default-image

থার্ড অ্যাভিনিউ ম্যাকনন এরিকসন অফিসে সারা দিনের ব্যস্ততায় ক্লান্ত হয়ে আছে নন্দিতা। আগামীকাল দুপুরের ট্রেনে নিউইয়র্ক ছেড়ে চলে যাবে। নিকলস বলছিল, একসঙ্গে প্লেনে যেতে। ‘না’ বলে দিয়েছে। কেন জানি, একা থাকতে ভালো লাগে। সময়ের মূল্য আগের মতো তার কাছে আর নেই। কংক্রিটের দেয়াল থেকে যত দূরে থাকা যায়, সেই ভালো। লম্বা সময়ে ট্রেন জার্নিতে নিসর্গশোভা উপভোগ করে যেতে পারবে। এবার রুট নিউইয়র্ক-ওয়াশিংটন-শিকাগো।

আগে গিয়ে কি করবে?

কাল ব্রেকফাস্টের পরই হোটেল ছেড়ে দেবে। ফিরে যাবে নিজের কর্মযজ্ঞে। ডুবে যাবে কাজ নিয়ে। কোনো অবসর মিলবে না পেছনে ফিরে তাকানোর।

বিজ্ঞাপন

রাতে নিকলসকে নিয়ে ডাউনটাউন ট্রাইবেকায় ১২০ হাডসন স্ট্রিটে বাবিস রেস্তোরাঁয় খেতে যায়। ওয়েটারকে প্রথমে একটা সিজার সালাদ অর্ডার করে। পারমাজান চিজ, এনচভি ফিল্যাট, ক্রটনস ও সিজার ড্রেসিং রাখতে বলে। অবশ্য আগে দুজন ড্রিংকস অর্ডার করে নেয়।

সালাদ তখনো শেষ হয়নি। তাদের থেকে দুই টেবিল পর আরেক টেবিলে একজন ইন্ডিয়ান অথবা বাঙালি লোক কয়েকজনকে নিয়ে ডিনার করছে। খানিকটা অবাক হলো। খুব পরিচিত মনে হচ্ছে। নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারছে না। নিকলস ব্যাপারটা লক্ষ্য করে।

ওয়েটার এসে বলে, আর ইউ রেডি মেম?

ইয়েস, উই আর।

নন্দিতা ব্লাকেন্ড সেলমন সঙ্গে জুকিনি, অকরা, পিকল, পাইন অ্যাপেল সিলানট্র অর্ডার করে। নিকলস ১৬ আউন্স নিউইয়র্ক স্ট্রিপ স্টেক (ড্রাই এজড স্টেক) অর্ডার দেয়। ডিনারের ফাঁকে আড় চোখে বাঙালি লোকটিকে পর্যবেক্ষণ করছিল নন্দিতা।

খাবার শেষে ওয়েটারকে তাদের জন্য চিজ কেক ও কাপুচিনো দিতে বলল।

একবার ভাবে, জিজ্ঞেস করবে পাশের টেবিলে গিয়ে? নিকলস কিছু মনে করতে পারে ভেবে আর যায়নি।

নন্দিতা যে বাঙালি রমণী, পরিচিত না হলে কারও বোঝার ক্ষমতা নেই। রেস্ট রুমে যাওয়ার সময় ম্যানেজার ডেস্কের কাছ দিয়ে গেল। ডান পাশে কিচেন। তার সামান্য আগে রেস্ট রুম। ফেরার সময় বাঙালি লোকটির মুখোমুখি।

–‘মে আই নো ইয়োর নেম ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড? ইউ লুকিং ইন্ডিয়ান’—নন্দিতা হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসল।

–শাফকাত আহমেদ পুলক।

বিজ্ঞাপন

নন্দিতা আর দাঁড়াতে পারেনি। থ্যাংকস বলে সোজা তার টেবিলে চলে আসে।

পুলক হতভম্ব হয়ে পড়ে এই আকস্মিক প্রশ্নে। মেলাতে পারে না এই মধ্যে বয়সী রমণী কে হতে পারে? বেশভূষায় অত্যাধুনিক। মিডল ইস্টার্ন বা ইন্ডিয়ান হতে পারে। তাকে তো চেনার প্রশ্নই আসে না। হয়তো তাঁর কোনো ক্লায়েন্ট!

পুলক আমেরিকায় ব্যবসার কাজে এসেছে কদিন হলো। পাশেই সহো গ্র্যান্ড হোটেলে উঠেছে। বায়ারদের জন্য নিজস্ব ডিজাইনের ব্রাইডেল গাউন স্যাম্পল এনেছে। নিউইয়র্কে ব্রাইডেল ফ্যাশন উইকে অংশগ্রহণ করেছে। নিজস্ব কারখানায় তৈরি ওয়েডিং ড্রেস ইউরোপে বাজার ধরতে পারবে প্রায় নিশ্চিত। মার্কিন কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে কথা বলছে। কন্ট্রাক্ট পেয়ে গেলে পুলক হবে বাংলাদেশের সফল ব্রাইডেল গাউন এক্সপোর্টার। কঠোর পরিশ্রম করে এই সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। জীবনের ব্যর্থতা তাকে অনেক সংযত থাকতে শিখিয়েছে। তাই এ রকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে অবাক হয়নি। সম্ভবত কোনো বায়ার হবে। মিডটাউনে ব্রাইডেল ফ্যাশন উইকে তার ডিজাইনগুলো দেখে হয়তো ভালো লেগেছে। একেকটা সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাচ্ছে দেখে খুব ভালো লাগল। লাক্সারি ব্রাইডেল বুটিকের সঙ্গে কন্ট্রাক্ট পাকাপাকি হয়ে গেছে।

পুলক দূর থেকে লক্ষ্য করে টেবিলটি, যেখানে নারীটি বসেছে।

নিউইয়র্কে এসে নন্দিতাকে অনেক খুঁজেছে। যদি নন্দিতাকে তার স্বপ্ন পূরণের কথা জানাতে পারত। অনেক আগে শুনেছিল, শিকাগো চলে গেছে। আজও দুঃসহ বেদনায় ঘুমাতে পারে না। নন্দিতার স্মৃতি তার জীবনে বিষের বাঁশির মতো বেজে চলছে। কি আশ্চর্যজনকভাবে তাকে অবহেলা করেছিল সেদিন। মাত্র কয়েকটা মাস নন্দিতার কাছে সময় ভিক্ষা চেয়েছিল।

কিছুক্ষণ আগের নারীটিকে কোনো অবস্থাতেই মনে করতে পারছে না। দূর থেকে লক্ষ্য করতে থাকে।

নন্দিতা টেবিলে এসে একেবারে আনমনা হয়ে পড়ল। নিকলস জানতে চেয়েছিল, অ্যানিথিং রং?

নো, জাস্ট লিটল হেডেক, ইটস গোয়িং টু বি ওকে।

পুলক কবে আসল? কোনো দিন কেউ বলেনি। অনেক বছর পার হয়ে গেছে তার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। শুধু জানত, সে দেশেই ব্যবসা করে। তাকে চিনতে পারেনি এ ব্যাপারে নিশ্চিত।

যুক্তরাষ্ট্রকে স্বর্গের সিঁড়ি মনে হয়। আসার পর সরষে ফুল দেখে অধিকাংশ স্বপ্নচারীরা। ডাক্তার, প্রকৌশলী, উচ্চশিক্ষিত সবাইকে অড জব দিয়েই শুরু করতে হয়। কঠোর পরিশ্রম ও সুচিন্তিত পদক্ষেপে অনেকেই এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছে যায়। কেউ খেই হারিয়ে ফেলে। এখানে বাস্তবতায় ঠুনকো হয়ে পড়ে স্নেহমমতার বন্ধনগুলো। পেছনে ফেলে আসা নিজের জন্মভূমি কখনো সে রকম ছিল না।

নন্দিতার জীবনে ঠিক এমন কিছুর প্রতিফলন হবে ভাবতে পারেনি। গ্র্যাজুয়েশন করে হোয়াইট কালার জব করছে। সমানতালে মার্কিনদের টেক্কা দিচ্ছে। কোনো অংশে সে কম নয়। বিনিময়ে দেশীয় কালচার থেকে দূরে সরে এসেছে। পারিবারিক জীবন পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। সাবেক স্বামী ও মেয়েদের খবর তার জানা নেই। সবাই স্ট্যান্ডার্ড লাইফ মেনটেইন করছে, শুধু এতটুকুই জানে। কারও সময় নেই পেছনে তাকানোর। দিজ সিচুয়েশনস আর অ্যা পারফেক্ট কমপ্লিম্যান্ট টু ওয়ান অ্যানাদার। একটা আরেকটার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ফ্যামিলি ভেঙে যাচ্ছে। ব্রোকেন ফ্যামিলিতে ছেলেমেয়েরা বড় হচ্ছে। কেউবা সিঙ্গেল লাইফ কাটিয়ে দিচ্ছে।

