default-image

একটা ফোন কল কেমন করে সব সুতা জুড়ে দিল। তাকে কখনো দেখিনি। হঠাৎ সুন্দরী একজন ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাল, কিছু না চিন্তা করেই অ্যাড করে নিলাম। বেশ কিছুদিন পর মেসেঞ্জারে একটা ছোট্ট লেখা, ‘আপনি কখন ফ্রি থাকেন, একটু কথা ছিল।’

মনে মনে ভাবলাম, এ কোন বিপদে পড়তে যাচ্ছি! জানাব নাকি জানাব না। ভেবে ভেবে বেশ কয়েকটা সপ্তাহ পার হয়ে গেল। এর মধ্যেই সে আমার এক পুরোনো বন্ধুর ছবি ও বুয়েটের প্রথম বর্ষের একটি বইয়ের ছবি দিল। কিন্তু তাতে সে কিছুই লেখেনি, বইয়ে আমার ছবি দেখে অবাক হলাম। কিন্তু বন্ধুর কিশোর বয়সের ছবির নিয়ে কোনো অনুমান করতে পারিনি। আর জল্পনা কল্পনা না করে আমিই কল করে বসি। অপর প্রান্ত থেকে বেশ ঘুমে আচ্ছন্ন শব্দ এল ‘এখন নিউইয়র্কে রাত সোয়া দুটো বাজে’। তবুও অসুবিধা নেই।

ভাবলাম কেটে দিই, কিন্তু জানতে খুব আগ্রহ হচ্ছিল এই নারীর রহস্য। বললাম, দেখুন আপনি নিশ্চয়ই কোনো কারণে কথা বলতে চেয়েছেন। যদি সমস্যা না থাকে তাহলে বলুন বিষয়টা কী?

একটু হেসে বললেন, সব কথা বলার কোনো কোনো সময় ভূমিকার প্রয়োজন হয়। আবার কখনো সরাসরি বলা যায়, যাই হোক আমি চন্দ্রমুখী নই কিংবা পার্বতীও নই। আমি একজন নারী, বিবাহিত ও কন্যা সন্তানের মা। আমি সুখী দাম্পত্য জীবনের ভেতর একজন বইঠা বিহীন নৌকা। যার পাল ছিল ভরসা, আর সেটা ছিঁড়ে গেছে কোনো এক হালকা বাতাসে।

—কথাগুলো একটু বুঝিয়ে বলুন, আমার বন্ধুর ছবি দিয়েছেন। আমি বা আমার বন্ধু কি আপনার সঙ্গে পরিচিত?

—হুম, তবে সে সম্পর্ক এখন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। রাত যদিও বাড়ছে তাই বিরক্ত করতেও খারাপ লাগছে।

—আচ্ছা বলছি। আমি শ্যামা, গোপীবাগে বেড়ে উঠি। সেখানে ফুটবলের ব্রাদার্সের মাঠে আমাদের খেলাঘর থেকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়, সেখানে ছেলেদের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় স্বপ্ন। আমরা সব বন্ধুরা দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, ছেলেদের চোখ বেঁধে লাঠি নিয়ে হাঁড়ি ভাঙতে। হাস্যকর ছিল যে, স্বপ্ন সোজা হাঁটতে গিয়ে উল্টো বাঁকা পথে হাঁটছিল। আমি হাসি আর ধরে রাখতে পারিনি, ও পড়ে ব্যথা পায়। তাই যখন ওর চোখ খোলা হয় আমাকে হাসতে দেখে ভীষণ লজ্জা পেয়ে যায়। এরপর আমাদের গান শুরু হয়। ও আমাকে এমন ভাবে দেখছিল যে আমার লজ্জাই লাগছিল। কেটে যায় বেশ কয়েক বছর।আমাদের কোনো যোগাযোগ হয়নি। একদিন সন্ধ্যায় বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে দেখছি রাস্তার মানুষ। এমন সময় দেখি ১১ নম্বর বাসায় নতুন ভাড়াটিয়া এসেছে। একটি ছেলে হেঁটে আমার দিকে আসছে। ভালো করে দেখি এত সেই স্বপ্ন! সে কিছুদিনের মধ্যেই আমার ছোট ভাইয়ের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে। আমরা ১২ নম্বর বাসায় শিফট করি, স্বপ্ন এসএসসি ও এইচএসসিতে স্ট্যান্ড করেছিল। তাই পাড়ার সবাই ওর কাছে কোচিং পড়তে চাইতো। আমার বোনদেরও সে পড়াত। এর বিশেষ কারণ ছিলাম আমি, সে আমাকে দেখার জন্যই আসত।

