default-image

চাঁদনি রাত ফ্যাকাশে জোছনায় নারিকেল পাতার ফাঁকে আলো-আঁধারি ছায়া আর বাতাসে পাতার শোঁ শোঁ শব্দে দারুণ ঘুমের আমেজ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন জাফর সাহেব। স্ত্রী আয়েশা সেই কখন থেকে মৃদু নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। রাজ্যের চিন্তা যেন জাফর সাহেবের মাথায়। আসলে ঘুম আসছে না, তাই চিন্তার ভান করছেন। কখনো ভাবছেন ছেলেটার কথা। সেই কবে থেকে বিদেশ বিভুঁইয়ে পড়ে আছে।

গেল বছর সামার ভ্যাকেশনে দেশে এসেছিল, কিন্তু দু সপ্তাহ কাটিয়ে আবার চলে গেল। স্ত্রী আয়েশা বেগমের খুবই সাধ, ছেলেকে দেশে এনে বিয়ের ব্যবস্থা করে লাল টুকটুকে একটা বউ ঘরে আনার।

একমাত্র ছেলের বিয়ে করাবে ধুমধাম করে। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব কেউ বাদ যাবে না। এমনি এলোপাতাড়ি কত ভাবনা তাঁর মাথায় আসছে। মাঝেমধ্যে পুরোনো খবরের কাগজগুলো নড়েচড়ে দেখছেন। দেয়াল ঘড়িতে তাকিয়ে দেখেন, রাত একটা বাজার সংকেত আসতে খুব একটা দেরি নেই। ভাবছেন এক্ষুনি বিছানায় যাবেন।

বাসার বারান্দার পাশের ঝোপঝাড় থেকে হঠাৎ একটা শব্দ কানে এল। মনে হল, ওপর থেকে কিছু একটা পড়েছে। জাফর সাহেব কোনো কিছু না ভেবেই দরজার কোণে রাখা রডটা হাতে নিয়ে বের হতে যাবেন, ঠিক তখনই ঘুম ভাঙে আয়েশার। তিনি সংক্ষেপে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে পা টিপে টিপে দরজা খুলতে উদ্যত হলেন। তৎক্ষণাৎ আয়েশা বাধা দিল। বলল, এভাবে তোমার একা যাওয়া উচিত নয়। পাশের বাসার নেয়ামত সাহেবকে একটা ফোন দাও। স্ত্রীর কথামত ফোন দিতে মুঠো ফোনে হাত দিলেন, আবার ভাবলেন এত রাতে ভদ্রলোককে ফোন দিয়ে ডিস্টার্ব করব? তার চেয়ে বরং দরজায় নক করাই ভালো। পেছনের গেট দিয়ে বের হয়ে গেলেন নিয়ামত সাহেবের বাসায়।

আস্তে করে ডাক দিলেন, নিয়ামত ভাই। প্রথম ডাকেই দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন নিয়ামত। কোন বিপদের আশঙ্কায় ফিসফিস করে বললেন, এত রাতে! কী ব্যাপার, কোন বিপদ! জাফর ঘটনা খুলে বললেন। নিয়ামত টর্চ হাতে নিয়ে ইঙ্গিতে বললেন, চলুন। দুজন পা টিপে টিপে জাফর যেখানে কিছু পড়ার শব্দ শুনেছিলেন, সে দিকটায় এগিয়ে যেতে লাগলেন। কিছুদূর এগোতেই একটা ঝোপের আড়ালে দুজন একটা গোঙানির শব্দ শুনতে পেলেন।

বিজ্ঞাপন

জাফর বুঝলেন, লোকটা চুরি করতে এসে দেয়াল টপকে নিচে নামার সময় পা ফসকে পড়ে গেছে। জাফর রডটা মাথার ওপর উঠিয়ে যেই মারতে উদ্যত হলেন, এমনি গোঙানির শব্দ আরও বাড়তেই জাফর জিজ্ঞেস করলেন, কে রে ওখানে?

কোন শব্দ নেই, তারা দুজন আরেকটু এগিয়ে গেলেন। গোঙানি থামিয়ে লোকটা বলল, স্যার আমি কদম আলী। আর কোনো সাড়া–শব্দ নেই।

নিয়ামত হাতের টর্চটা উঁচিয়ে ধরে দেখেন, লোকটির মাথা ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে। তিনি জাফরকে থামিয়ে বললেন, লোকটিকে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

–তার আগে বদমাশটাকে পুলিশে দেব, জাফর বললেন।

–বিপদ ডেকে আনবেন না। ওকে এ অবস্থায় থানায় দিলে পুলিশ কেস হবে। তারপর লোকটা যদি মারা যায়, তবে মার্ডার কেসে আপনি ফেঁসে যাবেন জাফর সাহেব—বললেন নিয়মিত।

জাফর বুঝলেন, নিয়ামত সাহেব ঠিকই বলছেন। চিকন বুদ্ধির লোক নিয়ামত, তাই জাফর তাঁকে সব সময় সম্মান করেন। দুজন দীর্ঘদিন একই অফিসে চাকরি করেন। পারিবারিকভাবে তারা একে অন্যের দারুণ ঘনিষ্ঠ। দুজনে বাসাও নিয়েছেন পাশাপাশি। এত রাতে যানবাহন পাওয়া খুবই অসম্ভব ব্যাপার। দুজনই ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলেন। হঠাৎ দেখা গেল, একটা রিকশাভ্যান একদম তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দুজনই কিছুটা অবাক হলেন।

দুজন শুধু ভ্যানচালককে বললেন, চল, ওই আহত লোকটাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

কোন কথা না বলে চালক এগিয়ে এল, আর আহত লোকটাকে একাই টেনে রিকশাভ্যানে ওঠাল। জাফর আর নিয়ামত দুজনই লোকটাকে অবাক বিস্ময়ে দেখলেন। এক চোখ কানা, বাবরি চুল একটা গামছা দিয়ে মুড়ানো। জাফর ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আমরা কোথায় যাব, তা কি তুমি জানো? হাঁ জানি, বলেই ভ্যানচালক লোকটা বিকট হাসি হাসল।

তারপর ভ্যানের দুপাশে দুজন পা নিচে ঝুলিয়ে বসলেন। ভ্যানচালকের ব্যাপারে দুজনে ফিসফিস করে কিছু বললেন। আবার চালক বিকট হাসি দিয়ে প্যাডেল চাপছিল। জাফর হাসপাতালের ইমার্জেন্সির সামনে চালককে দাঁড়াতে বললেন। ভেতরে গিয়ে ডিউটি ডাক্তারের সঙ্গে কথা বললেন আহত লোকটির ব্যাপারে। তারপর দুজনে বাইরে এসে দেখেন, রিকশাভ্যান উধাও। কদম আলী নামে আহত লোকটিও নেই। ভ্যানচালকের সঙ্গে তার কি কোন সখ্য?

অনেক খোঁজাখুঁজি করেও রিকশাভ্যানের হদিস পাওয়া গেল না। কী যে হলো লোকটির। সকালের আগে কিছু করার উপায় নেই। দুজনকে কিছুটা ভয় পেয়ে বসল। বিরাট এক ঘোরের মধ্যে কেটে গেল মধ্যরাতের ঘটনা। দুজনই ভাবতে ভাবতে বাসার পথে পা বাড়ালেন।

চিকন বুদ্ধির লোক নিয়ামতও ঘটনার ঘনঘটায় স্তব্ধ হয়ে গেলেন।

কিন্তু কে এই কদম আলী, যাকে নিয়ে রাত দুপুরে দুটি লোক হন্তদন্ত হয়ে ছোটাছুটি করেছেন। দুজনের মধ্যে কেউ একবারও বিষয়টি নিয়ে ভাবলেন না। দুজনই চাইলেন লোকটিকে সেবা দিয়ে বাঁচিয়ে তুলতে। চাঁদনি রাতের চাঁদটা আকাশে মেঘের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে লাগল। ক্লান্ত শরীরে দুজন বাসার সামনে এসে শোনেন, আবার ওই একই গোঙানির শব্দ। দুজনে এগিয়ে এসে দেখেন, সেই কদম আলী, সেই লোকটি একই স্থানে বসে একইভাবে গোঙাচ্ছে।

জাফর লোকটির পিঠে হাত দিয়ে বললেন, কদম আলী তুমি এখানে? ডাক শুনেই লোকটি ঘুরে তাকাল। চোখ দুটি নেই, খালি কোটর থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরছে।

নিয়ামত বললেন, ওকে ঘরে নিয়ে চলেন।

দুজন হাত ধরে কদম আলীকে ওঠাতে গিয়ে মনে হল, কেউ কদম আলীর পা ধরে হ্যাঁচকা টান দিচ্ছে।

তারপর বোঝা গেল, তার পুরো শরীর একটা দড়ি দিয়ে প্যাঁচানো। সেই দড়িতে টান পরছে। নিয়ামত আর জাফর দুজন মিলে প্রাণপণ দড়ি ধরে আটকানোর চেষ্টা করলেন। দড়িটা কিন্তু বাজারের কেনা দড়ি নয়, গাছের লতাপাতা দিয়ে তৈরি একটা আজব দড়ি।

দড়িটি ধরে কে যেন টানছে দূরের নদীর দিকে। ওরা দুজন শরীরের সব শক্তি দিয়েও লোকটিকে আটকাতে পারছেন না। টানতে টানতে যখন নদীর জলের কাছে নিয়ে আসল, তখন দেখা গেল জলের ভেতর থেকে দুটি হাত বেরিয়ে এসে দড়িটি টানছে। কদম আলী নামক লোকটি তার বীভৎস চেহারা নিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসছে। হাত উঁচিয়ে বলছে, বিদায় বন্ধুরা, বিদায়। কালো কুচকুচে শীর্ণকায় দুটি হাত, বড় বড় নখ।

ওই দুটি হাতের কবল থেকে ওরা দুজন কিছুতেই কদম আলীকে রক্ষা করতে পারল না। তাদের চোখের সামনে হ্যাঁচকা টানে কদম আলীকে নদীর মধ্যে টেনে নিল দুটি হাত। তারপর নদীর জলে বিরাট এক ঘূর্ণি চক্কর সৃষ্টি করে তলিয়ে গেল। ওরা দুজন হতাশ চোখে নদীর জলের তাকিয়ে থাকলেন অনেকক্ষণ। তারপর পরস্পর দিকে চাওয়া–চাওয়ি করে জাফর আর নিয়ামত বাড়ির পথে পা বাড়ালেন। ততক্ষণে পূর্ণিমার চাঁদ অন্ধকারে ঢেকে দূরে কোথায় হারিয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0