default-image

মেহেরুন দাদি আমার ঠিক নিজের দাদি নন। তিনি হলেন পাড়াতুতো এক দাদার সৎ বোন। ওই দাদার বাবার সাত মেয়ে থাকলেও তাঁকে সবাই আঁটকুড়ো বলত। কারণ তাঁর কোনো ছেলে সন্তান ছিল না। মেয়েদের অনেক আগেই বিয়ে হওয়ায় বাড়ি একেবারে ফাঁকা। তাই ৮০ বছর বয়সে বুড়োর হজে যেতে চাইলেন। যাওয়ার আগের রাতে মিলাদ, সবার কাছে মাফ চাওয়া, ব্যাগ গোছানো সব শেষ। অথচ সকালে তাঁর যাওয়ার আর তেমন তাড়া দেখা গেল না। উল্টো সবাইকে ডেকে বললেন, ‘শোনো তোমরা, ব্যাগ সব খুলে ফেল। আমি আর যাচ্ছি না।’

সবাই অবাক হয়ে এর কারণ জানতে চাইল। তিনি জানালেন, ‘গত রাতে আমি ভালো একটা স্বপ্ন দেখেছি। উত্তর পাড়ার মর্জিনাকে বিয়ে করলে আমার পুত্র সন্তান হবে। আর বড় হয়ে সে এই গাঁয়ের মোড়ল হবে।’

এই কথা শুনে তো সবাই থ। লোকটা বলে কী? এই ৮০ বছর বয়সে বিয়ে করবে ওই মর্জিনাকে, যে কিনা ওই বাড়িতেই ধান ভেনে পেট চালায়! কেউ বেকজন বলল, ‘নিশ্চয়ই শয়তান পেছনে লেগেছে।’ সবাই তড়িঘড়ি করে আশপাশ থেকে মাওলানা এনে ঝাড়ফুঁক করাল। কিন্তু এতে কিছু হলো না।

এই ঘটনায় দুই পক্ষ গেল ক্ষেপে। একপক্ষে তাঁর সাত জামাই, যারা ওত পেতে বসে ছিলেন, বুড়ো পটল তুললেই বিশাল সম্পত্তি নিজেরা ভাগ বাঁটোয়ারা করে নেবেন। অন্য পক্ষে যত আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশী। তাঁদের বক্তব্য, নিচু জাতের খেটে খাওয়া মেয়ে, তাকে কীভাবে এমন একটা সম্ভ্রান্ত পরিবারে উঠতে দেওয়া যায়! কিন্তু তা সত্ত্বেও ঠিক বাংলা সিরিয়ালের মতো, সংকল্পে অটল বুড়োর বিয়েটা ঘটেই গেল। আর শাদি মোবারকের ছয় মাসের মাথায় নিজে মরে বাঁচলেন। সময় মতো ঘর আলো করে একটা ছেলে জন্মাল। বড় হয়ে একদিকে হ্যান্ডসাম ও অন্যদিকে বিচক্ষণ পুরুষ হয়ে সে সবার মন কাড়ল।

গ্রামের মোড়ল আমার বাবার চেয়ে বয়সে ছোট হলেও, সম্পর্কে চাচা হয়ে তিনি বাবারও মুরুব্বি হয়ে গেলেন। গ্রাম্য সালিসে বাবাকে ছাপিয়ে তিনিই নতুন মোড়ল হয়ে উঠলেন।

বিজ্ঞাপন

এই নতুন দাদার সাত সৎ বোনের ছয়জনই মহামারিতে গত হয়েছিলেন। বিধবা এই মেহেরুন দাদিকে যখন প্রথম দেখি, তত দিনে তাঁরও বয়স হয়ে গেছে। ভীষণ অস্থির, শুচিবাইগ্রস্ত ও সন্দেহ প্রবণ ছিলেন এই ভদ্র নারী। দিনের মধ্যে ৮০ বার শানবাঁধানো ঘাট থেকে পা ধুয়ে আসতে আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যেতেন। তারপর একটু করে হাঁটতেন আর পায়ের নিচের দিকের কাপড় ঝাড়া দিতেন, যাতে ধুলো ময়লা কিছু লেগে থাকলে সেগুলো যেন ঝরে যায়। কাউকেও বিশ্বাস করতেন না তিনি। মাকে কিছুটা করতেন, তবে পুরোপুরি নয়। দিনে অন্তত চারবার এসে মাকে বলতেন, ‘ও হামিদা, বাক্সটা একবার খোলো তো মা, হাঁসুলিটা, হাতের বালা দু’খান, আর টাকাগুলো ঠিকমতো আছে কিনা একবার দেখে যাই।’ মা খুবই বিরক্ত হতো। কিন্তু ‘গ্রামের সেরা বউ’ খেতাবটা নষ্ট হতে পারে, এই আশঙ্কায় আর মুখ খুলতে পারত না।

মার স্যুটকেসে নিজের মালপত্র ভালো করে পরখ করার পর প্রতিবারই ওই দাদি আমাকে জিজ্ঞেস করতেন, ‘তা হ্যাঁ ভাই, ক’টা পাশ দিলি?’ জবাব দিতাম, ‘বুবু, আমি এখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ি।’ তিনি বলতেন, ‘তোরা হলি সব কলি কালের চ্যাংড়া, কথার উত্তর সোজাভাবে না দিয়ে কেবল প্যাঁচাস।...বলি ‘এন্টেরেন্স’-টা কি শেষমেশ পাস দিতে পেরেছিলি?’

আগের এনট্রান্স পরীক্ষার পরে নাম হয়েছিল ম্যাট্রিক, স্কুল ফাইনাল, মাধ্যমিক, এসএসসি ইত্যাদি। তাই বলি বুবু, ওসব তো অনেক আগেই...। আমাকে সপাং করে থামিয়ে দিয়ে ওনার হুংকার, ‘চুপ, বেয়াদপ ছেলে, মিথ্যাবাদী। বললেই তো হয় যে, অনেকবার চেষ্টা করেও পাস দিতে পারিসনি। আমি জানি ওটা শক্ত, অনেকে সারা জীবন চেষ্টা করেও পারে না। তা বলে এই বয়সে এত বড় মিথ্যা কথা? বদ-দোয়া আমি দিতে চাই না। তবে আল্লাহ না করুক, আমার কোনো সন্দেহ নেই যে, বড় হয়ে তুই এক নম্বরের ফেরেব্বাজ আর জালিয়াত হবি।’

সাহিত্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন