default-image

রাত তখন সাড়ে ৯টার বেশি বাজে। গ্রামের লোকজনের কাছে মধ্যরাত। সন্ধ্যা হলে ঘুমিয়ে পড়া মানুষদের জন্য রাত সাড়ে ৯টাকে মধ্যরাত না বলে উপায় কী! আমিনুল ওর প্রিয় বন্ধু বদরুদ্দিনের সঙ্গে বেরিয়েছে মাছ ধরার জন্য। বদরুদ্দিনের তিন চাচাতো ভাই আছে ওদের দলে।

মাছ ধরে ঘরে ফিরতে রাত ১২টা বেজে যাবে। তখন তো চারদিক একদম নিস্তব্ধ। ঝিঁঝি পোকার ডাক পুরো পরিবেশটাকে করে তুলবে রহস্যময়। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে ফকফকা জ্যোৎস্না। আমিনুলের কাছে জ্যোৎস্না অবশ্য তেমন কোনো বাড়তি অর্থ বহন করে না। চারদিক পরিষ্কার থাকায় পথঘাট দেখা যায়—এটাই যা লাভ।

বিজ্ঞাপন

এই মধ্যরাত মাছ ধরার উপযুক্ত সময়। কোনো এক বিচিত্র কারণে মাছেরা এ সময় কিলবিল করতে থাকে বিলের পানিতে। আমিনুলকে গ্রামের সবাই সাহসী মানুষ হিসেবেই জানে। তবে এটা তাঁর নিজের গ্রাম নয়; নানার বাড়ি। তিন মাইল দূরে পাশের গ্রামে ওর বাড়ি। দুটো গ্রামই নেত্রকোনার কলমাকান্দা থানায় পড়েছে। নানার বাড়ি দুধকুড়া গ্রামের বন্ধু বদরুদ্দিন আর কয়েকজন সাহসী লোককে নিয়ে আমিনুল মাছ ধরতে এসেছে বিলে। ওরা এই বিলে আগে মাছ ধরতে এলেও আমিনুলের জন্য এবারই প্রথম। এই অঞ্চলের মানুষ অবশ্য বিলকে বলে ডোবা।

বিশাল হাওর এলাকায় সবাই যায় মাছ ধরতে। তবে সেটা দিনে। রাতে যায় সাহসী মানুষেরা। কারণ নানা ধরনের কেচ্ছা কাহিনি আছে বিলটা নিয়ে। অনেকে বলে জায়গাটা ভালো নয়। আমিনুল এসবকে পাত্তা দেয় না। টর্চ জ্বালিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সঙ্গীদের থেকে এগিয়ে যায় আমিনুল। অবশ্য এই এগিয়ে যাওয়াটা ওর ইচ্ছাকৃত। পাঁচজনের দলে আছে ওরা। সবাই একসঙ্গে থাকলে বেশি মাছ ধরা যায় না।

নানার বাড়ি হলেও আমিনুল দুধকুড়া গ্রামের পথঘাট ভালোই চেনে। ও জানে উত্তর দিকে কিছু দূর গেলে একটা টিলার মতো পড়বে। তার পাশে বিশাল রেইনট্রি। সেদিকে এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে আমিনুলের মনে হয় পেছন থেকে কেউ আসছে। হাতে ধরা টর্চটা কয়েকবার পেছনে মেরে দেখে। অনেক দূর পর্যন্ত কেউ নেই। তবু ওর মনে হয়, কে যেন গরম নিশ্বাস ফেলছে পেছনে। মনের ভুল ভেবে হাঁটতে থাকে আমিনুল। চলা থামায় না। এমন সময় কেমন একটা গরম বাতাস বয়ে যায়। মনে হয় কাছে কে যেন আগুন ধরিয়েছে।

কিছুক্ষণ পর আমিনুলের মনে হয় বাতাসটা বেশি ঠান্ডা। এভাবে হঠাৎ গরম, আবার শীতল হওয়ার কোন মানে খুঁজে পায় না সে। জঙ্গলের বাতাস মনে হয় এমনই হয়। নিজেকে প্রবোধ দেয়। হঠাৎ চাঁদের আলোয় সামনে আইলের ওপর একটা লোককে বসে থাকতে দেখে আমিনুল। পরণে সাদা পাঞ্জাবি; মাথার চুল কাঁচাপাকা।

সালাম চাচা, আপনি এখানে কখন এসেছেন? গ্রামের কেউ ভেবে প্রশ্ন করে আমিনুল।

আমি তো অনেকক্ষণ ধরে বসে আছি—মুখ না ঘুরিয়ে উত্তর দেয় লোকটি।

আমিনুল বেশ অবাক হয়। রাতে জঙ্গলের মতো জায়গায় অনেকক্ষণ ধরে বসে থাকার কারণ কী! মাথায় সমস্যা আছে নাকি লোকটার! সেটা পরীক্ষার জন্য আমিনুল বলে, ‘চাচা, আপনি কোন পাড়ার?’

দক্ষিণ পাড়ার।

দক্ষিণ পাড়াতেই আমিনুলের নানার বাড়ি। এখানকার সব মানুষকে চেনে সে। কিন্তু এই লোকটাকে কেন যেন চিনে উঠতে পারছে না। হঠাৎ কথা বলে ওঠে লোকটি। ‘তুমি আর সামনে যেও না। মাছ পাবে না।’ আমিনুলকে সাবধান করে সে।

কি বলেন চাচা! সামনে ডোবার পানি দেখা যাচ্ছে। মাছ পাব না কেন?

আমি বলছি তুমি যাবে না! লোকটার কণ্ঠে এবার বেশ কড়া ভাব।

বিজ্ঞাপন

লোকটার কথায় পুরোপুরি বিশ্বাস না করলেও একটু যেন থমকে যায় আমিনুল। তিন হাতের মতো দূরত্ব রেখে বসে পড়ে আলের ওপর। বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকে ওরা। আমিনুলের এবার একটু রাগ হয় লোকটার ওপর। চেনা নেই, জানা নেই, আমিনুলকে রীতিমতো শাসাচ্ছে। ওর জন্য এত দরদ, অথচ এখন পর্যন্ত নিজের মুখ দেখতে দিল না। লোকটা হয়তো আমিনুলের মনের ভাব টের পায়—‘তুমি আমাকে সত্যি চিনতে পারছ না! তোমার অবশ্য আমাকে চেনার কথা নয়! আমি তো দশ বছর ধরে এখানে আছি।’

এবার বেশ চমকে যায় আমিনুল। দশ বছর ধরে এখানে আছে মানে কী!

আপনি এই জায়গাতে থাকেন নাকি? আমিনুলের গলা একটু কাঁপছে।

হ্যাঁ। আমাকে তুমি সত্যি ভাবতে পার। আবার মনে করতে পার, চোখের ধাঁধা। তবে সত্যি কথা হলো, দশ বছর আগে এই ডোবায় পড়ে আমি মারা যাই।

কী? কী? আমিনুলের গলা থেকে স্বর বের হয় না।

আমি তোমার কোনো ক্ষতি করতে চাই না। তুমি আমাদের পাড়ার ছেলে। তাই তোমাকে সাবধান করছি। তুমি এখন ফিরে যাও।

কী ক্ষতি হবে? আমি তো আপনার কথার কিছু বুঝতে পারছি না!

তুমি আমাকে এখনো দেখনি, যে কারণে এই কথা বলছ! রক্ত হিম করা কণ্ঠ লোকটার।

আপনাকে তো দেখতেই পারছি। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে ওঠে আমিনুল।

আমি চাইলে পারতাম তোমার ক্ষতি করতে। আমার জীবনে যা ঘটে গেছে, সেটা তোমারও ঘটুক—সেটা আমি চাইতে পারতাম। কিন্তু আমি তেমন প্রতিশোধপরায়ণ নই। তাই এখনো বলছি কথা বাড়িও না। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাও।

এত দূরে এসে খালি হাতে ফিরে যাবে! লোকটার এত কথার পরেও আশা ছাড়ে না আমিনুল।

তোমার জীবনের দাম বেশি, নাকি মাছ ধরা বেশি? আবারও সাবধান করে লোকটা, ‘পালাও এখনই!’

পালাব কেন? ডোবায় মাছ ধরলে কী সমস্যা হবে? আমিনুল কোনোভাবেই খালি হাতে বাড়ি ফিরতে চায় না।

এত রাতে আমি বলতে চাইনি। তুমি আমাকে বলতে বাধ্য করলে। ওই ডোবায় এক মেছো ভূত আছে। সে বিশাল এক মাছের রূপ ধরে থাকে। তুমি ওকে ধরার জন্য যেই জাল ফেলবে। ও উল্টো তোমাকে টেনে নিয়ে যাবে পানিতে। তারপর ওর হিংস্র দাঁত গিয়ে গিলে খাবে তোমাকে। তুমি শত চেষ্টা করলেও পালাতে পারবে না।

আরও কিছু বলতে গিয়ে লোকটা থেমে যায়। আমিনুলের সারা শরীর হিম হয়ে আসে। কেমন যেন গা গুলাতে থাকে। ঘোলাটে চাঁদের আলোয় একটানা ঝিঁঝির শব্দে কেমন যেন অপার্থিব অনুভূতি হয়। সামনে বসা মধ্যবয়সী লোকটার একপাশ দেখতে পাচ্ছে আমিনুল। হঠাৎ লোকটা ফিরে তাকায়। সাদা পাঞ্জাবি পরা মধ্যবয়সী এক লোক। মুখের বাম দিকে কাঁচা পাকা দাড়ি। কিন্তু ডান দিকে মুখ থেকে বুক পর্যন্ত কিছু নাই। পুরো ফাঁকা কঙ্কাল। হাড়ের ফাঁক দিয়ে শ্বাসনালি, ফুসফুস দেখা যাচ্ছে।

আমিনুল আর তাকাতে পারে না। মাথা ঘুরে ধপ করে পড়ে যায় মাটিতে। নিজেকে বাঁচানোর তাগিদে যেন আবার জেগে ওঠে। ওঠার পরে টের পায় আতঙ্কে সারা শরীর অবশ হয়ে আছে। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে! কিন্তু কী আশ্চর্য গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় না! বোধহীন জড়বস্তুর মতো এক জায়গায় পড়ে থেকে আমিনুল। ভাবতে থাকে—মৃত্যু বুঝি এগিয়ে আসছে তার দিকে।

বদরুদ্দিন আর ওর সঙ্গীরা যখন আমিনুলকে খুঁজে পায়, তখন সে গোঁ গোঁ শব্দে কী যেন বলছে আরেক দিকে তাকিয়ে। ওরা না পারলেও আমিনুল দেখতে পায়, দূরে রেইনট্রি গাছের ডালে বসে আছে গালবিহীন লোকটা। মনে হয় যেন গাছে দোল খাচ্ছে। কী বিশাল লম্বা তার শরীর। লোকটার সাদা পাঞ্জাবি বাতাসে দোল খায়।

আমিনুলকে যখন বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়, তখনো তার অপ্রকৃতিস্থ অবস্থা। তাড়াতাড়ি দোষ কাটানোর জন্য লোহা ছোঁয়ানো হয়। কাঁচা কলা সেদ্ধ করে এরপর জোর করে খাওয়ানো হয় আমিনুলকে। কিছুক্ষণ পর ঘুমিয়ে পড়ে সে।

সকালের আলো না ফুটতেই মানুষ গিজগিজ করতে থাকে আমিনুলের নানা বাড়িতে। সবাই দেখতে এসেছে ভূত দেখে জান নিয়ে ফেরা আমিনুলকে। সবাই ওর কাছে কিছু শুনতে চায়। কিন্তু আমিনুল কেমন যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। আগ-দুপুরে ভিড় কিছুটা কমলে বদরুদ্দিন এসে আমিনুলকে বলে, ‘কাল তুই কাউকে কিছু না বলে দল-ছাড়া হয়ে ভালো করিসনি!’

বদরুদ্দিনের কথায় মাথা দোলায় আমিনুল। এই প্রথম কারও কথায় প্রতিক্রিয়া দেখাতে দেখা যায় ওকে। ‘যাই হোক তুই একটা ভালো ভূতের পাল্লায় পড়েছিলি। ওখানে একটা ভূত আছে, যে বছর দশেক আগে মাছ ধরতে গিয়ে ডোবায় পড়ে যায়। মাঝে মাঝে জ্যোৎস্না রাতে তাকে দেখা যায়!’

লোকটা আমাকে বারবার ডোবার দিকে যেতে নিষেধ করছিল। আমিনুল কাঁপা কণ্ঠে বলে।

তুই যাতে বিপদে না পড়িস সেই জন্য সাবধান করে দিয়েছিল ভূতটা।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0