default-image

হাওড়াগাছি গ্রামের এক হতদরিদ্র কৃষকের পাঁচ সন্তান। চার বোন, এক ভাই। বাবা করিম মিয়া ক্ষুদ্র কৃষক। অনেকটা গণি মিয়ার মতো। নিজের জমি নাই। অন্যের জমি চাষ করেন। তখন শুধু ওদের বড় বোন হাসির বিয়ে হয়েছে। মেজোর নাম শিল্পী, সেজো লিপি, আর সবার ছোট ফাহিমা। একমাত্র ভাই হাসির ছোট শিল্পীর বড়।

একদিন সকালে শজনে গাছের তলে নিমের ডাল দিয়ে দাঁতন করছিল বাবা। গাছে কয়টা কাক ‘কা কা’ করছিল। তখনই খুক খুক কাশি শুরু হলো। সব সময়ই কাশে। তবে সেদিন কাশতে কাশতে মুখ দিয়ে রক্ত উঠে আসে। কবিরাজের কাছে ছুটে গেল সোহেল। কবিরাজ কাকা বাবাকে ওষুধ দিল। কিন্তু বাবার কাশি কমে না। শ্বাসকষ্ট, আর কাশি নিয়ে ওদের বাবা করিম মিয়ার শরীর বিছানায় লেগে গেল।

এর ভেতর পাশের এক চাচার বাড়িতে ঢাকা থেকে মেহমান এসেছে। লিপি তখন আট-নয় বছরের। লিপি ওদের মেয়ের সঙ্গে খেলতে গিয়ে ভাব হয়ে গেল। ঢাকা থেকে আসা নাইয়ারা ওর মাকে বলে, ‘আম্মু আমরা লিপিকে নিয়ে যাই ঢাকায়।’

-ওর আব্বা-আম্মা দিলে নিয়ে যাই।

নাইয়ারার চাচা নিজে আগ্রহী হয়ে কথা বললেন লিপির বাবা-মার সঙ্গে। ‘খাওয়া দিতে পারতেছেন না যখন, তখন এই বাচ্চা যাক ঢাকায়। খেতে-পরতে পারবে।’ মন মানে না ওদের মা মারুফার। কিন্তু স্বামী অসুস্থ। কামাই করার মানুষ নাই। মুখে খাবার দিতে পারেন না। শেষে রাজি হয়ে গেলেন।

নাইয়ারার আব্বু-আম্মু আবার গার্মেন্টসের মালিক। তখন ঠিক হলো লিপির বড় ভাই সোহেল, আর বোন শিল্পীকে চাকরি দেবেন গার্মেন্টসে। নাইয়ারার আব্বুকে ওরা মামা, আর আম্মুকে মামি ডাকে। রফিক সাহেব ঢাকায় একটা প্রাইভেট ফার্মেও কাজ করেন। গার্মেন্টস মূলত মিসেস রফিকউদ্দিন দেখেন। তিনিই এমডি।

লিপির চেহারা সুন্দর। কোঁকড়ানো চুল। গায়ের রং ফরসা। চুল শিল্পী বেঁধে দিয়েছে। নাইয়ারার হলুদ রঙের জামা পরিয়ে দিয়েছেন মিসেস রফিক। সন্ধ্যার দিকে নাইয়ারাদের পাজেরো গাড়িতে করে ঢাকা চলে গেল লিপি। যাওয়ার বেলা বাবা-মা, ভাইবোন গলা জড়িয়ে কাঁদল খুব। লিপি বেশি কাঁদল না। ছোট মানুষ, আর ঢাকা শহরে যাচ্ছে। ভীষণ উত্তেজিত। গাড়িতে চড়ে যাচ্ছে। নাইয়ারাকে বন্ধু মনে হচ্ছে। ও ঠিক বিরহ-বেদনা বুঝল না। দুদিন পর ভাই, আর শিল্পী যাবে ঢাকা। তাই মনে কষ্ট রইল না। শুধু ছোট ফাহিমার জন্য মনটা খারাপ লাগল।

বগুড়ার পার হওয়ার পর হাইওয়ে ভিলায় রেস্ট এরিয়ায় থামল। সবাই নেমে বাথরুমে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নিল। রাত ভোর না হতেই ঢাকার বাসায় পৌঁছে গেলেন। ঢাকায় পৌঁছে ঘুমাল সবাই। বড় তিন বেডরুম, ড্রয়িং, ডাইনিং। খাওয়া-দাওয়ার পর ওকে বিশ্রাম করতে বললেন নাইয়ারার মা, মানে মামি।

পরদিন থেকে কাজ শুরু। ভোরে ওঠে। সে সময় বাবুর্চি টিফিন বানিয়ে দিলে, তা নাইয়ারার ব্যাগে দিয়ে দেয়। নাইয়ারা চলে যায় স্কুলে। আপুমনি নাইয়ারা স্কুলে চলে গেলে ও সব বিছানা ঘর ঝেড়ে পরিষ্কার করে। তারপর খেয়ে কাপড় ধুয়ে গোসল করে কাপড় ছাদে মেলে দেয়। দুপুরে ছাদ থেকে কাপড় এনে ভাঁজ করে রাখে।

শিল্পী আর সোহেল ঢাকা আসলে ওদের গার্মেন্টসে কাজ হলো। মাসে আট শ টাকা পায়। ঢাকায় চেনা কেউ না থাকায় গার্মেন্টসের কাছে এক খালার একটা ঘরে তিন শ টাকায় ভাড়া নিয়ে ওরা কাজ শুরু করল।

ছুটির দিনে ভাইয়ের আসার পথ চেয়ে থাকে লিপি। প্রতি শুক্রবার ভাই আসে। দুই ভাইবোন একসঙ্গে কিছু সময় বসে, গল্প করে। নাইয়ারা খুব ব্যস্ত। পড়া, গানের স্কুল, নাচের স্কুল। তবে এদের মমতাটা বোঝে লিপি। ওরা ভালোবাসে ওকে।

এর মধ্যে একবার আবার ঈদের ছুটিতে ভাই আর শিল্পীর সঙ্গে লিপিও বাড়ি গেল। বাবার শরীর ভালো না। যাওয়ার সময় নাইয়ারার আম্মু ওকে পাঁচ শ টাকা দিলেন। সঙ্গে বাবা-মা, ভাইবোন—সবার জন্য নতুন কাপড়। ওরা ঈদে অনেক আনন্দ করল। ঈদের পরপরই ওরা আবার ঢাকা এল।

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে গেল। নাইয়ারার আব্বু বিদেশে ট্রেনিংয়ে যাবেন। তখন ওর আম্মুর এক ভাইকে এনে রাখা হলো। রানা মামা নাইয়ারার সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করত। কিন্তু কেন যেন প্রথম দিন থেকেই লিপির তাকে ভালো লাগছিল না। একটু যেন কেমন-কেমন।

বিজ্ঞাপন

সেদিন মামি অফিসে যাচ্ছিলেন।

-লিপি ছাদের কাপড়গুলো এনে গুছিয়ে রেখে দিয়ো। আমি মামনিকে নাচের স্কুল থেকে নিয়ে ফিরব।

-জি মামি।

দরজা বন্ধ করে ও বাবুর্চি কাকার কাছে গিয়ে বলল,

-সবজি কাটতে হবে কাকা?

-না, একটু দরজাটা লাগিয়ে দাও আমি দোকানে যাব, আর আসব।

-আচ্ছা।

দরজা লাগিয়ে ঘুরতেই রানা মামা ডাকল,

-লিপি শোনো।

-জি?

-আমার খুব মাথা ব্যথা। মাথা টিপে দাও।

লিপি ভয়ে ভয়ে যেই মাথা টিপতে লাগল, তখনই রানা ওকে জড়িয়ে ধরল। ওর সদ্য ফোটা যৌবনের ওপর হামলে পড়ল। রানার বাহুর ভেতর থরথর করে কাঁপছে লিপি যখন, তখনই কলিং বেল বাজল।

-খবরদার কাউকে বলার চেষ্টা করলে তোকে লাশ বানিয়ে দেব। মনে থাকে যেন।

-না বলব না।

বাবুর্চি কাকা এল। লিপি বলল, ‘কাকা ছাদে কাপড় আনতে যাই।’

তারপর আর লিপি ফিরল না। সন্ধ্যা হয়ে গেল। বাবুর্চি শরিফ মিয়া ছাদে গেল। গিয়ে দেখে কাপড় ভাঁজ করে এক জায়গায় রেখে দেওয়া। এমন কখনো হয়নি। ‘লিপি, লি...পি’, ডাকে শরিফ মিয়া। শেষে দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করতে গেল নিচে।

-দারোয়ান ভাই লিপির ভাই এসেছে নাকি?

-নাহ।

-গেল কই মেয়েটা?

গাড়ি এসে ঢুকল। বাবুর্চিকে নিচে দেখে মিসেস রফিক জিজ্ঞেস করলেন

-কী ব্যাপার শরিফ মিয়া? নিচে কেন?

-আম্মা লিপি বাসায় নাই।

-কী বলেন? ছাদে দেখছেন?

-ছাদে হবে কাকা—বলে নাইয়ারা।

-ছাদেও নাই।

সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে এল। একটা-দুটো করে তারা ফুটে উঠল।

-লিপিকে পাওয়া যাচ্ছে না তুই দেখেছিস? ভাইকে জিজ্ঞেস করেন।

-আপা আমার খুব মাথাব্যথা তাই ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, রানা বলল।

বিজ্ঞাপন

থানায় জিডি করালেন মিসেস রফিক। পরদিন মাইকিং করালেন এলাকায়। শুক্রবারে লিপির ভাইবোন এল। নাইয়ারা খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দিল। বাসায় তালা দিয়ে বড় বোনের বাসা আগারগাঁও চলে গেলেন মিসেস রফিক।

‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড’ নামের একটা প্রোগ্রাম টিভিতে দেখেন খাইরুন্নাহার বেগম। তিনি লীনাকে খবর দিলেন গ্রামে, ওর শ্বশুরবাড়িতে। ঢাকা আসতে বললেন। লীনা তাদের দত্তক মেয়ে। লীনাকে যখন তিনি পেয়েছিলেন মীরপুর জার্মান টেকনিক্যালের পাশে, সে তখন শুধু কাঁদছিল। বহুদিন কথা বলত না মেয়েটি। নামও বলত না। তিনিই নাম রাখেন লীনা, নিজের মেয়ে লিমার সঙ্গে মিলিয়ে। বাসায় এনে নিজের মেয়ের সঙ্গে রেখে বড় করেছেন। বাবা-মা, ভাইবোনের কোনো ঠিকানা বলতে পারেনি। পরে ওদের নাম বলত।

লীনাকে বিয়ে দিয়েছেন নিজেদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের সঙ্গে। বাবুল মিয়া ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার; মালয়েশিয়া থাকে। আট বছরের ছেলে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে থাকে লীনা। শ্বশুর আছেন, শাশুড়ি নাই। বছরে একবার আসে বাবুল দেশে।

খাইরুন বেগমের মনে সব সময় কষ্ট হয়। বাচ্চা হারানোর পর সেই বাবা-মা নিশ্চয়ই অনেক কেঁদেছে। আহা রে। তাই তিনি লীনাকে ঢাকায় ডেকে এনে বললেন, ‘একবার চল চেষ্টা করে দেখি।’

-আচ্ছা। কিন্তু আম্মা উনি যদি রাগ করে।

-তাহলে ওকে জিজ্ঞেস করে দেখ।

ওরা মালয়েশিয়ায় কথা বলল। বাবুল বলল, ‘ঠিক আছে দেখ।’

‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড’ প্রোগ্রামে ফোন করে তথ্য দিলেন খায়রুন বেগম। পরিচালক লিপির তথ্যসহ একটা মর্মস্পর্শী ভিডিও তৈরি করলেন। আট-দশ বছরের মেয়ে ঢাকার মিরপুর এলাকায় ক্রন্দনরত অবস্থায় পেয়েছিলেন খায়রুন্নাহার বেগম। মেয়েটি জানায় তার বাড়ি হাওড়াগাছি। বাবার নাম করিম; এক ভাই, চার বোন। ২০০২ সালে তাকে তিনি পান। কিন্তু এই ঠিকানা সম্বল করে কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। ওই ভিডিওতে আহ্বান জানানো হয়—কোনো সহৃদয় ব্যক্তি এই মেয়েটির পরিবারের খোঁজ দিতে পারলে যোগাযোগ করুন।

বিজ্ঞাপন

এই ভিডিও প্রচার হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের এক ছাত্র প্রথম বিষয়টিকে সিরিয়াসলি নেয়। খোকন নামের ওই ছাত্র গুগলে সার্চ দিয়ে হাওড়াগাছি গ্রাম পায়নি। পরে গুগল নিউজ সার্চ দিয়ে ধুনট ও সারিয়াকান্দির বর্ডারে ছোট এক গ্রামের খোঁজ পায় এই নামে। তারপর ফোনে ওখানকার সাংবাদিক বড় ভাই শ্রাবণকে জানায়। শ্রাবণের এক চাচি ভিডিও দেখে জানায়, তার ছোট বোন ২০০২ সালে ঢাকায় হারিয়ে যায়। তারা তাকে আর খুঁজে পায়নি।

এই চাচিই হলো হাসি, মানে লিপির বড় বোন। তখন মেজো বোন শিল্পী, আর ভাই সোহেল জানায়, তাদের এক বোন ঢাকা মীরপুর থেকে হারিয়ে যায় ২০০২ সালে। এর পর এই অনুষ্ঠানের পরিচালক দুই পক্ষের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে প্রমাণাদি দেখে নিশ্চিত হন, লীনাই হলো করিম মিয়ার হারিয়ে যাওয়া মেয়ে লিপি। পরে অফিসে তিনি সবাইকে আমন্ত্রণ জানান।

নির্দিষ্ট দিনে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। লিপি তার পালক মা খায়রুন্নাহারের সঙ্গে এসেছে, যেখানে সোহেল, আর শিল্পী সবার আগে পৌঁছেছে। বাকহীন এক ঐশ্বরিক মুহূর্ত। বড় ভাইবোন বলে, কাঁসার থালায় লেগে নাক কেটে গিয়েছিল তাদের বোনের। কাটা দাগ, নাকে তিল ছিল; সব মিলে যায়। ভাইকে দেখে লিপি বলতে থাকে, ‘এই যে আমার ভাই। আমি দেখেই চিনছি। ভাই একবার জাম গাছ থেকে পড়ে গিয়েছিল পুকুরে। জ্ঞান ফিরে না।’ ‘ও ভাই, ও ভাই ...’, বলেই কাঁদতে থাকে হাপুস নয়নে।

শিল্পী আর সোহেল বলে, ঢাকার রাস্তায় সব সময় খুঁজে বেড়িয়েছে বোনকে। পায়নি। মা-বাবা দুজনেই পরের বছর ২০০৩ সালে মারা যান। খুব কাঁদত মা তার হারানো মেয়ের জন্য। ‘লিপি, লিপি রে ...’, বলে কাঁদে শিল্পী ও সোহেল। কাঁদছে সবাই। তবে এই কান্না তবু সুখের। মিলনের। হারিয়ে খুঁজে পাওয়ার।

মন্তব্য পড়ুন 0