default-image

কবি রওশন হাসান নব্বই দশকের প্রত্যয়দীপ্ত কবি। সময়ের অনিবার্য ক্ষরণ, অরণ্যঘেরা অন্ধকারের বহুরৈখিক শব্দরূপ তার কবিতার আলোক লোক। তিনি কবিতায় স্বভাব ভঙ্গিমায় অঙ্কন করেন বেদনার স্ফূর্তি, অনুভূতির আনন্দমুখ। তার কবিতায় জীবনের আদিগন্ত মনস্তাত্ত্বিক অচলায়তন কল্পচিত্রের বিভায় বাঙ্গময় হয়ে ওঠে। হৃদয় ঘনিষ্ঠ কাব্যভাষা আর জীবনবাদী চেতনায় নিসর্গবোধ তার কবিতাকে দিয়েছে বৈশিষ্ট্যের ব্যঞ্জনা। এ কবির কাব্য-ক্যানভাসের বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে বিরহ কাতরতা, বিষণ্নতার বাষ্প প্রদাহ। তবু কবি আশাবাদের হাত ধরে ‘আগামীকে মুষ্টিবদ্ধ করে’ এগিয়ে চলেন মুক্তির অন্বেষায়।

কবি ও তার সময় সতীর্থরা এমনি প্রত্যয়ে উচ্চকণ্ঠ। ‘অভ্যুদয়’ কবিতায় সেই চিত্রকল্পের এক অনন্য প্রসারণ পাঠকমনকে আন্দোলিত করে—

‘আমি হেঁটে চলেছি আগামীকে মুষ্টিবদ্ধ করে/আমার শপথগুলো আমাকে ভেদ করে চলে/ভেদ করে অজাত অন্ধকার নিঃসীম নির্জনতায়/আমি ও সিসিফাস বয়ে নিয়ে চলেছি ওজন প্রস্তর/আমাদের আসন্ন অভ্যুদয় আকাশ ও পৃথিবীর জন্য/আমাদের জানা নেই পদচিহ্নের কৌশল, দূরত্বের মহিমা/কিছু অন্তর্বর্তী মেঘ ও বাষ্প প্রদাহ আমাদের সাগ্রহ-সঙ্গী/ছত্রে ছত্রে আর্দ্র হাওয়ার বিষণ্ন প্রকোপ/আমরা পরমায়ু ও স্পর্ধার পাঁজরে ক্রুশবিদ্ধ যিশু/প্রহর ব্যগ্র অনামী ভবিষ্যতের দিকে/...ঠোঁট থেকে মুহূর্ত বৃষ্টি-চুম্বনের মতো আঁকড়ে ধরে/মৌসুমের নিষ্ক্রমণ/কল্পনায় জেগে ওঠা নিস্তব্ধ অরণ্যে/জীবন্ত কোনো অস্তিত্ব ও ঘড়ির একাকিত্বে/কাগজের শূন্য পাতায় যেমন নড়ে ওঠে টেড হিউজের আঙুল।’

কবিতাটিতে চমৎকার উপমা সৌন্দর্য ও প্রতীকী আবহ আদ্যোপান্ত এটাকে অনবদ্য ও উত্তীর্ণ করে তুলেছে। সম্ভবত এটি কবির একটি সফল সৃষ্টি।

আধুনিক বাংলা কবিতায় নব্বইয়ের দশক ভিন্নতায় প্রভাব বিস্তারকারী। স্বাধীনতাত্তোর প্রাপ্তি-বঞ্চনার দ্বান্দ্বিক জাঁতাকল, দীর্ঘ স্বৈরতান্ত্রিক একঘেয়েমি প্রহরান্তে গণতান্ত্রিক ও আদর্শিক শুদ্ধাচার-চিন্তার উন্মেষ লক্ষ্য করা যায়। কিছু কবির কবিতায় উঠে আসে ধারালো তারুণ্যের আলোকচ্ছটা। প্রজন্মের চোখ থেকে যেন ঠিকরে পড়ে মুক্তি ব্যাকুল সূর্যরশ্মি। তারুণ্যের বুকে-পিঠে-কলমে উচ্চকিত হয় অধিকারের স্লোগান, ভণিতার ঘোরভাঙ্গা দৃপ্ত শব্দ ভঙ্গি। কবি রওশন হাসানের কবিতায়ও এ যুগ যন্ত্রণার রেখাপাত বিচিত্র ক্যানভাসে স্বরূপতা লাভ করে।

প্রকৃতি সখ্য উচ্চারণে কবি যখন নিবিড়ভাবে জীবনকে অবলোকন করেন, তখন চিরচেনা মাটির সোঁদা গন্ধ, স্বদেশের বেদনা মুখ জলে প্রতিবিম্বিত ঢেউ চিত্রের মতো ভেসে ওঠে—

‘বৃষ্টি মাতম শৈশব, পাখিদের শিস কলরব/মটরফুল, হরিৎ শস্য, পলাশের লাল/ছায়াঘেরা কৃষ্ণচূড়া, জারুল, শিমুল-শিউলি, বাতাবির সৌরভ/সবুজ মেহেদি পাতায় কমলার উৎসব, হাসনাহেনার গৌরব/স্রোতস্বিনী শরৎ-পরিযায়ী মেঘ মৃদঙ্গ/...গেরুয়া বসন্ত-সংলাপ পল্লবী মাতৃভূমি/...মায়ের মায়াময়ী বিপদবারণ/লক্ষ্য প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা, সবুজে লাল পতাকা/শহীদ মিনার থেকে সৌধ, রাষ্ট্র, সংবিধান/জন্মভূমি বাংলা আমার তোমাকে প্রদক্ষিণ করি।’

বিজ্ঞাপন

(তোমাকে প্রদক্ষিণ করি)

কবি ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষার্থী ও একই সঙ্গে বোদ্ধা হওয়ার সুবাদে বিশ্বসাহিত্যের নন্দনকাননে বিচরণ করেন অনায়াসলব্ধতায়। তুলে আনেন সাহিত্য নির্যাস—

‘কালোত্তীর্ণ ঝড়োবিষাদ ঝাপটে ধরে মস্তিস্কক্ষরণ/দৈবাৎ নিভে যায় মুমূর্ষু ক্যান্ডেল/গোলার্ধের সব কবিদের দ্ব্যর্থহীন সমাবেশ/ওডস্, এলিজি, বিদ্রোহ, প্রেমের উন্মেষ/সলিলোকি, মনোলোগ সন্ন্যাস ধমনিতে জেগে উঠে উত্তাল/কমপ্লেক্স, সহজিয়া, দেহি-বিদেহী পরিজন/চেতন-অবচেতনে নিকটবর্তী হও তুমি বোধিপ্রিয় কবি সমুদয়/তোমাকে প্রদক্ষিণ করি।’ (তোমাকে প্রদক্ষিণ করি)

মালার্মে বলেছেন, শব্দই কবিতা বা শব্দেই কবিতা নিহিত। একজন পরিণত কবির প্রতিটি শব্দই যেন এক-একটি কবিতা, অখণ্ড উপাখ্যান। কখনো-বা প্রতিটি শব্দে লতাগুল্মের মতো জড়িয়ে থাকে বেদনা-আনন্দ-অভিজ্ঞান-অনুভূতির স্থির চিত্রকল্প। কবি রওশন হাসানের কবিতায় এই কাব্যচারিত্র আপন ঔজ্জ্বল্যে সরব। ‘কাঙ্ক্ষার প্রাচীর’ কবিতায়—

‘এই নির্লিপ্ত গুন্ঠন নীল জানে, কী সান্দ্র নিঃসঙ্গতা!/আঙুলের আসঙ্গ স্পর্শের ইশারা; হৃদয়ের মৃদু কম্পন/চলে যাওয়া এক অপরূপ প্রতিশ্রুতি ফিরাই কি করে!/কী মিথ্যে কেঁপে ওঠে, অনুভবের বৈভব;/বাইরে কাঙ্ক্ষার কুয়াশা–ভেতরে জলের বুদ্বুদ/এই সব ঘোরের ভোরে ছন্নছাড়া বাতাসে কেবল দ্বিধার রং/কেউ কেউ এই স্থিতিকালকে সভ্যতার কান্না বলে আখ্যায়িত করে l’

জীবনানন্দ দাসের ভাষায়—‘উপমাই কবিতা নয়, উপমাতেই কবিত্ব’। রওশন হাসান এ কাব্য কুশলতা ধারণ করেছেন সাগ্রহ-সচেতনতায়—

‘আকাশ ও আমার মুখোমুখি আসা/আমাদের উত্থানের নীরব প্রাচীর।/সবুজের ধীর প্রস্থান–হলুদ ঝরার বাহু লগ্নকাল’ (কাঙ্ক্ষার প্রাচীর)

কবি রওশন হাসানের প্রবাসের যাপিতজীবন কবিতাকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা। নিউইয়র্কের উত্তাল সমুদ্র হাওয়া, হিম তুষারের সফেদ আচ্ছাদন, কঠিন বৈরিতায় স্থবির সময়ের ট্রেন কবিকে করেছে আরও বেশি জীবনঘনিষ্ঠ। নিয়ে গেছে নৈসর্গের ‘সাইলেন্ট’ জোনে। তিনি এখানে প্রেমে-দ্রোহে-নৈসর্গচারিতায় কবি হুইটম্যানকে প্রত্যক্ষ করেন গভীরভাবে—

কিছু বৃষ্টিফোঁটা, কিছু থমথমে মেঘ আনাগোনা/কিছু আবদ্ধ জল, কিছু থমকে যাওয়া সময়/বিবর্ণ কিছু লতা, কিছু স্মৃতি, কিছু উত্তাপ/কিছু বোঝাবুঝি, কিছু বিশ্বাস, কিছু ভগ্ন পরিচয়/হাওয়ার ঝাপটা মানে না বারণ বোধাতীত/...কেনো বৈরী আকাশ খোঁজে ওম রোদহীন কিনারহীন/...কতটা বদলে গেছে হুইটম্যানের সাইলেন্ট সান্ মিসিসিপির মালভূমি/ক্লোভার ও টিমোথির শস্যভূমি অন্তহীন/...অভিলাষী অন্তর্বর্তী চোখে যে প্রেমের জোয়ার/কতটা দ্বিধার দেয়ালে বাধা পড়ে হারিয়েছে অবেলায়/’ (অন্তুহীন সাইলেন্স)

প্রকৃতির এত নৈকট্য কিংবা গেরস্থালি শেকড়ের টানও কবি হৃদয়ের হাহাকারকে শান্তির আবেশে স্বস্তির উপত্যকায় এতটুকু স্থিত করতে পারে না। কবি খোঁজেন ভিন্ন পূর্ণতায় আত্মার স্ফূর্তি। অনুভব করেন পরম সত্যের উন্মেষ, জরাহীন মলিনতাহীন আধ্যাত্মিক উপলব্ধিতে প্রাজ্ঞ হয়ে ওঠেন। ‘অন্তহীন সাইলেন্স’ কবিতায়—

‘গ্রামীণ গার্হস্থ্য জীবন, স্বতঃস্ফূর্ত গানগুলি কি দিয়েছে স্বস্তি?/নির্বাক প্রকৃতিতে খোঁজে ফেরা এক অবিচ্ছেদ্য আধ্যাত্মিক নির্মলতা!/হলদে পাতাদের জড়সড় পতনোন্মুখ অন্বেষণে/আজও স্বপ্ন-চৈতন্যের ডানায় কবিতা-অরণ্য/সংকটের করিডরে এখনো দাঁড়িয়ে বিষণ্ন বিশ।’

বৈশ্বিক মহামারি করোনা ক্রাইসিস কবিমনকে উদ্বেগে বিহ্বল করে—

একঘেয়ে বাড়ির দেয়াল, মূর্চ্ছাবিহ্বল বইয়ের স্তূপ/উদাস ঝরে নির্জনতা, আপোষী তৃষ্ণার ক্ষয়/...গভীর কৌতূহলে ফোটে টিউলিপ ড্যাফোডিল/...দিগন্তে মিলিয়ে যাওয়া সূর্য রেখা/শ্বাস ফুরাবার আগে অশান্ত ছুটে যেতে চাই, ছুটে যেতে চাই।’ (বোধিদিরালার সংলাপ)

কবি রওশন হাসানের কবিতায় কালের দহন, বেদনার বিস্ফার, পোড়া প্রতিবেশ, আত্মার বিষাদ অপূর্ব বয়ান ভঙ্গিতে উঠে এসেছে—

এই উতলা মৌসুম, রোদ-বৃষ্টির অনন্ত বিশ্বলোক/কুসুমিত রাত্রির আপসে নিষ্ক্রান্ত আলোক/...দ্যাখোনি দমক প্রবণ কবির চন্দ্রাহত চোখ?/

অগ্নি, সুষমায় পোড়ে স্বত্ব যোগাযোগ/...দ্যাখোনি অবসন্ন মাটির দৈন্য পুলক/দীর্ণ চোখে সহে পৃথিবীর ভার, পেষণ পদপাত।’

কবি রওশন হাসান ইতিমধ্যে নিজস্ব কাব্য ভঙ্গির ক্যানভাস তৈরি করেছেন। উপস্থাপনশৈলী, কল্পচিত্র, শব্দচয়নে পারঙ্গমতা ও পরিশীলিত ভাবনার উন্মেষে কাব্য বোদ্ধাদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছেন। কবিতার পাশাপাশি অনুবাদকর্মে (ইংরেজি কবিতা) তার প্রতিভাদীপ্ত পদচারণা সমঝদার পাঠককে আকৃষ্ট ও প্রাণিত করে। কলাম লেখায়ও তার সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। প্রবাসের ব্যস্ত সময়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্রিকা, লিটল ম্যাগ ও ব্লগে নিয়মিত লিখে যাচ্ছেন।

রওশন হাসানের প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ—স্বপ্নের অভিলাষে, নন্দিত সায়রে, মেঘ তুমি কত দূরে, অনুভবে অনুক্ষণ, সবুজ ঘাসের পৃথিবী, জলের রং বদলে যায়, বাতাসে দ্রোহের সংকেত ভেসে আসে, অনূদিত বর্ণমালা, Over The Horizon. গন্তব্য পথ ও কিছু সঙ্গী, হৃদয় জমিনে বৈরী বসন্ত, তোমাকে প্রদক্ষিণ করি, Midnight’s monologue. প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ এবং অপরাহ্ণ (উপন্যাস), নয়ন সমুখে তুমি নাই (স্মৃতিকথা), Wednesday mourning.

সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতিস্বরূপ লাভ করেছেন বাসাপ বর্ণবিন্যাস সাহিত্য সম্মাননা ২০১৭ এবং বেগম লুৎফুন্নেছা আব্বাস ভাষা ও সাহিত্য সম্মাননা ২০১৯।

নিউইয়র্কে বসবাসরত রওশন হাসান প্রবাসের কঠিন জীবনসংগ্রামের মধ্যেও সাহিত্যচর্চায় নিজেকে নিমগ্ন রেখেছেন অন্তর্গত সৃষ্টির টানে। স্বকীয় ভাষা-সাহিত্য ও স্বদেশের প্রতি দায়বদ্ধতা তার এ অনুরাগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কবি রওশন হাসানের সাহিত্য ও কাব্যসাধনায় পথচলা নিরন্তর হোক, সৃষ্টির বেলাভূমিতে তার পদচ্ছাপ হোক আরও প্রখর, ঋদ্ধ হোক কলম জীবনবাদী উচ্চারণে—এ প্রত্যাশা।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0