই নাই। নিজের ইজ্জত নিজে রাখতে হইবো। মারে আমার রাইতে জ্বর আইছে। অহন মাথা তুলতাম পারি না।

—আচ্ছা তুমি ঘুমাও। আমি যাইতাছি। আসনের সময় ওষুদ আনমুনে ডাক্তার আফার থন।

—কুন ডাক্তার আফা?

—জেরিন আফা। ফুল নেয় আমার থন। আমারে বলছিল, নয়নতারা অসুখ-বিসুখ করলে আমার কাছে এসো।

—আচ্ছা মা।

ওর কাপড়ের ওপর একটা শার্ট পরিয়ে দিলাম। বুকের বেড়ে ওঠা মাংসল অংশ যেন ঢেকে থাকে। শ্বাপদদের দৃষ্টি যেন আমার মেয়ের দিকে না পড়ে।

আগের দিনের টাকা গুণে দেখি ৩৭০। ৭০ টাকা ওর হাতে দিলাম। আমি ফুলতারা। বিয়ে হয় যখন, তখন মাসিক শুরু হয়েছে কয়েক মাস মাত্র। বিয়ের পরপরই ও ঢাকায় নিয়ে আসে আমাকে। পরিবাগের এক বাসার গ্যারেজের পেছনে ড্রাইভারদের কোয়ার্টার। বারো তলা ভবনের গ্যারেজের সঙ্গে এক রুমের ছোট্ট কোয়ার্টার। একদিন ছুটি থাকে। সেদিন বলাকা সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে নিয়ে যায়। গাউছিয়ার সামনে দোকানে লাসসি খাই দুজনে। যে সাহেবের গাড়ি চালায় উনি ব্যবসায়ী। গাউছিয়া মার্কেটে মেয়েদের ব্যাগের দোকান থেকে আমাকে মেরুন রঙের ব্যাগ কিনে দেয় বজলু। খুব পছন্দ হয় আমার। বাইরে গেলে ব্যাগ নিই। নিজেকে তখন বিবি সাহেবের মতো মনে হয়। কম দামি থ্রিপিস আর হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে স্বামীর সঙ্গে ঘুরে বেড়াই যখন, তখন এই পৃথিবীর সব থেকে সুখী মানুষ মনে হয় নিজেকে।

এরই মাঝে বুঝতে পারি আমি প্রেগন্যান্ট। ঢাকা মেডিকেলে জন্ম নেয় নয়নতারা। ওর বাবা ডাকে তারা। আর আমি ডাকি নয়ন। তারার যখন দুই বছর, তখন একদিন বড় সাহেবের গাড়িতে আমাদের নিয়ে সংসদ ভবনের পাশে বেড়াতে যায়। বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোর সময় আমার কাছ থেকে হ্যান্ড ব্যাগ নিল বজলু। আমি মাথা ঘুরিয়ে দেখলাম দূরে ঝোপের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন মানুষকে। অচেনা মানুষ। ওরা টাকা দিল। ও ব্যাগে রেখে কিছু একটা ওদের দিতেই ওরা চলে গেল। বাসায় এসে দেখি আমার ব্যাগ ভর্তি টাকা।

—এত ট্যাকা কীয়ের?

—কামাই করছি

—কেমনে

—বিজনেস

—কীয়ের বিজনেস?

—একজনে মাল দেয় আমি পৌঁছাইয়া দিই। ট্যাকা দেয়।

—কী মাল দেয়?

—সেইটা আমি জানি না।

—এতগুলান ট্যাকা দেয়। কী মাল দেয় জানতে হইব না!

—তুই ফালতু বকবক করস। অখন থাম। খাইতে দে।

সেদিন থেকে মনটা সব সময় চিন্তার মেঘে আচ্ছন্ন। প্রায় প্রতি সপ্তাহে ছুটির দিন বলে, চলো চলো আজ বেড়াতে যাব।

—কই?

—আজ যাব চন্দ্রিমা উদ্যান।

—চলো যাই। মেয়ে খুশি। জুতা নিয়ে আসে।

একেক দিন একেক জায়গায় যাই। ভিন্ন ভিন্ন লোককে মাল সাপ্লাই দেয়। কেমন এক অস্থিরতা দেখি ওর মধ্যে। একদিন বলি—না আমরা যাব না।

—ক্যান? সমস্যা কী?

—আমার বেশি সুবিধার মনে হয় না।

যেই আমি আপত্তি করি সে মেয়েকে বলে—চল, নয়নতারা আমরা গাড়ি দিয়া বেড়াইতে যাই। তখন আমারও যেতেই হয়।

বিজ্ঞাপন

দরজায় তালা দিয়ে তাড়াতাড়ি বের হই। চন্দ্রিমা উদ্যানে নেমে হাঁটতে থাকে। হঠাৎ দুজন লোক আসে। ও আমার হ্যান্ডব্যাগ খুলে একটা ছোট প্যাকেট দিয়ে দিতেই ওকেও একটা প্যাকেট দিয়ে দেয়। লোকগুলো দ্রুত চলে গেল। আর বজলুও গাড়িতে ওঠে। আমাদের তুলেই এদিক-ওদিক ঘুরে বাসায় চলে আসে। ওর সন্দেহ ঘনীভূত হয়। টাকা নিয়ে আজকাল মাঝে মাঝে বোতল নিয়ে আসে ঘরে। ওর সাহেব যে দোকান থেকে কিনে, সেও সেই দোকান থেকে কিনে। আমার বুকের ভেতর কষ্টের মেঘ জমতে থাকে।

একদিন পাশের বাসার লাভলীর সঙ্গে চাঁদনী চকে যাই। লাভলী জরিনা খালার বাসায় থাকে এখন। নতুন একটা ব্যাগ কিনে বাসায় আসি। বাসায় এসে দেখি বজলু রাগে ফুঁসছে।

—কী হলো?

—কই গেসিলি?

—চাঁদনী চক। এই দেখো কী সুন্দর ব্যাগ কিনছি। পুরান ব্যাগের সব এখানে ঢুকিয়ে নিসি।

ছোঁ মেরে ব্যাগ কেড়ে নিয়ে সব ঢেলে দেয় বিছানায়। কি যেন খোঁজে। না পেয়ে কেমন পাগলের মতো হয়ে যায়। ব্যাগ কই? পুরানটা?

—দুকানে ফালাইয়া আসছি। চড়-থাপ্পড় মারল কয়েকটা। একখন চল। টানতে টানতে আমাকে ও নিয়ে গেল ওই দোকানে। পুরান ব্যাগটা তখনো দোকানের ময়লার ঝুড়িতে ছিল। ব্যাগ নিয়ে বাড়ি এসে ওর ভেতরের সেলাই ফেড়ে বের করে আনল সাদা গুড়াভর্তি প্যাকেট। আমার চোখ ছানাবড়া।

তবে এই প্যাকেটে কী আছে জানার চেয়েও সে আমাকে বুঝিয়ে দিল লোভী এক মানুষ সে। সেখানে ফুলতারা শুধু ব্যবহার্য এক নারী। এক মুহূর্তেই মেয়েকে নিয়ে বের হয়ে গেলাম। আর ফিরিনি। তালাক দিয়ে দিয়েছি। কিছুদিন পর জেনেছি মালামাল হস্তান্তরের সময় গোলাগুলিতে মারা গেছে বজলু। আমি তখন গ্রামের বাড়ি ছিলাম, না হলে পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে যেত। আমার মেয়ের কী হতো তখন!

নয়নতারা আজ একাই চলে গেল কাজে। আমি শুয়ে আছি। একটা মাকড়সার জাল বোনা দেখি। বুনে বুনে ওপর-নিচ করতে থাকে। আমি দেখি হঠাৎ জাল ছিঁড়ে নিচে পড়ে যায় মাকড়সা। আবার চেষ্টা করে বুনতে। একটা টিকটিকি ঘুরে বেড়ায় আশপাশে।

আমার গায়ে জ্বর উথালপাতাল। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। পরিবাগের মসজিদে মাগরিবের আজান দিচ্ছে। উঠে বসি। আমার মাথার কাছে ওষুধ আর একটা পাউরুটি ও কলা। কখন যে এসে দিয়ে গেল! চোখে পানি চলে আসে। মেয়ে আমার। এ বছর বারো বছর পার হয়ে তেরো হবে। আমার মেয়ে আমার মা হয়ে উঠছে দিনদিন।

পাউরুটি আর কলা খাচ্ছি। চায়ের পাতা ছড়িয়ে রং চা নিয়েছি। রং চায়ের ভেতর লেবু দিতেই ঘ্রাণটা ভালো লাগল। প্যারাসিটামল খেয়ে নিলাম। মেয়ে এখনই ফিরে আসবে। চাল-ডাল চড়ালাম। ও আসলে ডিম ভাজব। কাঁচামরিচ আর পেঁয়াজ কুচিকুচি করে কাটলাম। এশার আজান শুনে চমকে উঠলাম এখনো ফিরল না যে মেয়ে। আমি গায়ে শাল জড়িয়ে ঘরে তালা দিয়ে বের হয়ে আসলাম রাস্তায়। রাস্তার ফুল বিক্রেতা কেউই আর নাই। মদিনা টাওয়ারের পাশে চায়ের দোকানে চা খাচ্ছে কয়েকজন অচেনা মানুষ। এক বুড়া রিকশাওয়ালা খক্ খক্ করে কাশে। তবুও বিড়িতে টান মারল। আমার মাথা শূন্য। কই যাব?

—নয়ন...নয়নতারা...। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে আমার ডাক। কিন্তু উত্তর পাই না।

লাভলী আর জরিনা খালার ঘরে এসে ধাক্কা দিই।

—কী হইসে রে?

—বুবু, খালা রে ডাক।

—কী রে?

—ও খালা তুমি আইজ আমার নয়নরে দেখছ নি।

—দেকছি। আমরা একলগেই কাম শেষ করছি। ও মদিনা টাওয়ারে ফুল দিতে গেল। ১০০ গোলাপ ফুলের ডেলিভারি দিয়া টাকা লইয়া তোমার জন্যি খাবার কিনে বাড়ি যাবে বলল। আমরা বাড়িতে চলে আসলাম।

—ও খালা আমার মায় তো ঘরে আসে নাই। আমার ভয় লাগতেছে খালা। মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম আমি ওখানেই।

—ফুলতারা। ফুলী ফুলী চোখ খোল মা রে।

জরিনার হাঁক ডাকে বাবুল, ইসলাম, নুরু এসে শুনল সব। ওরা দুই-তিনদিকে ছড়িয়ে খুঁজতে শুরু করল। মদিনা টাওয়ারের সামনে এসে দেখি আজ অন্য এক দারোয়ান।

—একটা মেয়ে ফুল নিয়ে ভেতরে গেছিল সন্ধ্যায় আপনি কি দেখছিলেন?

—আমি আটটার সময় আইছি। আমার ডিউটি আটটা-ছয়টা। বেলাল চলে গেছে। ও ছয়টায় আইব কাইল।

চারদিকে খোঁজ করেও কোনো খবর পেলাম না। কুকুরের কান্না শুনে বুক কেঁপে কেঁপে ওঠে। ফজরের আজান হচ্ছে মসজিদে। কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করছে। কাকের কোলাহল শুনে জরিনা খালাকে জড়িয়ে কেঁদে উঠি।

তখনই বাবুলের ভাই আবুল মিস্ত্রি এসে বলে, শহীদ মিনারের পাশে এক মেয়ের লাশ পড়ে আছে। সাইকেলে ছুটে যায় বাবুল হন্তদন্ত হয়ে। ফিরে আসে খানিক পর।

মেয়ের রক্তমাখা শরীর চাদরে জাপটে ধরে বসে আছি। শহীদ মিনারের পেছন দিকে। আর কদিন পরই শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে এখানে হাজারো মানুষ ছুটে আসবে। কতটা নিরালা ছিল? এখানে শহীদদের আত্মার সামনে আমার মেয়েকে বিবস্ত্র করল কারা? আমার মেয়েকে মেরে ফেলল?

—কত আদরে বড় করলাম এইভাবে মরণের জন্য? ফুল বেচলাম। ফুলের মতো জীবন দিতে পারলাম কই? কে আমার এত বড় সব্বনাশ করল? আমার নয়নতারা জিগাইতো আমারে, মা এই বছর করোনা চলতাছে। মা মানুষ কি একুশে ফেব্রুয়ারি ফুল দিতে আসব না?

ফুল দিতে সবাই আসবে। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী সবাই। কিন্তু মা আমার, তুই আর ফুলের ডালা বানাবি নারে মা। আমি আমার রক্তমাখা ফুল নিয়ে শহীদ মিনারের বেদিতে দাঁড়িয়ে থাকি।

সাহিত্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন