default-image

পাখির কিচিরমিচির শব্দের সঙ্গে ঘুম ভাঙল। এই বাড়িটির চারদিকে ম্যাপল, চেরি আর উইলো গাছ। একটা আপেল গাছও আছে। আর আছে গেটের পাশে দুই দিকে দুটি ম্যাগনোলিয়া।

নানা রঙের পাখিরা দিনভর কিচিরমিচির করে। ডোনা একটা হামিংবার্ডের হানি ফ্লাওয়ার মোটিফ বার্ডনেস্ট আপেলের নিচু ডালে রেখে দিয়েছেন। সেটিতে পানি ও মধু দেওয়া হয় নিয়ম করে। হামিংবার্ড আসে। কখনো একা, কখনো দুটি কখনো ছানাপোনাসহ। পাখি নিয়ে কারবার বেশ জমে। ব্রেডের ক্রাঞ্চি সাইডগুলো বাটিতে করে নিয়ে বাইরের চেয়ারে বসে কখনো ছড়িয়ে দেন। রেড কার্নিড্যাল আর নীলঝুটি কাকাতুয়া আসে। আসে চড়ুইয়ের ঝাঁক। বাদামি শালিকের ঝাঁক। আর ঘুঘু। রোদের আঁচে পিঠ পেতে বসে রোদ পোহানোর জন্য দুটি দোলনা চেয়ার পাতা আছে ডেকের ওপরে। আঁজলা ভরে রোদ তুলতে পারেন এখানটায় বসে। আর টবে আছে গুটিকয়েক টমেটো আর ক্যাপসিকাম গাছ। লাল–সবুজ দুই রকমের। এগপ্ল্যান্ট গাছ আছে। ছোট ছোট হালকা বেগুনি ফুল ফুটেছে। কদিন হলো চেরি গাছে গোলাপি সাদা ফুলে ছেয়ে গেছে।

শরীর ভালো যাচ্ছিল না ডোনা পেলসির। করোনা নামের ভাইরাসের উৎপাত শুরু হলো গেল বছর। গত বছর চেরি ব্লসমের সময়ই যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ও ক্যালিফোর্নিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেল বহু মানুষ। দুই ডাক্তার ছেলের একজন ডেভিড তখন নিউইয়র্কের হাসপাতালে কর্মরত। টেলিফোনে মাকে কতটুকু সাবধানতা অবলম্বন করে চলছেন প্রতিদিন জানান। ডোনা কী খাবে, কীভাবে চলবে সব চার্ট করে পাঠিয়ে দেন বড় ছেলে রজার্স। মেয়ে লিডিয়া তার শহর শার্লটে থাকে। সে সব সময় খোঁজ রাখে। আর ছোট ছেলে পিটার খুব মা ভক্ত। মায়ের পছন্দের কর্নার প্লটের বাড়িটা কিনে নিয়ে একই ব্লকে থাকে। প্রতিদিন মাকে দেখে যায় একবার।

ডিয়ানা পেলোসি আজ চলে গেলেন। বাবা–মা নিক নেম বা ডাক নাম রেখেছিলেন ডোনা। ডোনার জন্ম অস্ট্রিয়ার এক শহরে। ডোনারা তিন বোন। ডোনা নর্থ ক্যারোলাইনার শিক্ষা বিভাগে কাজ করেছেন দীর্ঘ প্রায় পনেরো বছর। এখন অবসরে। প্রায় পঁচাশি বছর বয়স তার। জীবন গুটি গুটি পায়ে কখন যে শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে! আটত্রিশ বছর বয়স থেকে একা হয়ে গেলেন। তিন ছেলে আর মেয়ে সবাইকে নিয়ে টেনে গেলেন জীবনের বাকি পথ। কখনো কোনো অভিযোগ বা অনুযোগ ছিল না। আরিয়ানের মৃত্যুর পরও ভেঙে পড়তে দেখেনি কেউ তাকে। আরিয়ানের হাসিমাখা মুখের ছবি তার সব ঘরে। সর্বত্র। ভালোবাসায় ছিল ভরপুর।

বিজ্ঞাপন

ডিয়ানা পেলোসি ডোনার বাবা তখন অস্ট্রিয়ায়। সেখানেই কলেজে পড়তেন ডোনা। ডোনার বিয়ে হলো সুইস ব্যাংক কর্মকর্তা আরিয়ানের সঙ্গে। তিনি তখন ২৫ বা ২৬ বছরের তরুণী। তার বাবার সঙ্গে সুইজারল্যান্ড, প্যারিস, আয়ারল্যান্ড ঘুরে অস্ট্রিয়ার হলস্ট্যাটে ছিলেন তখন। এক কনসার্টে যোগ দিতে সুইজারল্যান্ডের জুরিখ যান। সেখানে পরিচয় হয় আরিয়ানের সঙ্গে। ভালো লাগে দুজনের দুজনকে। অল্পদিনের মধ্যে বিয়ে করেন তারা। বিয়ের পর আরিয়ান ক্যালিফোর্নিয়া চলে আসেন ব্যাংকের চাকরি নিয়ে। তিনিও এর কিছু পরে স্বামীর সঙ্গে এ দেশে এসে বসতি শুরু করেন।

বিয়ের পর প্রথম বাচ্চা জন্মানোর আগে আগে ক্যালিফোর্নিয়া চলে আসেন ডোনা। ক্যালিফোর্নিয়ার স্যানজোস শহর। বেশ সুন্দর শহরটি। সমুদ্রের কাছাকাছি একটি বাড়িতে থাকেন। সকালে আরিয়ান অফিসে যান। ডোনা সাইকেল চালিয়ে সুপারশপে গিয়ে মাছ–সবজি ফলমূল নিয়ে আসেন। রান্না করেন, গান শোনেন। আরিয়ান ফিরে আসেন বিকেলে। কফি খেয়ে ড্রাইভিং শেখাতে নিয়ে যান। দুজনে রাতে ডিনারের পর কফি বা ওয়াইনের গ্লাস নিয়ে পিয়ানোর সামনে বসেন। আরিয়ান পিয়ানোয় ঝংকার তোলেন সুইজারল্যান্ডের মনোমুগ্ধকর সুর আধুনিক লিডিয়ান। এটি ওর ছিল খুব পছন্দের। মোডটি হল একটি সাত-স্বরের মিউজিক্যাল স্কেল যা তিনটি পুরো টোন, একটি সেমিটোন, আরও দুটি পুরো টোন এবং একটি চূড়ান্ত সেমিটোন নিয়ে গঠিত। এই লিডিয়ান ছিল আরিয়ানের ভীষণ প্রিয়।

১৯৬০–এর দশকের রক অ্যান্ড রোল বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। ১৯৬৮ সালে লেস সাউটরেলিসের ‘হ্যাভেনলি ক্লাব’ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে শীর্ষে উঠে আসে। সুইজারল্যান্ডের ফ্রান্সফোন বিভাগ শিগগিরই জনি হ্যালিডের মতো ফরাসি তারকাদের নিয়ে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। ল্যারি গ্রেকো এবং লেস ফোকস-ফ্রেয়ের মতো সুইস শিল্পীরা জনপ্রিয় শিল্পী হয়ে ওঠেন। আরিয়ানের প্রিয় হ্যাভেনলি ক্লাব। টনি ভেসকোলি ব্যান্ড দলের সঙ্গে তার আয় উপার্জনের পরিকল্পনা করেছিলেন আরিয়ান। টনি ভেসকোলির বোন ভেরা গায়ক এবং সেই সঙ্গে জিগগুলির মধ্যস্থতার জন্য তাঁর এজেন্ট হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু আরিয়ান বাবা–মায়ের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে সুইস ব্যাংকের চাকরিতে যোগ দেন। শেষে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেন।। শুধু সংগীত পেশা হিসেবে খুব ঝুঁকিপূর্ণ তাই।

১৯৫৫ সালে মার্টিন লুথারকিং জুনিয়রের নেতৃত্বে শুরু হয় দীর্ঘদিনের সিভিল রাইটস মুভমেন্টস। ওই বছর যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামার মন্টেগোমারিতে রোজা পার্কস নামে এক সাধারণ অফিস ফেরত যাত্রী ক্লান্ত হয়ে বাসের সামনের দিকের সিটে বসে পড়েন, যা ছিল শ্বেতাঙ্গদের জন্য নির্ধারিত। বাসচালক বললেও তিনি সরে গিয়ে বাসের পেছনে কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য নির্ধারিত জায়গায় বসতে চাননি। নানা বাগ্ববিতণ্ডার পরে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করলে ফুঁসে ওঠে আন্দোলন। এই সাদা–কালোর দ্বন্দ্ব খুব বিষণ্ন করে তুলত ডোনাকে।

ডোনা পেলোসি মনে মনে মানুষের এই ভেদাভেদকে ঘৃণা করতেন। এর মধ্যে চলে গেছে আরও কিছু সময়। একে একে তাদের সংসার আলো করে তিন ছেলে এক মেয়ে এসেছে। বাচ্চারা জন্মেছে, বড় হচ্ছে। ব্যস্ত জীবনে স্বামীকে সাহায্য করতে ছেলেদের নিয়ে চলাফেরা করতে হতো তাকে নিজেই। স্কুলে যাওয়া, সাঁতার শেখানো, ডাক্তারের কাছে যাওয়া, চার্চে যাওয়া—সব তাকে করতে হতো। বিভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী মানুষের মধ্যে বেশ কিছু সংস্কৃতিগত ফারাক থাকে। আর এই ফারাকের ফলেই আমরা অন্য ধর্মের মানুষদের এড়িয়ে চলি। কিন্তু তলিয়ে দেখলে ইসলাম, খ্রিষ্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, ইহুদি ইত্যাদি সমস্ত ধর্মের মধ্যেই বেশ কিছু তত্ত্বগত মিল রয়েছে। এই মিলের জায়গাটি ছোট থেকে নিজের সন্তানকে বোঝান। তবে এই বোঝানোর কাজটি কিন্তু বেশ চ্যালেঞ্জিং, কারণ এসব কথা বাচ্চাকে সহজ কথায়, গল্পচ্ছলে বোঝানো নেহাত মুখের কথা নয়। ডোনা সব সময় তাদের বলতেন মানুষ সব সমান। এভাবে দেখতে শিখলে সন্তানেরা অনেক বেশি পরধর্মসহিষ্ণুতা হয়ে উঠবে।

এ সময় রোজাপার্কসের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ডোনা তাঁর বড় ছেলে রজার্স ও মেজো ছেলে ডেভিডকে বাসের পেছনে কালো ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বসতে বলতেন। কখনো কখনো নিজেও ছেলে পিটার আর মেয়ে লিডিয়াকে কোলে বা স্ট্রলারে নিয়ে বাসের পেছনে কালোদের জন্য নির্ধারিত সিটে গিয়ে বসতেন। এটা ছিল তার ব্যক্তিগত প্রতিবাদ, যা তিনি নিজে ও তার সন্তানদের মধ্যে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করতেন। প্রতিবাদী মা মানুষের স্বাধীনতা ও সমান অধিকারে বিশ্বাস করেন আজও। তার ঘরে অসংখ্য ছবিতে তার আফ্রিকান আমেরিকান কালো বন্ধুদের সঙ্গে, প্রতিবেশীদের সঙ্গে, সহকর্মীদের সঙ্গে পারিবারিক ছবি আছে।

১৯৬৪ সালে নর্থ ক্যারোলাইনা চলে আসেন ডোনারা। আরিয়ান পেলোসি ও ডোনা পেলোসি ১৯৬৫ সালের দিকে মাত্র ২০ হাজার ডলারে যখন এই বাড়ি কেনেন, তখন তাদের ছোট মেয়ের বয়স সম্ভবত আট বছর। ১৯৬৫ সালে এই বাড়ি কেনার সময় তাঁর ব্যাংকার স্বামীর টাকায় কিছু কম পড়লে ডোনা অস্ট্রিয়ায় তাঁর বাবা মায়ের কাছ থেকে টাকা আনেন। মামাদের কাছ থেকে টাকা ধার করেন। ওই বাড়ির পাশেই আরও সুন্দর একটা কর্নার প্লটের বাড়ি তার পছন্দ হয়েছিল, কিন্তু সেই বাড়ির দাম ছিল ২৫ হাজার ডলার। তার আগ্রহ দেখে রিয়েলটর এক হাজার ডলার কমিয়ে ২৪ হাজারে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু ওই ৪ হাজার টাকা জোগাড় করা তখন খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ালে সেই প্রিয় বাড়িটি আর কেনা হলো না।

এই বাড়িকেই সাজিয়ে–গুছিয়ে সুইট হোম করে গড়ে তুললেন। বাড়ির সামনে লাগালেন এই মেগনোলিয়া গাছ, যা এই এপ্রিলে ফুলে ফুলে সেজে উঠেছে। আর প্রতি বছর ডোনা কার্ডের মাঝখানে এই ফুলের পাপড়ি দিয়ে পাঠাতেন তার মাকে, যে মা তাদের অস্ট্রিয়ার বাড়িতে একা একা থাকতেন। হিমালয় পর্বতের মতো স্থির, সাহসী, প্রজ্ঞাময়ী, শক্তিমতী এক নারী। ডোনা, এনা ও বারবারা এই তিন কন্যার নারীবাদী মা। তাদের শক্তির উৎস। বাড়ির নামটি ছোট ছেলে পিটার বোর্ডে লিখে এনে ঝুলিয়ে দিয়েছে ‘ম্যাগনোলিয়া’।

তিন ছেলে এক মেয়েকে নিয়ে তাঁদের আনন্দ গানে ভরা সোনার সংসার। এমন পারস্পরিক বোঝাপড়া, ভালোবাসা, সম্মান দিয়ে ঘেরা তাদের জীবন। আনন্দ গানে ভরপুর। ছুটিতে অস্ট্রিয়া বা সুইজারল্যান্ডে বেড়াতে যাওয়া আর ঘরবাড়ি সাজানো। নিত্যনতুন রান্না করা তার জীবনের আনন্দ।

চোখ বুজে ছুটির দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা আরিয়ানের গান শোনেন। ভালোবেসে ডোনাকে ডাকতেন ম্যাগনোলিয়া। চিঠিতে সম্বোধন করতেন ম্যাগনোলিয়া। যখন মায়ের কাছে অস্ট্রিয়া বেড়াতে যেতেন, তখন কোনো কারণে যদি আরিয়ান যেতে না পারতেন চিঠি লিখতেন দুজনেই। সামারে পরিবার নিয়ে চলে যান সৈকতে বা কোনো পার্কে বারবিকিউ করতে। অথবা ক্যাম্পিংয়ে। চমৎকার মায়ায় জড়ানো এক সংসার। যার মধ্যমণি ডোনা।

একদিন মস্ত বড় ঝড় উঠল ডোনা পেলোসির জীবনে। সড়ক দুর্ঘটনায় আরিয়ান চলে গেলেন পরপারে। যাকে কোনো দিন চাকরি করতে হয়নি এতগুলো বাচ্চা নিয়ে, বাড়িতেই আনন্দে ছিলেন। সেই ডোনা স্বামীর মৃত্যুর পরে ঘুরে দাঁড়াতে বাধ্য হলেন। আবার এ দেশে টিচিং সার্টিফিকেশন করলেন। স্কুলে শিক্ষকতা করে সব ছেলেমেয়ের পড়াশোনা নিশ্চিত করলেন। তার দুই ছেলে ডাক্তার, একজন চার্টারড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, একমাত্র মেয়ে অনলাইন বিজনেসে আছে। সে মস্ত বড় মার্কেটিং ম্যানেজার বিউটি প্রোডাক্টসের। আরিয়ানের মৃত্যুর পর সন্তানদের শুধু এটা বোঝালেন, আগের মতো চাইতেই সব তাদের তিনি দিতে পারবেন না। যে যা হতে চায়, তা তাকে অর্জন করতে হবে। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আয়োজন নিজেকে করতে হবে।

মাথার কাছে তাঁর প্রিয়তমের ছবি রেখে দিলেন আজীবন। আজও তার চিরবিদায়কালে বিছানায় মাথার কাছে স্বামীর ছবি রাখা আছে। কখনো তিনি হাসপাতালে গেলেও ওই ছবি তার সঙ্গে নিয়ে যান। একবার জন এফ কেনেডি এয়ারপোর্টে নামার পর লাগেজ নিয়ে বেরোনোর সময় হঠাৎ ডোনা পেলোসি হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেন। তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো ইমার্জেন্সি অ্যাম্বুলেন্স ডেকে। কিছুটা সুস্থ হলে নেওয়া হলো নর্থ ক্যারোলাইনার এক পুনর্বাসন কেন্দ্রে। সেখানে রইলেন কিছুদিন। সেখানে তাকে থেরাপি দেওয়া, প্রতিদিন এক্সারসাইজ করানো এবং বিশ্রাম চলতে থাকল। সেখানেও বালিশের পাশে আরিয়ানের ছবি হাসছে। ওদের প্রেম দেখে সত্যি সবাই অবাক হয়ে যায় সবাই। এই বিস্ময়ের ঘোর কাটে না। মনে হয় আজ ডোনার শেষ যাত্রায় আরিয়ান সবচেয়ে খুশি হবেন। স্বর্গের বারান্দায় দাঁড়িয়ে তিনি কী ফুল নিয়ে অপেক্ষায় আছেন কখন তার ডোনা তার কাছে পৌঁছাবে!

বিজ্ঞাপন
সাহিত্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন