default-image

মীর মশাররফ হোসেনের গদ্য ভঙ্গি, রচনার সাধারণ বর্ণনা, বিষয় নির্বাচন, সমাজ ভাবনা ইত্যাদি এই নিবন্ধের মূল বিষয়। আজ ১৩ নভেম্বর এই মহান লেখকের জন্মদিন।

মীর মশাররফ হোসেন জীবন ও সাহিত্যে সব রকম বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিলেন। মশাররফ হোসেনের সংস্কৃত শব্দ-চিত্র-সংগীত ও অলংকার গদ্যভাষার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন পাওয়া যায় তার ‘রত্নাবতী’ উপন্যাসে। যেমন ‘একদা প্রভাকর দৈনিক কার্য সমাধানান্তর লোহিত বসনাবৃত হইয়া পশ্চিমাঞ্চলে গমনোদ্যোগ করিতেছেন। এমন সময় রাজনন্দন ও মন্ত্রী তনয় অত্যুত্কৃষ্ট বেশভূষায় ভূষিত হইয়া প্রদোষকালে বিশুদ্ধ বায়ু সেবন করিতে বহির্গত হইলেন।’

লেখকের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘বিষাদসিন্ধু’। উপন্যাসটি জনপ্রিয়তায় কালজয়ী। তাই ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় উল্লেখ করেছেন, ‘বাংলা সাহিত্যের অপূর্ব সম্পদ হিসেবে সব সমাজেই এ গদ্য কাব্য বিষাদসিন্ধুর সমান আদর। ‘বিষাদ সিন্ধু’ উপন্যাসে লেখক স্বদেশ চেতনার জ্বলন্ত প্রমাণ দেন। এর কিছু অংশ হলো, ‘স্বাধীনতা কি মধুমাখা কথা। স্বাধীন জীবন কি আনন্দময়। স্বাধীন দেশ কি আরামের স্থান। স্বাধীন ভাবের কথাগুলো কর্ণকুহরে প্রবেশ করিলে হৃদয়ের সুক্ষ্ম শিরা–উপশিরা পর্যন্ত আনন্দোচ্ছ্বাস ফীত হইয়া উঠে এবং অন্তরে বিবিধ ভাবের উদয় হয়। মন মহাহর্ষে নাচতে থাকে।’ (পঞ্চম প্রবাহ, উদ্ধার পর্ব)

স্বাধীনতা ধনে বঞ্চিত হইলে সহজে সে মহামণির মুখ আর দেখা যায় না। বহু আয়াসেও আর সে মহাম-ল্য রত্ন হস্তগত হয় না। স্বাধীনতা সূর্য একবার অস্তমিত হইলে পুনরুদয় হওয়া বড়ই কঠিন। (প্রথম প্রবাহ, এজিদ বধ পর্ব)

বিজ্ঞাপন
বিরোধী ভাবধারার পরিবেশে তিনি যে উদার মানবতাবাদ, স্বদেশপ্রেম, জাতীয়তাবোধ, সামাজিক কল্যাণচিন্তা, স্বাধীনপ্রিয়তা, জাতীয় সংহতিবোধ ইত্যাদি আধুনিক চিন্তাধারার প্রবক্তার ভূমিকায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন, তা সেকালের বিচারে তো বটেই, একালের দৃষ্টিতেও প্রশংসার দাবি রাখে।

মীর সাহেব জন্ম নিয়েছেন পরাধীন ভারতে। স্বদেশ অপরের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ায় লেখক পরাধীনতার জ্বালা ও লাঞ্ছনা এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও স্বদেশ প্রীতির যে বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর তীব্র ক্ষোভ ও মাতৃভূমির প্রতি গভীর প্রেমেই ধ্বনিত হয়েছে। এখানে উনিশ শতকের নবলব্ধ স্বাধীনতার চেতনা ও স্বদেশ প্রেমের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি বলেছেন, ‘জন্মভূমি কাহার না আদরের? মানুষের তো কথাই নাই, পশু-পক্ষী, কীট-পতঙ্গগণ জন্মস্থানের মায়া-মমতা বোঝে, আদর যত্ন করে। জন্মভূমির দৃশ্য নয়ন-মন প্রীতিকর। বসবাসে, আনন্দে, সুখোচ্ছ্বাসে হৃদয়ের শান্তি। যাহার প্রীতিপদ স্থান, মহাপবিত্র পুণ্য ক্ষেত্র ধূলিময়লা আবর্জনা প্রকৃত সুসন্তান পক্ষে স্বর্ণ-রজত অপেক্ষাও মূল্যবান। মাতৃদ্রোহী সন্তানের পক্ষে নহে, স্বদেশদ্রোহী কুলাঙ্গারের পক্ষে নহে, জন্মভূমি বৈরী নিষ্ঠুর পামরের পক্ষে নহে।’ (তৃতীয় মুকুল, ইসলামের জয়)

আরব ভূখণ্ডের সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশ, ভিন্নকালে, ভিন্ন প্রেক্ষিতেও লেখক জন্মভূমিকে ভুলতে পারেননি। রোম সৈন্যদের বিপর্যয়ের পর মহাবীর জাফরের কণ্ঠে আমরা লেখকের কণ্ঠস্বরই শুনি। ‘স্বরাজ্যে স্বরাজ অপেক্ষা গৌরবের কথা অস্থায়ী জগতে আর কি আছে ভাই? স্বরাজ যদি পররাজ হইল, তবে গোলামী করিয়া জীবন ধারণ করা অপেক্ষা জীবনপাত করাই শ্রেয়। সিংহজীবন জীবনের মায়ায় কুকুরের জীবনে পরিণত করিয়া লাভ কি? পরিণামে জঠর জ্বালায় বিজেতাদিগের চর্বিত চর্বণ পাদুকা লেহন ভিন্ন আর কি উপায় আছে? জন্মভূমির মায়া যে নরাধম পামরের হৃদয় নাই, তাহার জীবন বৃথা। নিজ জীবন রক্ষা করিতে স্বদেশের স্বাধীনতা যাহারা পরহস্তে তুলিয়া দেয় তাহাদের ন্যায় কুলাঙ্গার দেশ বৈরী আর কে আছে? পবিত্র জন্মভূমি অপরের পাদুকাতলে দলিত হইবে, স্বাধীন জীবন পরাধীনতা শৃঙ্খলে বাঁধা পড়িবে। গলায় রজ্জু দিয়া বাঁদর নাচন নাচাইয়া লইয়া বেড়াইবে। ইহা কোন প্রাণে সহ্য হইবে?’ (অষ্টম মুকুল, ইসলামের জয়)

মশাররফ তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে নিজের জীবনের সত্য পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, কোনো কিছু গোপন করেননি। এমনকি তিনি নিজের অধঃপতন, চারিত্রিক স্খলন ও প্রণয় বৃত্তান্তের নানা গোপন কথাও সততা ও সত্যনিষ্ঠার সঙ্গে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

‘আমার জীবনী’ গ্রন্থে ‘আত্মকথা! প্রার্থনা’ নামক ভূমিকায় লেখক সৃষ্টিকর্তার কাছে এভাবে প্রার্থনা করেছেন। ‘প্রভু সহায় হও। সত্য তত্ত্ব প্রকাশে হৃদয়ে বল দাও। অসত্য ঘটনা, অসত্য ধারণা প্রকাশ হইতে নিখনী সঙ্কোচিত কর। সদাসর্বদা পরহিংসা পরদ্বেষ, পরকুত্সা, পরনিন্দা হইতে তফাত রাখিও।’ এ যেন স্বীকারোক্তির আগে পবিত্র চিত্তে শপথ বাক্য উচ্চারণ। এ জীবনী গ্রন্থের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি পাঠক সমীপে নিবেদন করে বলেছেন, ‘আমার জীবনে শত শত জাহেলি (মূর্খতা) ও অবিবেচনার কার্য হইয়াছে। তাহার ফলও হাতে হাতে পাইয়াছি। সে সকল বিষয় প্রকাশ পাইলে ভবিষ্যতে একটি মানব সন্তান সাবধান হইলে আমার জীবন সার্থক মনে লাভ করিব।’

লেখকের ‘কুলসুম জীবনী’ ও সুখপাঠ্য। দৃষ্টান্ত স্বরূপ এ গ্রন্থের কিছু নমুনা এখানে দেওয়া গেল—‘আমার চক্ষু যে মুখখানি দেখিতে সর্বদা ভালোবাসে, তাহা দেখিতে পায় না। সে মুখ চাঁদবদনী নয়, সূর্যমুখী নয়, শুকতারার ন্যায় শুভ্র নয়, অপ্সরা সদৃশ সুদৃশ্যকান্তি নয়, সুরপুরবাসিনী সুন্দরীগণের ন্যায় মুখের অবয়ব নয়। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ।’

উনিশ শতকে হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের দিকে না গিয়ে সাম্প্রদায়িকতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এ রকম জটিল সামাজিক সংকটের আবর্তনের সময় মীর মশাররফ হোসেন সাহিত্য রচনা করে গেলেন। বিরোধী ভাবধারার পরিবেশে তিনি যে উদার মানবতাবাদ, স্বদেশপ্রেম, জাতীয়তাবোধ, সামাজিক কল্যাণচিন্তা, স্বাধীনপ্রিয়তা, জাতীয় সংহতিবোধ ইত্যাদি আধুনিক চিন্তাধারার প্রবক্তার ভূমিকায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন, তা সেকালের বিচারে তো বটেই, একালের দৃষ্টিতেও প্রশংসার দাবি রাখে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0