পুলক যুক্তরাষ্ট্রে? মনে হচ্ছে ভালোভাবেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। জিনসের প্যান্ট, হোয়াইট শার্ট, ডিপ নেভি ব্লু ব্লেজার এবং গোল্ডেন ফ্রেমের দামি চশমা। যাদের নিয়ে ডাইনিং টেবিলে খাবার খাচ্ছে, সবাই মার্কিন। বাবিস রেস্টুরেন্টে ডিনার করা কারও স্ট্যাটাসকে রিফ্লেক্ট করে। যুক্তরাষ্ট্রে নিশ্চয় এমনিতে আসেনি। বিজনেস টুর হতে পারে। সেদিন সংকল্প করেছিল, পরিশ্রম করে সামনে এগিয়ে যাবে। নন্দিতা ধৈর্য ধরে রাখতে পারেনি। পারিবারিক সিদ্ধান্তে হেরে যায়। এখন তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারবে না।

পুলক নন্দিতার সিচুয়েশন জানলে কী বলবে। কল্পনাও করতে পারবে না, নন্দিতার জীবন কীভাবে বদলে গেছে।

নিকলসের ডাকে সংবিৎ ফিরে পায়। অনেক রাত। ওয়েটারকে ইশারা করল বিল দিতে।

টেবিল থেকে উঠে যাচ্ছে দেখে পাশের টেবিলের ভদ্রলোক দ্রুত কাছে এসে বলল, ‘মেম, ইউ লুক এক্সজেটলি এজ সেইম এজ ওয়ান অফ মাই বেষ্ট ফ্রেন্ড। আই হ্যাভ বিন লুকিং মেনি ইয়ার্স ফর হার। কুড ইউ প্লিজ হেল্প মি ফাইন্ডিং হার।’

হোয়াটস হার নেম?

‘নন্দিতা’, পুলক উত্তেজিত হয়ে জানায়। ডু ইউ নো হার?

কিছুক্ষণের জন্য ভয়ানক এক শূন্যতা নেমে আসে। কেউ কথা বলছে না।

নো, আই ডোন্ট। ইউ ক্যান লিভ ইউর নাম্বার ইফ ইউ উইশ—নন্দিতা সোজাসাপ্টা বলে দিল।

বিজ্ঞাপন

ফ্যাকাশে হয়ে যায় পুলকের মুখমণ্ডল। মনে করেছিল, এই সেই হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মানুষটি। মুহূর্তে নিজেকে স্বাভাবিক রেখে একটুকরো কাগজে লিখে দেয় তার টেলিফোন নম্বর ও ইমেইল অ্যাড্রেস।

ইফ ইউ ফাইন্ড সামওয়ান লাইক হার, কল মি প্লিজ। আই উইল বি ইন নিউইয়র্ক আনটিল টুমোরো ইভিনিং।

নন্দিতা বলতে চায় না কাউকে তার ভাগ্যের নির্মম উপহাসের কথা। করুণার পাত্রী হতে চায় না অন্যদের সামনে।

‘ইটস টু লেট হানি। আই গনা মিস মাই ফ্লাইট টুমোরো মর্নিং। লেটস মুভ আউট ফ্রম দিস রেস্টুরেন্ট’—বলে নিকলস উঠে দাঁড়ায়।

হারিয়ে যাওয়া অতীত অসহনীয় বেদনা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে নন্দিতার ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে, নিকলস কোনো ধারণা করতে পারেনি।

পুলক অসহায়ের মতো অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ওদের চলে যাওয়ার পথে। মনে হলো, তার সাফল্য যেন মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে গেল। কথা বলার সামান্য সুযোগ যদি পেত। কাল রাতের ফ্লাইটে চলে যাবে সে। নন্দিতাকে কোনো দিন ভুলতে পারবে না। মুছে ফেলা স্মৃতিগুলো সারা জীবন ধাওয়া করে বেড়াবে। বেদনার সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। নিজের অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

মন্তব্য পড়ুন 0