বিজ্ঞাপন

—ও এখন বুঝেছি, আপনি আমার বন্ধুর সঙ্গে রিলেটেড। কিন্তু সে তো ভালোবেসেই বিয়ে করেছে পলিকে।

—প্লিজ কলটা কেটে দেবেন না। অনেক প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষা করে করে আজ আমি ক্লান্ত। কিছু সময় হয়তো নিচ্ছি, একটু শুনুন। স্বপ্ন ছিল মেঘনীলে আর আমি নিউইয়র্কে। আমাদের কোনো যোগাযোগই ছিল না। দুই বছর আগে আমি দেশে যাই। ওকে ফেসবুকে খুঁজে পেয়ে অনেকবার কল করি। কিন্তু কোনো রেসপন্স পাইনি। তবে মাঝে মাঝেই ওর ছবি ও লেখা কবিতা পড়ি, যখন ওর কবিতায় আমার কিছু স্মৃতির ঝুল দেখি, মনটা লাভার মতোই পুড়ে পুড়ে যায়। আমি নিজেও একজন লেখক তাই আমিও মেঘনীলের স্বপ্ন জাল নিয়ে প্রায়ই লিখে যাই।

—কিন্তু ও যদি আপনাকে ভালোবেসে থাকে তবে বিয়ে করা উচিত ছিল। আর পলিকে আবার ভালোবেসে কীভাবে বিয়ে করল? পলি কি আপনাকে চেনে বা আর কেউ?

—এর কিছু উত্তর আপনাদের বন্ধু জুয়েল দিতে পারবে। জুয়েল ছিল সবকিছুর সাক্ষী। জুয়েলের বাসার ফোনে আমি প্রায়ই কল দিতাম, কথা হতো।

—আপনাদের ভালোবাসার ফাটল কীভাবে হলো?

—আমরা বাসা ছেড়ে চলে আসি ধানমন্ডি। পরিবারের বড় সবার বিয়ে হয়ে যায়। ওর সঙ্গে যোগাযোগ কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। একদিন বুয়েটে যাই দেখা করতে। কিন্তু ও ছিল না। তাই আমার বাসার ঠিকানা দিয়ে ছোট্ট একটা চিঠি রেখে আসি ওর রুমমেটের কাছে। কিছুদিন পর ও সত্যি এসে হাজির হয়। একদিন আমাকে বুয়েটের সব বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় করাতে ও নিয়ে যায় বোটানিক্যাল পার্কে।

—আপনাদের মাঝে কি কোনো ভুল বোঝাবুঝি ছিল?

—না না, স্বপ্ন তো খুব সাহসী ছিল। আমি তখন এসএসসি পরীক্ষা দেব। একদিন আমার বোন স্বপ্নকে বলল, ‘শ্যামার জন্য ছেলে দেখা হচ্ছে, ওর রেজাল্ট বের হলে আর দেরি করা হবে না।’ কথা শেষ না হতেই ও উত্তর দিল, কী বলছেন—আমরা দুজন দুজনকে ভালোবাসি।আমি বাসায় জানাব আর আপনি আমার ভাবিকে বলুন, ভাবি সবাইকে রাজি করিয়ে ফেলবে। ওর ভাবিকে আমার কথা বলতেই তিনি খুশিতে আটখানা। বললেন, দুদিন পরেই জানাবেন। কিন্তু এক-দুই-তিন সপ্তাহ পার হলো কোনো খবরই নেই। নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে হতে লাগল। আর অপেক্ষা না করে কল করি জুয়েল ভাইকে। উনি বললেন, স্বপ্ন বলেছে তোমার কথা ও পরিবারে জানিয়েছে। কিন্তু ওর বাবাকে ওর ফুপু মৃত্যুর আগে কথা দিয়ে গেছেন, যেন ওর সঙ্গে পলির বিয়ে হয়। স্বপ্ন তখন বলেছে, আমি বাসা ছেড়ে চলে যাব, আর কোনো দিন আসব না। শুনে ওর বাবা বলেছেন, যদি তুই আমার মৃত বোনের কথা না রাখিস, তবে আমার মরা মুখ দেখবি। ও নিজের সঙ্গে আর লড়তে পারছিল না। তাই বাধ্য হয়ে ওকে রাজি হতে হয়েছে। তোমাকে ভুল বুঝতে মানা করেছে, ও তোমাকে খুব ভালোবাসে।

কলটা ছেড়ে দিয়ে কতক্ষণ বসে ছিলাম। বাইরে কোনো ঝড় নেই তবু মনটা যেন চূর্ণ বিচূর্ণ, সারা দিন শুধু কেঁদেই গেলাম। কারও সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগত না আর। সেই চঞ্চল মেয়েটি হয়ে গেলাম মূক ও বধির। এই অবস্থার পরিসমাপ্তির জন্য আমাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হলো। আমি আমার স্বামীকে স্বপ্নর কথা বলেছিলাম। সে কখনো আমাকে ওকে নিয়ে কিছুই বলত না। স্বপ্ন হয়তো আমাকে ভুলে গিয়ে পলিকে ভালোবাসতে শুরু করে। ওদের বিয়ের খবর জেনেছি অনেক বছর পর। তবে আমাদের কখনো দেখা বা কথা হয়নি।

আমি পুষে রেখেছিলাম মনের মন্দিরে ভালোবাসার মূর্তি। তা কখনই হারাতে দিইনি। আমার শুধু একটাই ইচ্ছে ছিল, ওকে দেখার। অনেক প্রশ্নের উত্তর জানার অপেক্ষা করেছি।

—আপনার কথা শুনে খুব খারাপ লাগছে। স্বপ্ন আমার খুব প্রিয় বন্ধু। যদি আর কিছুদিন আগে আপনি এভাবে খোঁজ করতেন, তবে সবকিছুর ব্যবস্থা আমিই করে দিতাম।

গত মাসে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে সংক্রমিত হয়ে স্বপ্ন পরপারে পাড়ি জমিয়েছে। স্বপ্ন নিজের মতো করে ‘মেঘনীল’ নামে একটি বাংলো বানিয়েছিল। ওকে সেখানেই কবর দেওয়া হয়েছে, মেঘনীলের স্বপ্ন ভেঙে গেছে।

আপনার জন্য আমি খুবই মর্মাহত, আপনাকে সান্ত্বনা দেওয়ার কোনো ভাষা নেই। প্লিজ আপনি কান্না বন্ধ করুন, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে আপনার জন্য। যদি কখনো দেশে আসেন আমাকে স্মরণ করবেন, আপনাকে নিয়ে যাব স্বপ্নর কাছে। শ্যামা আর কাঁদবেন না, স্বপ্নকে এখন আর কেউ দিব্যি দিয়ে বেঁধে রাখতে পারবে না। ও আপনাকে দেখছে হয়তো। ও আপনার কাছেই আছে, আপনি ওর আত্মার জন্য দোয়া করবেন।

বিজ্ঞাপন
সাহিত্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন