রিটার্ন টিকিট

পশ্চিম ইউরোপে হেমন্তের রং ধূসর। গ্রীষ্মে যৌবনের টলটল সময়টা পেরিয়ে হাঁটি হাঁটি পা পা করে হেমন্ত এগিয়ে এসে গ্রাস করে এর সব রূপ ও রস দিয়ে। শুরুই হয় পাতা ঝরার মধ্যে দিয়ে। প্রথমে গাছের পাতায় যেন আগুন লাগে। এর পর পাতাগুলো ঝরে পড়তে থাকে। আস্তে আস্তে সব পাতা ঝরে পড়ে যায়। রাস্তা ফুটপাত সবকিছুই ঝরা পাতার স্তূপের নিচে ঢাকা পড়ে। এমনই এক পাতা ঝরা বিকেলে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল মলিন। তার মন খুব খারাপ। ব্যাংকের ম্যানেজারের সঙ্গে আজ তার মিটিং ছিল। সে ব্যাংকের কাছে কিছুদিনের জন্য কিছু টাকা চেয়েছিল। কিন্তু তাকে কোনো টাকাই দিল না ব্যাংক। টাকা যে দেবে না, সেটা সে আগে থেকেই জানত। কিন্তু কিছু দিনের জন্য দিতেই পারত। সে তো আর পাঁচ মিলিয়ন ক্রোনার বাড়ি নিয়ে ভাগছে না। এর পরও ব্যাংক কোনো সহযোগিতা করল না। খুবই দুঃখজনক।

মলিনের পক্ষে কিছুতেই আর সামলানো সম্ভব নয়। হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যাচ্ছে মলিন। এই রাস্তায় সে রোজই হাঁটে, তাই তত নজর না রাখলেও চলে। পার্কের পাশের এই জায়গাটা প্রায় জনশূন্য। একটু এগিয়ে যাওয়ার পর সামনে বাম দিকে তার দৃষ্টি পড়ল। একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। মলিন তার পাশে এলে সে মলিনের দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিল। মলিন কোনো দিন কাউকে এত সুন্দরভাবে হাসতে দেখেনি। সে হাসিতে যেন চারদিক উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।

বিজ্ঞাপন

–হ্যালো, কেমন আছ তুমি?

–আমি? এই তো আছি।

–দেখে তো মনে হচ্ছে তোমার মন খুব খারাপ! চিন্তা করো না, সব ঠিক হয়ে যাবে।

মলিন এতক্ষণে লোকটার দিকে ভালো করে তাকাল। মুখের হাসিটা ছাড়া লোকটার আর কিছুই লক্ষণীয় নয়।

–আচ্ছা, তুমি কী করে বুঝলে যে, আমার মন খারাপ। কীভাবে বুঝলে যে, সব ঠিক হয়ে যাবে?

–জানো, আমার খুব স্পেশাল পাওয়ার আছে। সব বুঝতে পারি। ভবিষ্যৎ দেখতে পাই।

হঠাৎ হাত বাড়িয়ে মলিন লোকটির হাত ধরে ফেলল।

–আমার সাথে চলো।

–কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?

–আগে চলোই না, পরে বলছি।

মলিন লোকটির হাত ছাড়ল না। ওকে নিয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা হাঁটিয়ে একটা মল–এ ঢুকল। স্টারবাকসের সামনে গিয়ে বললো—

–চলো কফি খেতে খেতে আলাপ করা যাবে।

–এখানে না, অন্য কোথাও বসব।

এবার সে তাকে নিয়ে মলের অন্য দিকে আরেকটা ছোট ক্যাফের সামনে দাঁড়িয়ে মলিনকে বলল—

–এসো এখানে বসি।

–স্টারবাকসের কফি তো এর চেয়ে ভালো হওয়ার কথা।

যুবক কিছু না বলে ওকে নিয়েই একটা টেবিলে বসল। এক মধ্যবয়সী মহিলা এসে তাদের সম্ভাষণ জানিয়ে জিজ্ঞেস করলেন—

–কী খাবে?

–তুমি তো মনে হয় কফি খাবে, তাই না?

–হ্যাঁ, তাই। আমাদের জন্য দু কাপ কফি নিয়ে এস।

মহিলা দু কাপ কফি ও কয়েকটি বিস্কিট এনে তাদের সামনে রাখলেন।

–বিস্কিটগুলো আমাদের তরফ থেকে শুভেচ্ছা, এর দাম দিতে হবে না।

–বাহ, চমৎকার তো। এত সুন্দর আপ্যায়নের জন্য তো তোমাদের কাফে ভর্তি থাকার কথা, কিন্তু একদম খালি যে?

–আমেরিকান স্টারবাকসের সঙ্গে যুদ্ধ করার মতো ক্ষমতা আমাদের নেই। তবে ডুবে যাচ্ছি বলে মনে দুঃখ নেই।

মহিলা তাদের টেবিল ছেড়ে ক্যাশ কাউন্টারের দিকে গেলেন। মলিন যুবকের দিকে তাকিয়ে ম্লান একটা হাসি দিল।

–আমার নাম রাজীব; সে হাত বাড়িয়ে দিল।

–আমি মলিন।

হাত মেলাল ওরা।

–আচ্ছা, কী করে বুঝলে যে, আমার মন খারাপ?

–তুমি বিরাট একটা সমস্যায় পড়েছ ও এ থেকে বেরিয়ে আসার কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছ না, তাই না?

বিজ্ঞাপন

–হ্যাঁ, আসলেই তাই। মাসখানেক আগে আমি অনলাইনে এদিক–সেদিক ঘুরছিলাম। এর মধ্যে আমার নজরে পড়ল একটা বাড়ি অকশন হচ্ছে। অকশনটা করছে সরকারি এক প্রতিষ্ঠান। আমি কৌতূহলি হয়ে বাড়িটা খুঁটিয়ে দেখালাম। চমৎকার বাড়ি, আরও চমৎকার হচ্ছে এলাকাটাও খুবই অভিজাত। আমিও নিলামে অংশ নিলাম ও বাড়িটা আমিই পেলাম। এমন একটা এলাকায় বাড়িটা পেয়ে তো আমি সাত রাজার ধন হাতে পেলাম। পরদিন নির্ধারিত একটা জামানত দেওয়ার পর ওরা আমাকে বাকি টাকা দিতে সর্বোচ্চ তিন মাসের সময় দিল। আমি পরদিনই চাবি সংগ্রহ করে বাড়িতে ঢুকে মাথায় হাত দিয়ে বসলাম। বাড়ির অবস্থা খুবই করুণ। সব খুলে খুলে পড়ছে। মেরামত না করে বিক্রিও সম্ভব নয়। আর মেরামত করতে গেলে অনেক টাকা লাগবে। আগাম টাকা না পেলে বিল্ডাররা কাজে হাতই দেবে না। ব্যাংকের কাছে গিয়েও মেরামতের জন্য কোনো টাকা পাইনি। এখন তার জামানত তো গেলই উল্টো আবার নিলামের খরচ ও লসটাও আমাকেই বহন করতে হবে। অথচ আমার কাছে কোনো টাকা নেই।

–এবার বল, কী করে আমার সমস্যার সমাধান হবে?

–তা তোমার বাড়িটা কোথায়?

–এই তো কাছেই, চল দেখাই।

এ সময় মহিলা এগিয়ে এসে তাদের বিদায় দিলেন। মলিন হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,

–আপনারা লাঞ্চ বিক্রি করেন তো?

–হ্যাঁ, অবশ্যই।

–কাল লাঞ্চে দেখা হবে, বন্ধুদের নিয়ে আসব।

মহিলা আপ্লূত হলেন। বাইরে আরও কিছুক্ষণ হেঁটে ওরা একটা অভিজাত এলাকায় এসে ঢুকল। এলাকার প্রায় শেষ মাথায় একটা চমৎকার বাড়ির সামনে এল তারা। মলিন যুবকটিকে নিয়ে ভেতরে ঢুকল। এত সুন্দর বাড়িটা কেমন যেন খুবলে খুবলে পড়ে যাচ্ছে। করুণ একটা দৃশ্য। রাজীব ঘুরে ঘুরে পুরো বাড়ি দেখল।

মলিনের কাছ থেকে ওর অ্যাকাউন্ট নম্বর নিয়ে সে সাড়ে তেরো মিলিয়ন ট্রান্সফার করে দিল। মলিন অনলাইনে তার অ্যাকাউন্ট চেকের পর দলিলে সই করে দিল। হাত মিলিয়ে লোকটি চাবি নিয়ে নিল এবং মলিন ও রাজীব বেরিয়ে গেল। দুজন পার্কে গিয়ে বসল।

–তা এখন কী করবে?

–কিছুই করার নেই। ওরা এসে বাড়ি নিয়ে যাবে।

–তোমার কত দিন সময় আছে?

–সম্ভবত তিন মাস শেষ হলেই ওরা এসে চাবি নেবে। আর বাকি টাকার জন্য মামলা করবে।

–একটা কাজ কর, চাবিটা আমার কাছে রাখ। এই তিন মাস আমি এখানে থাকি। অন্তত কিছু ভাড়া তো পাবে।

মলিন খিলখিল করে হেসে ওকে চাবিটা দিয়ে দিল।

–ঠিক আছে, থাকো না হয় কিছুদিন। তবে ভাড়া দিতে হবে না।

দুজন বেরিয়ে এল। আবার পার্কে ঢুকে হাঁটতে হাঁটতে মলিন জিজ্ঞেস করল—

–তুমি তো সুইডেনে এসেছ বেশিদিন হয়নি, তাই না?

–হ্যাঁ, মাত্রই এলাম। মূলত আমি মাল্টায় থাকি। সেখান থেকে সরে কোনো ইউরোপীয় দেশে সেটল করার ইচ্ছা আছে। আবার আমার বস যে মহিলা, তিনি আমাকে মাল্টাতেই রেখে দিতে চাইছেন। আসার সময় আমাকে একটা রিটার্ন টিকিট কিনে দিয়ে বলেছেন, কিছু করতে না পারলে যাতে ফিরে যাই।

–তা কোনো কাজ পেয়েছ কি?

–তেমন কিছুই পাইনি। এটা–সেটা করে কোনো রকমে দিন চলছে। মাল্টা ইইউভুক্ত হওয়ায় কাগজপত্রের কোনো সমস্যা নেই। তবে ভাষাটা সমস্যা। সুইডিশ না জানলে এখানে কোনো চাকরি পাওয়া যায় না।

–সেটা অবশ্য ঠিক।

দুজন টেলিফোন নম্বর বিনিময় করে নিজেদের রাস্তা ধরল। পরদিন সকালে রাজীব দুজন লোক সঙ্গে নিয়ে ওই বাড়িতে ঢুকল। তিনজন প্রতিটি রুম ঘুরে দেখল। রাজীব ওদের করণীয় বুঝিয়ে দিল। পরে তিনজনে কাজে লেগে পড়ল। তিন দিন লাগল প্রথম রুম সাফ করতে। এর পর রাজীব একটা গ্যারেজ থেকে একটা ট্রাক নিয়ে এল বাতিল জিনিস ফেলার জন্য। সব কাজ শেষ হলে একসঙ্গে পাওনা মিটিয়ে দেওয়া হবে। উইকেন্ডে সে আর মলিন দেখা করল। একটু ঘোরাঘুরি করে বাঙালি রেস্তরাঁয় রাতের খাবার খেয়ে নিল। মলিন বেশ ঝাল খেতে পারে দেখে রাজীব অবাক হলো।

–আমার সময়টা ভালোই কাটল রাজীব।

–আমারও তাই।

একটা হাগ দিয়ে আবার দুজন নিজেদের পথে চলে গেল। পরের সাপ্তাহে আরও দুটি রুম সাফ করল ওরা তিনজন। উইকেন্ডে আবার মলিনের সঙ্গে আড্ডা দিল রাজীব।

–জানো, পায়ে হেঁটে এগারোটা দেশ পার হয়ে আফ্রিকায় গেলাম। ইচ্ছা ছিল লিবিয়া থেকে সাগর পার হয়ে ইতালি যাব। কিন্তু হলো না। পুলিশের দৌড়ানি খেয়ে বোট মাল্টার এক সৈকতে থামল। মাল্টায় কিছুদিন থাকার পর এক মহিলা আমাকে কাজ দেন। তাঁর কাছে কয়েক বছর ছিলাম। তাঁর স্পনসরে আমি রেসিডেন্সসহ সব কাগজ পাই। এমন কি ড্রাইভিং লাইসেন্সও পেয়ে যাই। কিন্তু মাল্টায় আমার মন ভরেনি। আমি মূল ইউরোপীয় ভূখণ্ডে সেটল হতে চাই। তাই সুইডেনে চলে আসি।

–তা সুইডেনে কেন?

–বাহ, তুমি যে সুইডেনে থাক। এখানে না এলে তোমাকে কোথায় পেতাম?

মলিন কতক্ষণ চোখ দুটো বড় বড় করে তাকিয়ে থেকে এর পর হাসিতে ভেঙে পড়ল।

–সতিই তো, এটা তো ভেবে দেখিনি?

সেদিন শুধু হাগ নয়, মলিন ওকে ছোট একটা চুমু খেয়ে বলল—

–তুমি সুইডেন পছন্দ করার জন্য অনেক ধন্যবাদ, রাজীব।

–স্বাগতম,

রাজীবও মলিনকে চুমু খেয়ে নিজের রাস্তা ধরল। এই সাপ্তাহে বাড়িটা একদম পরিষ্কার করে সাফ করে সব ময়লা ফেলে এল ওরা। ভাঙার কাজ শেষ। এবার গড়ার পালা শুরু। ময়লা ফেলার পর রাজীব গ্যারেজের মালিককে নির্মাণ সরঞ্জামের কথা জিজ্ঞেস করল।

–তুমি কী কী চাও?

রাজীব তাকে আইডিয়া দিল।

–ওহ সেসব তো আমার গ্যারেজেই পড়ে আছে। সস্তা পেলেই কিনে রাখি। তোমার যা যা লাগে লিখে রেখে নিয়ে যাও। পরে একসঙ্গে বিল দিয়ে দিও। রাজীব একটা ট্রাকে একগাদা মাল নিয়ে ফিরল। পর দিন থেকে ওরা বাড়িটা নতুন করে গড়ায় হাত দিল। ওরা দিনে বারো–চৌদ্দো ঘণ্টা কাজ করে, আর সেখানেই ঘুমায়। এভাবে একটু একটু করে গড়ে চলল। ওর সঙ্গী দুজন এ কাজে দারুণ পারদর্শী। ইরাকে কনস্ট্রাকশনে কাজ করত বলে তাদের অভিজ্ঞতা অনেক। উইকেন্ডের আগেই পুরো বাড়িতে এক কোট রঙের কাজ শেষ করে ফেলল। গ্যারেজ থেকে দরকারি ইলেকট্রিক সরঞ্জাম খাতায় লিখে নিয়ে এল। উইকেন্ডে আবার মলিনের সঙ্গে দেখা, সিনেমা দেখা ও বাঙালি খাবার খাওয়া। সিনেমা দেখার সময় মলিন ওর হাতটা ধরে বসে থাকল। কোনো কথা হলো না। বিদায়ের সময় এবার আগেরবারের চেয়ে গভীরভাবে চুমু খেল ওরা।

বিজ্ঞাপন

এই সাপ্তাহে ফিনিশিংয়ে হাত দিল ওরা। প্রথমে ফিউজ, এর পর সুইচগুলো বসে গেল। দুই কোট করে রং পড়ল দেয়ালে। রুমের ছাদে বসল লাইট ও অন্যান্য ফিটিংস। বাড়ির ভেতরে ওয়াইফাইয়ের তিনটি রাউটার বসল। দামি কাঠের ফ্লোর বসল। বাথরুমের ফিটিংসগুলো বসে গেল। পাইপগুলো বদলে দেওয়া হলো। বাথটাবটা দারুণ, ইতালিয়ান মার্বেলে তৈরি। কল ও শাওয়ারের ফিটিংসগুলো গোল্ড প্লেটেড।

এবার তিনজন আলাপ করে ফাইনাল টাচ দেওয়া শুরু করল ওরা। জহুরি যেমন গয়না গড়ে, ঠিক তেমনভাবে তারা বাড়িটাকে গড়ে তুলল। বাড়ির কাজ শেষে পেছনের বাগান সাফ করল। এবার রাজীব একটা ক্যামেরা এনে বাড়ির বিভিন্ন দিক থেকে অনেক স্টিল ও ভিডিও শট নিল। একজন ইরাকি মিডিয়া এক্সপার্ট হওয়ায় সে এগুলো দিয়ে একটি ভিডিও তৈরি করল। দারুণ একটা কাজ শেষ হলো। সেই শুক্রবারে মলিনের সঙ্গে আবার ডিনার করল ও সোমবার ওর জন্য ফ্রি রাখতে বলল।

–যদিও আমার কাজ আছে, তবে আমাকে অফিসে না গেলেও চলবে। তা কোথায় দেখা করব?

–তুমি সেই ক্যাফেতে চলে এসো। সেখানেই দেখা হবে।

এবারের চুমুটা আরও দীর্ঘ হলো। মলিন যেন ওকে ছাড়তে চাইছিল না। সোমবার সেই ক্যাফেতে এসে রাজীব অবাক। বসার জায়গাই নেই। ওকে দেখে মহিলা দৌড়ে এলেন।

–মলিন ফোন করেছিল, তোমাদের জন্য টেবিল বুক করা আছে।

–তা এত ভিড় কী করে হলো?

–মলিন কয়েকটা অফিসে বলে দিয়েছে। আর ওর অফিসের লোকজন তো আছেই। ওরা এসেছিল আর আমাদের খাবার ওদের খুব পছন্দ হয়েছে।

একটু পর মলিন এসে হাজির। রাজীব দাঁড়িয়ে ওকে চুমু খেয়ে এনে পাশে বসাল।

–তুমি একটা দারুণ কাজ করেছ, মলিন। এদের এখানে ভিড় দেখে আমার খুব ভালো লাগছে।

–এটা তো তোমার কাছ থেকেই শিখেছি। এভাবেই করপোরেট সাম্রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে, আর জিততে হবে। বল এবার কী বলবে?

–কিছু বলব না, দেখাব। তবে আগে কিছু খেয়ে নিই।

কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এক মহিলা তিন প্লেট খাবার ও দুই মগ কফি এনে ওদের টেবিলে রাখলেন। খাবার শেষে বিল দিয়ে বেরিয়ে এল ওরা।

–আচ্ছা আমরা কোথায় যাচ্ছি?

–আমার বাসায়।

মলিনের মনে পড়ল যে রাজীব ওর বাড়িতেই থাকে, ও ভুলেই গিয়েছিল। মনে মনে হিসাব করে দেখল যে, আর এক মাস পর বাড়িটা ওরা নিয়ে নেবে। ওই বাড়িতে যাওয়ার কোনো ইচ্ছেই ওর ছিল না। তবুও সে রাজীবের হাত ধরে সেদিকে রওনা দিল। বাড়ির সামনে এসে রাজীব বাড়ির চাবিটা ওর হাতে দিয়ে খুলতে বলল। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে মলিনের যেন দম বন্ধ হয়ে এল।

–এ কী! এসব কী?

সে রাজীবের দিকে তাকিয়ে ফোঁপাতে শুরু করল। রাজীব ওকে বাড়ির সব রুম দেখাল। বাথরুম দেখে মলিনের চোখে বন্যা ছুটল।

–এসব কে করেছে, তুমি?

–শুধু আমি না, আরও মানুষ ছিল।

–এ যে অনবদ্য কাজ। শহরের শ্রেষ্ঠ বাড়িগুলোর একটা হয়ে উঠেছে এটা।

–হ্যাঁ, এবার বেচার পালা, আর তোমার ঋণ শোধের পালা। তা তোমার ঋণ কত?

–সব মিলিয়ে প্রায় ছয় মিলিয়নের মত হবে।

–এ বাড়ি বেচে টাকা উঠবে না?

–ওঠার তো কথা। আরও অনেক বেশি হলে অবাক হব না।

–চল, একটা প্ল্যান করি। তোমার কোনো জার্নালিস্ট বন্ধু আছে?

–তা আছে, কী করতে হবে?

রাজীব তাকে সব বুঝিয়ে দিল ও ভিডিও ক্লিপটা ওর হাতে ধরিয়ে দিল। তারপর ওকে বুকে টেনে নিয়ে বলল—

–বলেছিলাম না, সব ঠিক হয়ে যাবে?

মলিন বেরিয়ে গেল, তার জার্নালিস্ট বন্ধুকে ফোন করতে করতে। পর দিন ইউটিউবে ভিডিওটা আপলোড করা হলো ও বিকেলের মধ্যে ৯০ হাজার ভিউ হিট করল। একই সঙ্গে সেদিন সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকায় বাড়িটা নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ায় হুলুস্থুল পড়ে গেল—কত হতে পারে এর দাম। রাজীবের ইশারায় মলিন চুপ করে থাকল। এর পর দিন মলিন রাজীবকে বলল যে সুইডেনের সবচেয়ে নামকরা ফার্ম বাড়িটা বিক্রি করতে চায়। মলিনের কথামতো ওরা রাজীবের সঙ্গে বসতে চায়। রাজীব ওদের অফিসে বসতে রাজি হলো না; বরং সেই বাড়িতেই দেখা করতে বলল।

একটা হারামি টাইপের লোক এসে এমনভাবে রাজীবের সঙ্গে হাত মেলাল যেন ওরা অনেক দিনের বন্ধু।

–আমি বাড়ীটা বিক্রি করে দেব। আর পাঁচ মিলিয়নের ওপরে যা পাই, তা আমরা ফিফটি–ফিফটি ভাগ করে নেব, খুবই সিম্পল।

–আমরা তোমাকে বাড়ি বেচতে বলছি না। তবে তুমি কোনো গ্রাহক পেলে, আর ভালো দাম পেলে আমরা তোমার কাছে বেচতে পারি। তোমাকে তার কাছ থেকেই কমিশন নিতে হবে। আমাদের কাছ থেকে কিছুই পাবে না। আমি সকালেই একটা মিটিং করেছি। বিক্রি প্রায় হয়ে গেছে বলে ধরে নিতে পার।

এ কথায় লোকটি থতমত খেয়ে গেল।

–তার মানে তোমার কোনো ভালো খদ্দের নেই। তা উঠছি আমি।

রাজীব উঠে দাঁড়াল, সঙ্গে মলিন।

–আরে এত তাড়াহুড়ার কী আছে? মাত্রই তো এলাম।

–অবশ্যই তাড়াহুড়া আছে, অন্য পার্টিকে আমার কনফার্ম করতে হবে।

–তা তারা কত অফার করেছে?

–সেটা তোমাকে কেন বলব, ব্যাপারটা অনৈতিক হয়ে যাবে না?

লোকটা চুপসে গিয়ে বলল, আমাকে পাঁচ মিনিট সময় দাও।

–ঠিক আছে, আমি তোমাকে পনেরো মিনিট সময় দিলাম। এর পর অন্য পার্টিকে এসএমএস করে কনফার্ম করে দেব।

লোকটি দরজা খুলে বাইরে চলে গেল।

–অন্য পার্টি কত অফার করেছে, রাজীব?

–কোন অন্য পার্টি?

মলিনের দিকে সহাস্যে তাকাল সে। মলিন চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল—

–লোকটাকে ব্লাফ দিচ্ছ?

–না, তবে ও আমাকে ব্লাফ দেওয়ার চেষ্টা করছে।

ঠিক তেরো মিনিটের মাথায় লোকটা ঘামতে ঘামতে এসে ঢুকল।

–আমি ১১ মিলিয়নের বেশি ওঠাতে পারিনি, স্যরি।

–ঠিক আছে, আমিও দুঃখিত। তোমার সঙ্গে ব্যাবসা হলো না।

রাজীব তার ফোন হাতে নিয়ে মেসেজ লেখা শুরু করল।

–শোনো, আমি হয়তো সাড়ে এগারো পর্যন্ত তুলতে পারব। এর বেশি নয়।

–আমার ম্যাসেজ লেখা শেষ, সেন্ড করে দিচ্ছি।

–দাঁড়াও, দাঁড়াও। ম্যাসেজ সেন্ড করো না, এক মিনিট।

এবার সে একটা ম্যাসেজ পাঠাল ও সঙ্গে সঙ্গে উত্তর পেল।

–আমরা বারো পর্যন্ত উঠতে পারি, এর বেশি নয়।

–আমি তো তের মিলিয়ন অফার পেয়েই বসে আছি, এক মিলিয়ন কমে কেন বেচব?

–ঠিক আছে, আমরা সাড়ে তের দিচ্ছি। এর বেশি সম্ভব নয়।

–ওকে এই মুহূর্তে পাঁচ মিলিয়ন ট্রান্সফার করে দাও। বাকিটা বিকেল নাগাদ দিয়ে দলিলে সই করিয়ে নিয়ে যেও।

–তা লাগবে না, আমি সাড়ে তের মিলিয়নের ডকুমেন্ট রেডি করেই এনেছিলাম। টাকা এখনই দিয়ে দিচ্ছি।

–তুমি কি করে বুঝেছ যে আমরা সাড়ে তেরোতে রাজি হব?

–এটা আন্দাজ করা এমন কঠিন কিছু ছিল না। এটাই এর বাজার দর। এর কমে ছাড়বে কেন?

মলিনের কাছ থেকে ওর অ্যাকাউন্ট নম্বর নিয়ে সে সাড়ে তেরো মিলিয়ন ট্রান্সফার করে দিল। মলিন অনলাইনে তার অ্যাকাউন্ট চেকের পর দলিলে সই করে দিল। হাত মিলিয়ে লোকটি চাবি নিয়ে নিল এবং মলিন ও রাজীব বেরিয়ে গেল। দুজন পার্কে গিয়ে বসল।

–এবার কী?

মলিন প্রশ্ন রাখল।

–এবার সব গুটিয়ে আনার পালা। মালের দাম, মানুষের বেতন, সব পেমেন্ট করতে হবে। তবে এই মুহূর্তে এসব আলাপ নয়। সেসব নিয়ে কাল কাজ শুরু করব।

–তা আমার রিটার্ন টিকিটের মেয়াদ তো শেষের দিকে এসে গেছে।

–কই দেখি?

রাজীব জ্যাকেটের পকেট থেকে টিকিট বের করল। মলিন টিকিটটা ভালো করে দেখে বলল—

–এই যে এর সময় তো পেরিয়ে গেছে।

রিটার্ন টিকিটটা ছিঁড়ে কুটি কুটি করে ওপরের দিকে ছুড়ে মারল মলিন।

–আরে আরে কী করলে? আরও একমাস সময় বাকি ছিল।

–তোমার চশমা কেনা উচিত।

–তোমার আরেকটা ভাঙা বাড়ি কেনা উচিত। এখানে থাকতে হলে আমাকে রোজগার করে খেতে হবে।

–সেটা দেখা যাবে, আপাতত আমার বাড়িতে উঠতে পারো।

–বাঙালি ছেলে ঘরজামাই হব?

রাজীব গুনগুন করে গেয়ে উঠল—

‘কোনো দিন বলাকারা অত দূরে যেত কি

ওই আকাশ না ডাকলে’

–এর মানে কী?

–মানে বোঝানোর জন্য সারাটা জীবন সামনে পড়ে আছে, সোনা।

মন্তব্য পড়ুন 0